হিরণ বুঝিয়ে দিল, দুতিন পুরুষ যারা এখানে থেকেছে তাদের বসবাসের যাবতীয় চিহ্ন মুছে দেবে সে। অতীতের সমস্ত স্মৃতি নির্মূল না করে এ বাড়িতে ঢুকবে না।
দ্বিজাতি তত্ত্বের বিষবৃক্ষ অনেকদিন আগেই বিনুর রক্তের ভেতর কখন নিঃসাড়ে ডালপালা মেলে দিয়েছিল। সে দ্বিধার সুরে বলল, কিন্তু–
হিরণ চলতে চলতে একটু থমকে বিনুর চোখের দিকে তাকায়। জিজ্ঞাসু সুরে বলে, কিন্তু কী?
বিনু বলল, বাড়িটা যে এলাকায় সেখানে কিন্তু হিন্দুরা থাকে না।
ফের সামনের দিকে পা বাড়িয়ে হিরণ বলে, কে বলল, থাকে না? ওটা মিক্সড লোকালিটি। প্রচুর হিন্দুও ওখানে আছে। বেশ কিছু মুসলিম ফ্যামিলি পার্টিশানের সঙ্গে সঙ্গে হিন্দুদের কাছে বাড়ি বেচে পাকিস্তানে চলে গেছে। বাকি অনেকেই এখন এক্সচেঞ্জ করছে। সেই সব বাড়িতে ওপারের হিন্দুরা আসছে। একটু ভেবে বলল, এর মধ্যেই এখানে সেভেনটি পারসেন্ট হিন্দু হয়ে গেছে। কোনও রকম দুশ্চিন্তার কারণ নেই।
বিনু উত্তর দিল না।
হিরণ বলল, যাতে কোনও খিচ না থাকে, বাড়ির নামও পালটে দেব। মালিকানাই যখন বদলে যাবে, আগের নামই বা থাকবে কেন?
বিনু এবারও চুপ।
হিরণ থামে নি, তোমার ছোটদিকে ভাল করে বোঝাও। এক্সচেঞ্জ না করতে পারলে, এ জীবনে। কলকাতায় আমাদের নিজস্ব বাড়ি কোনও দিনই হবে না। ভাড়া বাড়িতেই লাইফ কাটিয়ে দিতে হবে।
হিরণ যা বলল তা উড়িয়ে দেবার মতো নয়। যথেষ্ট সারবত্তা আছে তাতে। ইতস্তত ভাবটা পুরোপুরি না কাটলেও বিনু বলল, ঠিক আছে, ছোটদিকে বোঝাব।
একসময় দু’জনে বাড়ি পৌঁছে যায়।
.
৩.২৮
লক্ষ্মীপুজোর পর থেকেই সারা কলকাতা জুড়ে জলসার ধুম পড়ে যায়। চলে সেই ফাল্গুনের শেষ অব্দি। একটানা। কখনও এপাড়ায়, কখনও ওপাড়ায়। কোথাও সন্ধেবেলায় শুরু হয়ে মাঝরাতে শেষ হয়। কোথাও সমস্ত রাত চলে। বড় অনুষ্ঠানগুলোর মেয়াদ পুরো দু’রাত। একদিন লাইট মিউজিক, কমিক, ম্যাজিক, এমনি রকমারি মনোরঞ্জনের ব্যবস্থা। আরেকদিন শুধুই উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত।
দেশভাগ হয়ে গেছে। হাজার হাজার শরণার্থীর ঢল নেমেছে কলকাতায়। শিয়ালদা স্টেশনে, রিফিউজি ক্যাম্পগুলোতে কত যে মানুষ পচে গলে মরে ঝরে যাচ্ছে। না খেতে পেয়ে। বিনা চিকিৎসায়।
পার্টিশানের জের এখনও কাটে নি। কবে কাটবে, কেউ জানে না। কিছুদিন চুপচাপ। মনে হয়, সব বুঝি স্বাভাবিক হয়ে এল। বিষবাষ্প সরে গিয়ে এবার নির্মল বাতাস বইবে।
কিন্তু মানুষের মনে ক’বছর ধরে যে গরল জমা হয়েছে তা কি সহজে নিশ্চিহ্ন হয়? এত তাড়াতাড়ি দুরারোগ্য ব্যাধির উপশম কি সম্ভব?
দু’দশ দিন কি মাসখানেক পর পর আচমকা মানুষের গনগনে আক্রোশ ফেটে বেরোয়। তখন দেশের কোথাও দাঙ্গা। কোথাও আগুন। কোথাও হত্যা।
কিন্তু কলকাতার বিশেষ তাপ-উত্তাপ নেই। উদাসীন এই শহরের খাঁটি নাগরিকেরা নিজেদের আমোদ ফুর্তি নিয়েই মজে আছে।
হিরণের অফিসের এক বন্ধু থাকে ভবানীপুরে। হরিশ মুখার্জি রোডে। ওখানকারই হরিশ পার্কে মস্ত প্যান্ডেল বানিয়ে জলসার আয়োজন করা হয়েছে। বন্ধুটি অনুষ্ঠানের বড় পান্ডা। সে হিরণকে চারখানা কার্ড দিয়েছিল।
হিরণ ঠিক করে রেখেছিল, সুধাকে নিয়ে জলসায় যাবে। বিনুরা আসায় ভালই হয়েছে। সবগুলো কার্ডই কাজে লাগানো যাবে। নইলে দুটো নষ্ট হত।
.
সন্ধে সাতটায় অনুষ্ঠান শুরু হবার কথা। আজকাল দিন ছোট হয়ে এসেছে। সাড়ে পাঁচটা বাজতে না বাজতেই সন্ধে নামে, বাতাসে হালকা সরের মতো কুয়াশা ভাসতে থাকে।
বেলা পড়ে এলে ঝিনুককে সাজাতে বসল সুধা। এখন টানের সময়। শুকনো হাওয়ায় গা চড়চড় করে। মুখের চামড়া খসখসে হয়ে যায়।
ভেজা ভোয়ালে চেপে চেপে ঝিনুকের মুখটা পরিষ্কার করে মুছে, সযত্নে ক্রিম মেখে দিল সুধা। বিনুনি করে লম্বা ঘন চুল বাঁধল। কপালের মাঝখানে বড় গোলাপি টিপ আঁকল পরিপাটি করে। আলমারি থেকে নিজের দামী সিল্কের শাড়ি, কোট আর ব্লাউজ বার করে দিয়ে বলল, পরে ফেল–
মাত্র দু’দিন এ বাড়িতে আছে ঝিনুক। মনে হচ্ছিল, জন্মাবধি সুধারা তাকে নিবিড় মমতায় জড়িয়ে রেখেছে। গাঢ় আবেগ কান্না হয়ে গলার কাছে জমাট বেঁধে যাচ্ছে। বেরিয়ে আসতে পারছে না। ঢোক গিলতে কষ্ট হচ্ছে, তবু কত যে সুখ!
শাড়ি ব্লাউজ কোটটোট বুকে আঁকড়ে রাখে ঝিনুক। ঠোঁট দুটো থরথর কাঁপছে। অজান্তেই বুঝি চোখ থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় জল ঝরে যাচ্ছে।
ঝিনুকের আবেগ সুধার মধ্যেও চারিয়ে যায়। ধরা গলায় সে বলে, এই মেয়ে, চোখের জল মোছ–
সম্বিত ফিরে আসে ঝিনুকের। ত্বরিত হাতে চোখ মুছে মৃদু হাসে সে, তোমার কাছে এসে বেঁচে গেছি ছোটদি—
বোকা মেয়ে। ওসব কী কথা! সুধার ধমকে স্নেহ মাখানো, আমি তোমার দিদি হই না? এমন কথা আর কখনও বলবে না। অনেক দূর যেতে হবে। শাড়িটা পরে নাও–
ঝিনুক শাড়িটা পরল ঠিকই। কিন্তু কেমন যেন অগোছাল, জবরজং। গেঁয়ো ভাব ফুটে বেরিয়েছে।
পাশে দাঁড়িয়ে লক্ষ করছিল সুধা। তার মোটেও পছন্দ হয় নি। কপালে সামান্য ভাঁজ পড়ল। উঁহু উঁহু, এটা রাজদিয়া নয়। এভাবে কলকাতার মেয়েরা শাড়ি পরে না। নিপুণ হাতে নিজেই ঝিনুককে শাড়িটা পরিয়ে দিল সে।
শাড়ি পরার ধরন পালটে দিতেই অনেকখানি বদলে গেছে ঝিনুক। পেঁয়ো ভাবটা উধাও। এখন তাকে বেশ সপ্রতিভ দেখাচ্ছে। রীতিমতো আধুনিকা।
