বিনু উত্তর দিল না। হাসতে লাগল। নানা অচেনা অলিগলি দিয়ে তাকে নিয়ে ট্রামরাস্তায় চলে এল হিরণ। সেটা পেরিয়ে আরেকটা রাস্তা ধরে চওড়া একটা খালের ধারে পৌঁছতেই মস্ত বাজার। লম্বা, টানা টানা টিনের চালার তলায় দোকানের সারি। মাছের। মাংসের। ফলের। সবজির। কাঁসা এবং পেতলের বাসনের। এ ছাড়া মুদিখানা। দশকর্মা ভান্ডার।
চালাগুলোর বাইরেও খালের কিনার ঘেঁষে অনেকখানি ফাঁকা জায়গা জুড়ে বিরাট বিরাট ঝকা বোঝাই করে নানা ধরনের আনাজ নিয়ে বসেছে দোকানিরা। দেখেই বোঝা যায়, এরা চাষী শ্রেণীর মানুষ। নিজেরাই সবজি ফলিয়ে বেচতে এসেছে।
খালে এখন ভরা জোয়ার। দু’কুল ছাপিয়ে ঘোলা জল খলবল করতে করতে ছুটে চলেছে।
হিরণ বলল, এটা হল আদিগঙ্গা। উত্তর দিকে আঙুল বাড়িয়ে জানায়, জলের এই ধারাটা কালীঘাটের পাশ দিয়ে চলে গেছে। ওপারে নিউ আলিপুর। যুদ্ধের পর ওখানে নতুন টাউনশিপ গড়ে উঠেছে। কলকাতার পয়সাওলা লোকেরা চমৎকার সব বাড়ি বানিয়ে ওখানে থাকে।
চাষীদের কাছে ঘুরে ঘুরে প্রচুর আনাজ নিল হিরণ। আলু, মোচা, পালং, ধনে পাতা, লাউশাক, সোনালি কুমডোর ফালি। হেমন্তের শুরুতেই ফুলকপি উঠতে শুরু করেছে। তাও চারটে কিনল। সতেজ, টাটকা সবজি। সেগুলোর গায়ে ভোরের শিশির আর মাটি এখনও লেগে আছে।
সবজির পর মাছ। তিন রকম. মাছ কিনল হিরণ। পাকা রুইয়ের পেটি। আড়াই টাকা সের। সঙ্গে মুড়োটা ফাউ। বড় পার্শে, সের দুটাকা। আর মৌরলা। মৌরলাটা অবশ্য সের দরে নয়। ভাগা দিয়ে রাখা ছিল। একেক ভাগায় পোয়া দেড়েকের মতো। দাম এক আনা।
বিনু অবাক হয়ে যাচ্ছিল। সুজনগঞ্জের হাটে কিংবা রাজদিয়া বা তালতলির বাজারে হেমনাথ আর যুগলের সঙ্গে কতবার সে গেছে। কিন্তু কোনও দিন দাঁড়িপাল্লায় ওজন করে মাছ বেচতে দেখেনি। মাছ কেটে বিক্রির রেওয়াজই সেখানে নেই। আস্ত আস্ত রুই কাতলা গরমা বোয়াল কি কোড়াল ব্যাপারিরা বাঁশের কি বেতের বড় বড় চারিতে সাজিয়ে রাখত। দরদাম করে তারা কিনত।
বিনু বলল, সের দরে মাছ বিক্রি হয়, এই প্রথম দেখলাম।
হিরণ বলে, কলকাতায় অনেকদিন এই নিয়ম চালু আছে। বড় মাছ কেটে ওজন করে বিক্রি হয়। চুনো মাছ থাইকো।
খুব ছেলেবেলায় কয়েক বছর বিনু কলকাতায় ছিল। তখন এখানকার বাজারে কখনও যায় নি। মাছ কিভাবে বিক্রি হত, তার ধারণাই নেই। ভাল করে জ্ঞান হবার পর থেকেই তো সে রাজদিয়ায়।
বিনু বলল, দু’টাকা দিয়ে যে রুই মাছের টুকরোটা কিনলেন, ওই টাকায় সুজনগঞ্জের হাটে বিরাট একটা রুই কি কালবাউস পাওয়া যেত। কম করে সেটার ওজন চার থেকে পাঁচ সের।
হিরণ বলল, এটা কলকাতা শহর। এখানে সব জিনিসের দাম ইস্ট বেঙ্গলের চাইতে কয়েক গুণ বেশি।
নিজের চোখেই তা দেখেছে বিনু। সে আস্তে মাথা নাড়ে।
হিরণ থামে নি, যুদ্ধের সময় যখন চাকরি নিয়ে কলকাতায় আসি, কাটা পোনা বার আনায় এক সের পাওয়া যেত। ক’বছরে দাম কত বেড়ে গেছে। এই যে বাড়া শুরু হয়েছে, আর কোনও দিন নামবে না।
বিনু উত্তর দিল না।
বাজার সেরে মিষ্টির দোকান থেকে হাঁড়িবোঝাই রাজভোগ আর সাদা ধবধবে চিনিপাতা দই কিনল হিরণ। দই-মিষ্টির হাঁড়ি বিনুকে দিয়ে মাছ আর আনাজের ব্যাগ নিজের হাতে ঝুলিয়ে নিয়েছে সে। বলল, এক্ষুনি আমরা কিন্তু বাড়ি ফিরছি না।
বিনু বলল, কখন ফিরবেন?
হিরণ বলল, তোমাকে এক জায়গায় নিয়ে যাব। সেখান থেকে বাড়ি ফিরতে হয়তো মিনিট পনের সময় বেশি লাগবে।
বিনু অবাক হচ্ছিল। থলে বোঝাই আনাজপাতি মাছটাছ নিয়ে কার সঙ্গে দেখা করতে চলেছে হিরণ? কৌতূহল হলেও কোনও প্রশ্ন করল না বিনু।
মুখ দেখে বিনুর মনোভাব আন্দাজ করে নিয়েছে হিরণ। একটু হেসে বলল, আমরা কারোর কাছেই যাচ্ছি না। তোমাকে একটা জিনিস দেখাব। সেই জন্যেই যাওয়া
কী দেখাবেন?
অত অধৈর্য কেন? চলই না–
ফের তারা ট্রামরাস্তায় চলে আসে। যে অলিগলি দিয়ে খানিক আগে বাজারে এসেছিল, সেদিকে গেল না হিরণ। অন্যদিকের আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে চলতে লাগল।
এখানে ঝোপঝাড়ে ভরা কিছু কিছু ফাঁকা মাঠ, পানা পুকুর, ডোবা যেমন চোখে পড়ে, তেমনি রয়েছে খাপরা কি টিনে ছাওয়া চাপ বাঁধা বস্তি। পুরনো একতলা দোতলা তেতলাও রয়েছে। অনেকগুলো। দূরে একটা মাজারও দেখা যাচ্ছে।
বস্তির পাশ দিয়ে যেতে যেতে টের পাওয়া যায়, এগুলোতে গরিব মুসলমানেরা থাকে। দিন আনা, দিন-খাওয়া সব মানুষ। সামনের দিকে প্রচুর বাচ্চাকাচ্চা ছোটাছুটি করছে। মেয়েদের গায়ে শস্তা ময়লা ফ্রক। ছেলেদের দড়ি-লাগানো ছেঁড়াফাটা ইজের, জামা কি গেঞ্জি। এক পাল মুরগি তাদের সঙ্গে সমানে পাল্লা দিচ্ছে।
নানা বয়সের কিছু পুরুষ আর মেয়েমানুষও রয়েছে। পর্দার তেমন কড়াকড়ি নেই। সবাই একদৃষ্টে বিনুদের লক্ষ করছে। চোখে মুখে অস্বাচ্ছন্দ্য। নাকি ভয়? কিংবা শঙ্কা? ইন্ডিয়ায় নিরাপত্তার অভাবে কি তারা ভুগছে?
বস্তিটা পেরিয়ে এসে হিরণ বলল, ফর্টি সিক্সের ডাইরেক্ট অ্যাকশানের দিন এখান থেকে মিছিল বেরিয়ে গড়ের মাঠের দিকে গিয়েছিল।
বিনু চকিত হয়ে ওঠে। কলকাতার ডাইরেক্ট অ্যাকশান বা প্রত্যক্ষ সংগ্রামের ইতিহাস তার খুব ভাল করেই জানা। এই তো সেদিনের কথা। লোকের মুখে তো শুনেছেই, এখান থেকে ডাক এডিশনের যে খবরের কাগজ রাজদিয়ায় যেত সেগুলোতে শুধু দাঙ্গার ভয়াবহ বিবরণ। আগুনে-পোড়া বাড়িঘর আর রাস্তায় রাস্তায় সারি সারি মৃতদেহের ছবি। পাতার পর পাতা জুড়ে।
