হিরণ বলছিল, পার্টিশানের পর এখান থেকে অনেকে চলে গেছে। কেউ ইস্ট পাকিস্তানে, কেউ ওয়েস্ট পাকিস্তানে। যাদের যাবার উপায় নেই, তারা পড়ে আছে।
বিনু নিজের চোখে দেখে নি, তবে শুনেছে, ইন্ডিয়া থেকে বর্ডার পেরিয়ে বহু মুসলমান ওপারে চলে গেছে। তাদের বেশির ভাগই উঠেছে ঢাকায়, খুলনায় কিংবা চট্টগ্রামে।
মুসলমানদের ওপারে যাওয়া নিয়ে আর কোনও কথা হল না। আরও মিনিট তিনেক হাঁটার পর একটা বেশ চওড়া রাস্তায় সাবেক ধাঁচের তেতলা বাড়ির সামনে এনে বিনুকে দাঁড় করাল হিরণ। বাড়িটার চারপাশ ঘিরে বেশ খানিকটা করে ফাঁকা জায়গা। এককালে হয়তো ফুলের বাগান ছিল। ফুল শুকিয়ে, পাতা ঝরে গাছগুলো এখন কাঠিসার। উঁচু বাউন্ডারি ওয়াল কোথাও কোথাও ভাঙাচোরা। রাস্তার দিকের লোহার গেটে মস্ত তালা ঝুলছে। দরজা জানালা সব বন্ধ। বোঝা যায়, অনেকদিন ফাঁকা পড়ে আছে।
আশেপাশে এমন জনমানবহীন, তালাবন্ধ বাড়ি আরও ক’টা চোখে পড়ল। তবে কাছে দুরে অন্য বাড়িগুলোতে অবশ্য লোকজন আছে। দরজা বা জানালা দিয়ে কৌতূহলী কিছু মুখ উঁকি দিচ্ছে। চোখাচোখি হলেই আড়ালে সরে যাচ্ছে।
যে বাড়িটার সামনে বিন্দুরা দাঁড়িয়ে আছে সেটার গেটের গায়ে পাথরের ফলকে ইংরেজি হরফে লেখা : খান মঞ্জিল। প্রতিষ্ঠা : ১৮৮২। একেবারে নিচে : রহমত আলি খান, এম.এ, বি.এল।
একটা নিঝুম প্রাচীন ইমারতের সামনে কেন হিরণ তাকে টেনে এনেছে, কে জানে। চারদিক দেখেশুনে মনে হল, শিক্ষিত, ভদ্র মুসলমানদের এলাকা।
হিরণ জিজ্ঞেস করল, বাড়িটা কেমন দেখছ বিনু?
সমস্ত ব্যাপারটা হেঁয়ালির মতো। হিরণের উদ্দেশ্য বোঝা যাচ্ছে না। বিনু কী উত্তর দিতে যাচ্ছিল, হিরণ ফের বলল, প্রায় সত্তর বছর বয়েস হতে চলল বাড়িটার, কিন্তু এখনও বেশ মজবুত। চার তলার ভিত, দেওয়ালগুলো বিশ ইঞ্চি চওড়া, শ্বেত পাথরের মেঝে। ভেতরে বর্মা টিকের আসবাব। একটু সারিয়ে সুরিয়ে রং করে নিলে আরও পঞ্চাশ ষাট বছর নিশ্চিন্তে কেটে যাবে। তা ছাড়া, ছ’কাঠার ওপর জায়গা।
কোনও মুসলিম পরিবারের আদ্যিকালের সাদামাঠা এক বাড়ির গুণকীর্তন বিনুর ধন্দ শতগুণ বাড়িয়ে দেয়। সে বলে, এই বাড়িটা নিয়ে এত মাথা ঘামাচ্ছেন কেন?
হিরণ বলে, কারণ আছে। জানো, পার্টিশানের পর কলকাতার জমি-বাড়ির দাম কী সাঙ্ঘাতিক বেড়ে গেছে। এই এলাকায় এক কাঠা জমি এখন তিরিশ হাজার টাকা। দু’চার বছরের মধ্যে ষাট সত্তরে উঠে যাবে। চল, বাড়ি যাওয়া যাক। যেতে যেতে সব বলছি।
ওরা যে পথে এসেছিল সেই পথেই ফিরে চলেছে। ধীরে ধীরে রহস্যের আবরণ উন্মোচন করতে থাকে হিরণ। ‘খান মঞ্জিল’-এর পাথরের ফলকে যাঁর নাম লেখা আছে সেই রহমত আলি খান ছিলেন আলিপুর কোর্টের বাঘা উকিল। বিরাট পশার ছিল তার। বিপুল আয়।
রহমত আলিদের আদি বাড়ি বিহারের হাজারিবাগ ডিস্ট্রিক্টে। কয়েক পুরুষ কলকাতায় থেকে প্রায় বাঙালি হয়ে গিয়েছিলেন। রহমতের মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে শওকত আলি খান মঞ্জিল’-এর মালিক হন। বাবার মতো তিনি কৃতী নন। লেখাপড়ায় মনোযোগ ছিল না। কোনও রকমে ম্যাট্রিকুলেট। টেরিটি বাজারে কী সব যন্ত্রপাতির মাঝারি একটা দোকান আছে।
দাঙ্গার সময় টালিগঞ্জের বাড়িতে তালা লাগিয়ে শওকত বিবি আর ছেলেমেয়ে নিয়ে পার্ক সার্কাসে চলে যান। সেখানে ভাড়া বাড়িতে থাকেন। খান মঞ্জিল’-এ আর ফিরে আসেন নি। তিনি মনস্থির করে ফেলেছেন, ইন্ডিয়ায় থাকবেন না। টেরিটি বাজারের দোকান এক বন্ধুকে দিয়ে খান মঞ্জিল এক্সচেঞ্জ করে ইস্ট বেঙ্গলে চলে যাবেন।
হিরণের সঙ্গে হঠাৎই তার যোগাযোগ ঘটে গিয়েছিল। তিনি রাজদিয়ায় হিরণদের বাড়ি এবং জমিজমার সঙ্গে টালিগঞ্জের এই বাড়িটা এক্সচেঞ্জ করতে চান।
পূর্ব পাকিস্তানে আবহাওয়া যেভাবে বিষময় হয়ে উঠেছে, সেখানে গিয়ে জমিজমা ঘরবাড়ি বেচে টাকা নিয়ে আসা অসম্ভব। হিরণের কানে এসেছে, হিন্দুদের ফেলে আসা বাড়ি টাড়ি এনিমি প্রপার্টি বা শত্রু সম্পত্তি হিসেবে খুব শিগগিরই ঘোষণা করা হবে।
দেশের ভিটেমাটি সম্পর্কে সব আশা যখন প্রায় শেষ, অযাচিতভাবে শওকত আলি খানের প্রস্তাবটা এসেছে। হিরণ ভীষণ উত্তেজিত। সম্ভব হলে আজকালের মধ্যে সে এক্সচেঞ্জটা করে ফেলতে চায়। তার ঠাকুরদা দ্বারিক দত্তও রাজি। কিন্তু জেঠিমা আর সুধার খুবই আপত্তি। একমাত্র হেতু, ‘খান মঞ্জিল’ মুসলমানদের বাড়ি।
হিরণ বলছিল, তুমিই বল বিনু, এত বড় একটা সুযোগ হাতছাড়া করার কোনও মানে হয়? ইস্ট বেঙ্গল থেকে যে হিন্দুরা এপারে চলে এসেছে তাদের অনেকে প্রপার্টি এক্সচেঞ্জ করার জন্যে হন্যে হয়ে ঘুরছে। আমাদের দেরি হলে অন্য কারোর সঙ্গে হয়তো শওকত সাহেব এক্সচেঞ্জের ব্যবস্থা করে ফেলবেন। তখন আপসোসে হাত কামড়ানো ছাড়া আর কিছু করার থাকবে না।
রাজদিয়ায় থাকতে হিরণ ছিল আলাভোলা ধরনের। নিজের পড়াশোনা ছাড়া পার্থিব অন্য কোনও দিকেই তার বিশেষ নজর ছিল না। কিন্তু কলকাতায় এ কোন হিরণকে দেখছে বিনু? মাত্র ক’বছরে যেন অনেক বয়স্ক হয়ে উঠেছে। অত্যন্ত অভিজ্ঞ। এখন তার প্রখর বিষয়বুদ্ধি। প্রবল বাস্তব বোধ। চতুর্দিকে তার সজাগ দৃষ্টি।
হিরণ ফের বলে, আরে বাবা, এক্সচেঞ্জ হবার সঙ্গে সঙ্গেই কি আমরা খান মঞ্জিল’-এ ঢুকে পড়ছি? আগে বাড়িটা রিপেয়ার করে রং করাব। ভেতরকার অনেক কিছু বদলাতে হবে। তারপর তো এখানে বাস করতে আসা। খান মঞ্জিল’ তখন আর খান মঞ্জিল থাকবে না।
