খানিক আগে বিনুরা রামকেশবের বাড়িতে ছিল। অনেক মানুষ, অজস্র হইচই বা ফেনায়িত কোলাহল–সব মিলিয়ে যেন একটা সজীব রঙিন মেলার ভেতর অনেকখানি সময় কাটিয়ে এসেছে। তুলনায় এ বাড়ির নির্জনতা, নৈঃশব্দ চোখে কানে বিধতে লাগল।
একটু পর অধরের পিছু পিছু মস্ত একখানা ঘরের মধ্যে চলে এল বিনুরা। ঘরটার একধারে চেলা কাঠের পাহাড়। খুব সম্ভব দুতিনটে বড় বড় গাছ কেটে ওভাবে রাখা হয়েছে। আরেক পাশে সারি সারি সাজানো অনেকগুলো পেতলের নতুন কলসি, কাঁসার থালা-বাটি-গেলাস, আর নতুন নতুন খাট। তা ছাড়া, আরও অসংখ্য জিনিস।
এক পলকে সব দেখে নিয়ে জিজ্ঞাসু চোখে অধরের দিকে তাকালেন হেমনাথ।
মুখ কাচুমাচু করে অধর বলল, আপনের লগে পরামশ্য না কইরাই এইসব কিনাকাটা সারছি বড়কত্তা। একটু থেমে আবার বলল, দ্যাখেন জিনিসগুলান–একেবারে বাছা বাছা, পছন্দসই। কোনও শালায় কইতে পারব না অধর সা’ দানে খারাপ জিনিস দিছে।
হেমনাথ বিমূঢ় মুখে বললেন, কিন্তু ব্যাপারটা কী?
হেমনাথের চোখে চোখ রেখে অধর শুধলো, বুঝতে পারেন নাই?
না। ধীরে ধীরে হেমনাথ মাথা নাড়লেন।
একটু চুপ করে থেকে অধর বলল, দানসাগর ছাদ্দ করুম।
শ্রাদ্ধ!
হ।
কার?
কার আবার, আমার। নিজের বুকে একটা আঙুল রেখে অধর সাহা ফিসফিস করে বলল।
আর হেমনাথ যেন কথা বলতে ভুলে গিয়ে একেবারে বোবা হয়ে গেলেন। তার চোখমুখ দেখে মনে হল, এমন আজগুবি কথা চৌষট্টি পঁয়ষট্টি বছরের জীবনে আর কখনও শোনেন নি।
একটু কি ভেবে নিয়ে অধর আবার বলল, উই যে লাকড়ি (চেলা কাঠ) দেখতে আছেন, এগুলান দিয়া আমি মরলে আমারে পোড়ান হইব। আর এই নূতন খাটপালং থাল-ঘটি-গেলাস-বাটি-হগল দানের জিনিস। ছাদ্দের সোময় বামনগো দিমু। বুঝলেন নি বড়কত্তা, মরার আগেই নিজের ব্যবোস্তা নিজেই কইরা রাখলাম। অ্যামন কি আগামী বচ্ছর গয়ায় গিয়া নিজের পিন্ডটাও দিয়া আসুম।
নিষ্পলক তাকিয়ে ছিলেন হেমনাথ। এতক্ষণে কথা বললেন, হঠাৎ তোমার ঘাড়ে এ পাগলামি চাপল কেন?
ঠিক এভাবে হেমনাথ বলবেন তা যেন আশা করে নি অধর। আহত সুরে বলল, এরে আপনে পাগলামি কন!
তা ছাড়া কী?
হেমনাথের কথার উত্তর না দিয়ে অধর বলল, আপনে তো হগলই জানেন বড়কত্তা—
হেমনাথ বললেন, কী জানি?
আমার পোলা দুইখান ক্যামন। অধর সাহা বলতে লাগল, দশ বচ্ছর তারা আমার লগে সম্পর্ক রাখে নাই। তাগো ভরসা করি না। কিন্তুক–
হেমনাথ প্রশ্ন করলেন, কিন্তু কী?
হিন্দু হইয়া জন্মাইছি। মরার পর কে ছাদ্দ করব, কে পিন্ডি দিব তার তো ঠিক নাই। ওইটুকের লেইগা আত্মার সদগতি হইব না! পরকাল বইলা তো একখান কথা আছে।
তোমার ভালমন্দ কিছু হলে ছেলেরা আসবে না, এমন কথা আগে থেকেই ভবছ কেন? তা ছাড়া বলতে নেই, তোমার স্বাস্থ্য বেশ ভালই। বয়েসেও আমার চাইতে ঢের ছোট। এর ভেতর মরার চিন্তা তোমার মাথায় চুল কী করে?
দার্শনিকের মতো মুখ করে অধর বলল, বড়কত্তা, মাইনষের জীবন বড় তাজ্জবের বস্তু। এই আছে, এই ফা। কার কখন ওপারের ডাক আইব, কেউ জানে না। রাবণের সিঁড়ির লাখান ছাদ্দশান্তি আমি ফেলাইয়া রাখুম না।
হেমনাথ উত্তর দিলেন না।
বিনুর এইসব কথাবার্তা ভাল লাগছিল না। টিনের তেতলা দেখার বিস্ময়টাও ধীরে ধীরে কখন ফিকে হয়ে গেছে। সে উসখুস করতে লাগল। এদিকে অবনীমোহন সুধা আর সুনীতি চুপচাপ। তাদের মুখচোখ দেখে প্রতিক্রিয়া বোঝা যাচ্ছে না।
অধর আবার বলল, ভাবতে আছি পূজার পরেই এট্টা ভালা দিন দেইখা ছাদ্দটা চুকাইয়া ফেলুম। একশ’জন ভাল বামন ভোজন করামু। আইচ্ছা বড়কত্তা, কারে কারে ডাকা যায় কন তো?
হেমনাথ বললেন, এখনও তো দেরি আছে। পরে এ নিয়ে ভাবা যাবে। আজ চলি।
অহনই যাইবেন?
হ্যাঁ। আজ আর দেরি করতে পারব না। বিনুদের নিয়ে হেমনাথ ঘরের বাইরে বেরিয়ে এলেন। সেখান থেকে সিঁড়ি বেয়ে একতলায়। তারপর ঝুপসি বাগান পেরিয়ে সোজা দক্ষিণগামী বড় রাস্তায়।
অধরও সঙ্গে সঙ্গে এসেছিল। সে বলল, দুই চাইর দিন পর আমি কিন্তুক আপনের বাড়িত যামু।
হেমনাথ বললেন, এস।
ছাদ্দশান্তির ব্যাপারে আপনের লগে মেলা (অনেক) পরামশ্য আছে।
আচ্ছা, আচ্ছা–
অধর সঙ্গে সঙ্গে হাঁটছিল। হেমনাথ বললেন, কথা তো হয়ে গেল। এই রোদের ভেতর কষ্ট করে আর তোমাকে যেতে হবে না।
অধর দাঁড়িয়ে পড়ল। হেমনাথরা এগিয়ে গেলেন।
দাদুর পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে অধর সাহার কথা কিন্তু ভাবছিল না বিনু। বার বার ঝিনুকের কথাই মনে পড়ে যাচ্ছিল। এ পাড়ায় আসা হল। সেই সকাল থেকে এতখানি বেলা পর্যন্ত রামকেশব আর অধর এই দুটো লোক তাদের আটকে রাখল অথচ ঝিনুকদের বাড়িতেই শুধু যাওয়া হল না। বার বছরের বিনুর ছোট্ট, উষ্ণ, কোমল মনটা সেজন্য ভারাক্রান্ত হয়ে আছে।
খানিক যাবার পর অবনীমোহন শুধোলেন, লোকটা অদ্ভুত তো—
বিনু বুঝল, অধরের কথা বলছেন অবনীমোহন। সে জানে মানুষ মরে টরে গেলে অন্যেরা তার শ্রাদ্ধ করে। কিন্তু একটা লোক জীবিত অবস্থায় নিজের শ্রাদ্ধ নিজেই করতে যাচ্ছে দেখেও বিনু খুব অবাক হল না, তেমন কৌতূহলও বোধ করল না। ঝিনুক যেন চারদিকের সব কিছু থেকে তাকে অন্যমনস্ক করে রেখেছে।
হেমনাথ মৃদু হাসলেন, তা একটু—
অবনীমোহন বললেন, এমন লোক আগে আর কখনও দেখি নি।
উত্তর না দিয়ে হেমনাথ হাসতে লাগলেন।
