হিরণ জানায়, যুদ্ধের আমলে এখানে তড়িঘড়ি মিলিটারি হাসপাতাল তৈরি করা হয়েছিল। মালয় সিঙ্গাপুর বর্মা, কি দূর প্রাচ্যের রণাঙ্গনে যে সব ব্রিটিশ বা আমেরিকান সোলজাররা মারাত্মক জখম হয়ে পড়ত, তাদের চিকিৎসার জন্য এই হাসপাতালে উড়িয়ে আনা হত।
যুদ্ধশেষে মিত্রপক্ষের সেনাবাহিনী কবেই দেশে ফিরে গেছে। কিন্তু হাসপাতালটা বন্ধ করা হয় নি। এর দরজা সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে।
হিরণ প্রায় বলতে যাচ্ছিল, ফি বেস্পতিবার যুগল এই হাসপাতালে আসে। পায়ের ঘা ড্রেস করিয়ে তাদের টালিগঞ্জের বাড়িতে চলে যায়। বলতে গিয়েও থমকে গেল।
যুগলের নাম শুনলে ঝিনুকের কী প্রতিক্রিয়া হবে, কে জানে। হিরণ শুনেছে, চেনাজানা কারোর সামনেই বেরুতে চায় না মেয়েটা। তার আতঙ্ক, পরিচিতেরা যেন তার দিকে আঙুল উঁচিয়ে জানিয়ে দেবে, ঢাকায় তোমার কী হয়েছে, আমরা সব জানি, সব জানি। তখন লজ্জায় গ্লানিতে দম বন্ধ হয়ে আসবে ঝিনুকের।
সামনের বেস্পতিবার অবধারিত নিয়মে যুগল তাদের বাড়ি আসবে। ঝিনুকের সঙ্গে তার দেখাও হবে। তখন কী হতে পারে, পরিষ্কার আঁচ করে নেওয়া যায়। চিন্তাটাকে এতটুকু আমল দিল না হিরণ। ভাবল, যা হবার হবে। বহুকাল বাদে যে ঝিনুক খুশিতে ঝলমল করছে, তার এই ক্ষণিক আনন্দটুকু এই মুহূর্তে যুগলের কথা তুলে কেড়ে নেওয়া যায় না।
আরও কিছুক্ষণ পর পশ্চিম দিকের উঁচু উঁচু বাড়ি আর গাছপালার পরপারে সূর্য ডুবে যায়। মিহি হিম পড়তে শুরু করে। ধীর পায়ে নেমে আসে হেমন্তের সন্ধে। চারদিকে অজস্র আলো জ্বলে ওঠে।
এই সময় হিরণরা বাড়ি ফিরে যাচ্ছিল। পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে বার বার বিনুর চোখ চলে যাচ্ছে ঝিনুকের দিকে। মাত্র একটা দিনের ভেতর কত বদলে গেছে মেয়েটা। কত উজ্জ্বল, কত জীবন্ত।
সুধা আর হিরণের সঙ্গে সমানে কল কল করছে ঝিনুক। হেসে উঠছে কথায় কথায়। মাঝখানের ক’টা বছর তার ভেতর যে জলপ্রপাতটা চাপা পড়ে ছিল, হঠাৎ সেটা বেরিয়ে পড়েছে।
হিরণ আর সুধার পরিকল্পনাটা অনেক আগেই ধরে ফেলেছিল বিনু। এই যে লেকে বেড়াতে নিয়ে আসা, ফুচকা আর আইসক্রিম খাওয়া, মাছেদের মুড়ি খাওয়ানো, জলের কিনারে বসে বাইচের নৌকোর ছোটাছুটি দেখা, সাদার্ন অ্যাভেনিউর ফুটপাত ধরে উদ্দেশ্যহীনের মতো ঘোরাঘুরি–অতি সামান্য, অতি তুচ্ছ এই ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে সুধাদের একটাই লক্ষ্য। দুঃস্বপ্নের মতো ঢাকার সেই কটা দিন তার স্মৃতি থেকে যাতে মুছে যায় সেজন্য সর্বক্ষণ, শতভাবে তাকে অন্যমনস্ক রাখা।
হিরণ বলছিল, আজ লেকে বেড়ানো হল। কাল তোমাদের কোথায় নিয়ে যাব, মনে আছে তো?
ঝিনুক ভুলে গিয়েছিল। উৎসুক সুরে জিজ্ঞেস করল, কোথায় হিরণদা?
হিরণ বলল, জলসায়।
জলসা কী?
কাল গেলেই দেখতে পাবে।
.
৩.২৭
পরদিন সকালে চায়ের পর্ব চুকিয়ে হিরণ বলল, চল বিনু, বাজারটা সেরে আসি।
কাছেই দুটো বেতের মোড়ায় বসে ছিল ঝিনুক আর সুধা। বিনুর চোখ ঝিনুকের দিকে ঘুরে গেল। হয়তো নিজের অজান্তে, কিংবা স্বয়ংক্রিয় কোনও অভ্যাসে। সামান্য ইতস্তত ভাব। জিজ্ঞেস করল, হিরণদার সঙ্গে ঘুরেই আসি, কী বল?
রাজদিয়ায় হেমনাথের পুকুরঘাটে রাজেকের নৌকোয় ওঠার পর থেকে এক লহমাও বিনুকে চোখের আড়াল করতে চাইত না ঝিনুক। সবসময় তাকে আঁকড়ে থাকত। কোনও জরুরি কাজে কোথাও গেলে ভীষণ উতলা হয়ে উঠত। কেঁদেকেটে পৃথিবী উথলপাথল করে ফেলত। তখন দিবারাত্রি তার আতঙ্ক, বিনু কোথাও গিয়ে যদি ফিরে না আসে, কে তাকে দেখবে? চারপাশের সহস্র বিপদ থেকে কে তাকে রক্ষা করবে? এই বিপুল পৃথিবীতে সে হয়ে পড়বে সম্পূর্ণ একা, একেবারে অসহায়। ঢাকার সেই ধর্ষক বাহিনীর মতো অগুনতি হানাদার জগৎ জুড়ে থিক থিক করছে। বিনু আগলে না রাখলে জন্তুগুলো তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাবে তার শরীরটা।
সেই ঝিনুকই হেসে বলল, আমাকে জিজ্ঞেস করার কী আছে? যাও না—
হিরণ নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। কাল থেকে ঝিনুককে যত দেখছে, বিস্ময়ের মাত্রাটা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। যে মেয়েটা অসীম ত্রাসে আর উৎকণ্ঠায় নিজেকে শক্ত আবরণের মধ্যে গুটিয়ে নিয়েছিল, খোলা ভেঙে একদিনেই সে বেরিয়ে এসেছে। ভালবাসার উত্তাপ কি সব শঙ্কা হরণ করে নেয়?
সুধার কাছ থেকে মাছ এবং আনাজপাতির জন্য আলাদা দু’টো চটের ব্যাগ নিয়ে বিনুকে সঙ্গে করে বেরিয়ে পড়ল হিরণ।
রাস্তায় এসে পানের দোকান থেকে ছ’আনায় এক প্যাকেট ক্যাপস্টান নেভি কাট সিগারেট কিনে, একটা স্টিক বার করে ধরিয়ে নিল।
বিনু হাঁ হয়ে গিয়েছিল। রাজদিয়ায় থাকতে হিরণ ছিল নিপাট ভাল ছেলে। ছোট ছোট করে মাথায় কদমফুল ছাঁট দিত। বিলাসিতা বলতে কিছু ছিল না। নেশাভাঙের ধারেকাছে ঘেঁষত না। এমনকি দাঁতে সুপরি পর্যন্ত কাটত না। মুখশুদ্ধি বলতে শুধু যোয়ান কি লবঙ্গ। সেই হিরণ কিনা সিগারেট ধরেছে!
মজা করতে ইচ্ছা হল বিনুর, কলকাতায় এসে আপনার কিন্তু বেশ উন্নতি হয়েছে হিরণদা–
ইঙ্গিতটা ধরতে পেরেছিল হিরণ। তার মুখে অপ্রতিভ হাসি ফোটে। মাথা চুলকে বলে, ডিফেন্সের চাকরিতে ঢুকে বন্ধুদের পালায় পড়ে বদভ্যাসটা হয়ে গেছে। হেমদাদু জানতে পারলে ঘাড় থেকে মুন্ডুটা ঘচাং করে নামিয়ে দেবেন। কতবার ভেবেছি, সিগারেটটা ছেড়ে দেব। কিন্তু হ্যাঁবিট একবার কাঁধে চেপে বসলে ছাড়ানো মুশকিল। কামড়ে ধরে থাকে।
