ঝিনুককে সাজিয়ে নিজের সাজসজ্জা চুকিয়ে ফেলল সুধা। সাজতে ভীষণ ভালবাসে সে। এরই ফাঁকে ফাঁকে অনবরত হিরণ আর বিনুকে তাড়া দিয়ে যাচ্ছিল। অগত্যা ওদেরও পোশাক টোশাক বদলে নিতে হল।
উমার হাতে বাড়ির দায়িত্ব সঁপে ওরা যখন বেরুল, ছটাও বাজে নি। তবে কুয়াশা আরও একটু ঘন হয়েছে। হেমন্তের শেষ আলোটুকু অনেক আগে একটানে কেউ যেন গুটিয়ে নিয়েছিল। সারা শহর মুড়ে দিয়ে হালকা অন্ধকার নেমে এসেছে। অবশ্য রাস্তায় রাস্তায় কর্পোরেশনের টিমটিমে আলোগুলো জ্বলে উঠেছে। দু’ধারের বাড়িঘরে জ্বলছে বেশি পাওয়ারের বিজলি বাতি।
হিরণ বিনুকে বলল, তোমার ছোটদির সমস্ত ব্যাপারে তাড়াহুড়ো। কোথাও যাবার হলে সবার আগে পৌঁছনো চাই। জলসা শুরু হবে সাতটায়। এখান থেকে হরিশ পার্ক ট্যাক্সিতে মাত্র পনের মিনিট। এত তাড়াতাড়ি যাওয়ার মানে হয়?
সুধা ভেবেছিল, বাস কি ট্রামে যাওয়া হবে। ট্যাক্সির কথা আগে জানায় নি হিরণ। সুধা খুবই উৎফুল্ল। কি আশ্চর্য, ট্যাক্সি করে নিয়ে যাবে, বল নি তো?
হিরণ উত্তর দিল না।
সুধা বলতে লাগল, ফাংশানে আগে আগে যাওয়া ভাল। স্টেজের সামনের দিকের চেয়ারে বসা যায়। আমার বাপু, কাছে থেকে দেখতে না পেলে ভীষণ খারাপ লাগে।
বড় রাস্তায় এসে ট্যাক্সি ধরল হিরণ। সামনের সিটে শিখ ড্রাইভারের পাশে বসেছে বিনু। পেছনে সুধা ঝিনুক আর হিরণ।
বিনু কাত হয়ে বসে হিরণদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে চোরা দৃষ্টিতে ঝিনুককে দেখছিল। অবশ্য বাড়ি থেকে বেরুবার আগেই তার চোখ মেয়েটার ওপর আটকে ছিল। কালকের চেয়ে মেয়েটা আজ আরও ঝলমলে। খুশিতে আরও ভরপুর। ভাবল, সুধাদের কাছেই যদি বাকি জীবনটা থাকা যেত! পরমুহূর্তে মনে পড়ল, দিন কয়েকের মধ্যে অবনীমোহন কলকাতায় ফিরে আসবেন। তখন কি আর বোনের বাড়িতে পড়ে থাকা ঠিক হবে? বিষাদে, দুশ্চিন্তায় মাথার ভেতরটা হঠাৎ ভারী হয়ে ওঠে।
হিরণ বলছিল, পঙ্কজ মল্লিকের নাম শুনেছ ঝিনুক?
তার বাবা ভবতোষের মার্ফি কোম্পানির বড় একটা রেডিও ছিল। ব্যাটারিতে চলত। সেই রেডিওতে পঙ্কজ মল্লিকের প্রচুর গান শুনেছে ঝিনুক। সবই অবশ্য রবি ঠাকুরের গান। কার কাছে যেন শুনেছিল, ‘ডাক্তার’ বলে একটা সিনেমায় এই পঙ্কজ মল্লিকই নাকি অভিনয়ও করেছেন। তবে সে ছবি তার দেখা হয়নি।
ঝিনুক বলল, শুনব না কেন? রাজদিয়ায় থাকতাম বলে এতটা পেঁয়ো ভাববেন না। রেডিওতে তাঁর কত গান শুনেছি।
শচীনদেব বর্মন?
বিরাট গায়ক। তার নাম কে না জানে। দু’একদিন পরপরই রেডিওতে তার গান বাজায়।
একে একে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, জগন্ময় মিত্র, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, সত্য চৌধুরি, রবীন মজুমদার, আলপনা বন্দ্যোপাধ্যায়, উৎপলা সেন, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, এমনি আরও অনেকের নাম করে গেল হিরণ।
ভবতোষের শুধু রেডিওই না, বড় চোঙাওলা গ্রামোফোন কোম্পানির একটা কলের গানও ছিল। সেটার গায়ে লেখা ও হিজ মাস্টার্স ভয়েস। একটা মুগ্ধ কুকুরের ছবিও ছিল তাতে। একাগ্র চিত্তে সে গান শুনছে।
হিরণ যাঁদের কথা বলল, ভবতোষ মাঝে মাঝেই কলের গানে তাঁদের রেকর্ড বাজাতেন। বাবার কাছে যখন ঝিনুক থাকত, এঁদের অনেকেরই গান শুনেছে। তবে বেশ কয়েকজন তার অচেনা। সুদূর কোনও গ্রহের মতো পূর্ব বাংলার নগণ্য শহর রাজদিয়ায় তখনও তাঁদের নাম পৌঁছয় নি।
ঝিনুক বলল, এই সব সিঙ্গারদের নাম করছেন কেন হিরণদা?
উত্তর না দিয়ে হিরণ জিজ্ঞেস করে, এঁদের কখনও নিজের চোখে দেখেছ?
কী করে দেখব? এঁরা কি কোনও দিন রাজদিয়ায় গেছেন?
আজ এঁদের সবাইকে দেখতে পাবে। কাছে বসে ওঁদের গানও শুনতে পাবে।
হিরণ জানিয়েছিল, জলসা ব্যাপারটা পরে বুঝিয়ে দেবে। কিন্তু ঝিনুক এর মধ্যেই মোটামুটি আন্দাজ করে নিয়েছে, জলসা হল গান বাজনার মজলিশ। সারা শরীরে শিহরন খেলে যাচ্ছিল তার, চোখেমুখে প্রবল উত্তেজনা। হিরণের মুখে শোনার পরও যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না। পুরোপুরি নিশ্চিত হবার জন্য বলল, সত্যি বলছেন, ওঁরা আসবেন!
হিরণ বলে, না এলে ওঁদের দেখবেই বা কী করে? কাছে বসে গান শোনার সুযোগই বা পাবে কিভাবে?
হাতের মুঠোয় অযাচিত স্বপ্ন যেন নেমে এসেছে। নিমেষে সময়ের সীমানা পেরিয়ে অনেক কাল আগের এক বালিকা হয়ে যায় ঝিনুক। উচ্ছল। ভারমুক্ত। কারণে অকারণে যে রোমাঞ্চিত হতে ভালবাসে। প্রবলবেগে মাথা ঝাঁকাতে আঁকাতে ঝিনুক কলকলিয়ে ওঠে, উঃ, এ আমি ভাবতেও পারি না হিরণদা—
ঝিনুকের ছেলেমানুষি, তার উচ্ছ্বাস দেখতে দেখতে হিরণ হাসে। মেয়েটা যে দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে উঠছে, এতে খুব ভাল লাগছে তার।
হরিশ পার্কে এসে দেখা গেল, গোটা পার্কটা জুড়ে ত্রিপল টিন বাঁশ ইত্যাদি দিয়ে ঘেরা বিশাল মন্ডপ। রাস্তার দিকে অস্থায়ী কোলাপসিবল গেট, ফুললতাপাতা দিয়ে সাজানো। মাইকে সানাইয়ের রেকর্ড বাজানো হচ্ছে। বাতাসের কাঁধে চেপে মধুর সুর ছড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ছে নানা দিকে। মাঝে মাঝে সানাই থামিয়ে ঘোষণা করা হচ্ছে, যারা প্যান্ডেলে এসেছেন, অনুগ্রহ করে শান্ত হয়ে বসুন– কিংবা ঠিক সাতটায় আমাদের অনুষ্ঠান শুরু হবে। শিল্পীরা কিছুক্ষণের মধ্যে এসে যাবেন। ক্রমান্বয়ে সানাই। তারপর ঘোষণা। আবার সানাই। আবার ঘোষণা।
চারদিকে উৎসব উৎসব আবহাওয়া। স্বপ্নের পরিবেশ। অপলক তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল ঝিনুক।
