কলকাতায় এসে বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে এই নতুন নেশাটা ধরেছি। নিষ্পাপ নেশা কিন্তু– বলতে বলতে হিরণের নজর গিয়ে পড়ল ঝিনুকদের হাতের দিকে, আরে, ঠোঙা এখনও অর্ধেক খালি হয় নি। মাছেদের দাও–
আবার মুড়ি ছিটনো শুরু হয়। একেকটা ঘাঘী মাছ চতুর খেলোয়াড়দের মতো মুড়ি লুফে নিচ্ছে আর মাথা ঝাঁকিয়ে মাকিয়ে হেসে কুটিপাটি হচ্ছে ঝিনুক।
মৎস্য ভোজন শেষ হলে হিরণ বলল, অনেকক্ষণ হাঁটাহাঁটি হয়েছে। চল, ওধারে গিয়ে একটু বসি—
সবারই তাই ইচ্ছা। হাঁটাহাঁটিই শুধু নয়, বেশ খানিকটা সময় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মাছেদের খাওয়ানো হয়েছে। পা ধরে গেছে। এখন জিরানো দরকার।
পুল পেরিয়ে দ্বীপে এল হিরণরা। একধারে মসজিদ। আরেক দিকে জলের পার ঘেঁষে বাসার জন্য লম্বা, সাদা ক’টা বেঞ্চ। সেগুলোর পায়া সিমেন্টে গাঁথা।
সবাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে পড়ে। দ্বীপের দু’ধারে যতদূর চোখ যায়, দিগন্ত অব্দি অথৈ জলের বিস্তার। শেষ বিকেলের সোনালি আলো লেকের স্বচ্ছ জলে টলমল করছে। এখনও কুয়াশা পড়তে শুরু করে নি। মেঘলেশহীন আকাশের নীল ছুঁয়ে ছুঁয়ে ডানা মেলে ভাসছে ক’টা পাখি। শঙ্খচিল? নিচের পৃথিবী থেকে চেনা যায় না। বাতাস বয়ে যাচ্ছে উত্তর থেকে। স্নিগ্ধ। ঝিরঝিরে। মালিন্যহীন। লেকের দক্ষিণ দিক দিয়ে একটা ট্রেন ধোঁয়ায় আকাশ মলিন করে ঝকর ঝকর ছুটে গেল। বেশিক্ষণ নয়, হেমন্তের হাওয়া কয়েক লহমায় সব ময়লা মুছে দিল। আকাশ ফের যেমনকে তেমন।
চারদিকের গাছপালার মাথায়, নিবিড় সবুজ ঘাসে, সামনের পুলটার গায়ে হেমন্তের অপার্থিব মায়া যেন মাখানো।
ঝিনুকের পুরনো কৌতূহলগুলো ফের ফিরে আসে, আচ্ছা হিরণদা, আসার সময় যে রেল লাইন দেখেছিলাম, সেটাই কি ওখান দিয়ে গেছে?
হিরণ মাথা নাড়ে, হ্যাঁ—
এই লেকটা কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছে?
একধারে সেই চিলড্রেন্স পার্ক–কোনাকুনি হাত বাড়িয়ে হিরণ বলল, আর ওধারে ঢাকুরিয়া পর্যন্ত।
হঠাৎ চোখে পড়ল, পশ্চিম দিকে একজোড়া সরু লম্বা বোট ঝুলন্ত সাঁকোর তলা দিয়ে বিদ্যুৎ গতিতে বেরিয়ে এল। একেকটা বোটে চারজন। সবার একই রকম পোশাক। দুধসাদা হাফ প্যান্ট আর হাফ-হাতা গেঞ্জি। হাতে একই মাপের লম্বা লম্বা দাঁড়। দাঁড়গুলো একসঙ্গে জলে পড়ছে। একই ছন্দে। জল তোলপাড় হয়ে ঢেউ উঠছে উঁচু উঁচু। সাঁই সাঁই ছুটে যাচ্ছে বোট। হেমন্তের বোদ শতখান হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে সারা লেকে।
মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে ছিল ঝিনুক। পলকে দুই বোট অনেক দূরে চলে যায়। সে জিজ্ঞেস করল, এখানেও আমাদের দেশের মতো বাইচ খেলা হয়?
হিরণ মাথা সামান্য হেলিয়ে দেয়, হু। ইংরেজিতে বলে রোয়িং। ওপারে গোলাপি রঙের একতলা একটা বাড়ি দেখিয়ে বলল, ওটা রোয়িং ক্লাব। ওখানে বোট চালাতে শেখানো হয়। সে আরও জানায়, মাসখানেক পর এখানে রোয়িং কমপিটিশন হবে। ভারতবর্ষের নানা অঞ্চল থেকে কমপিটিটররা এসে প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে।
ঝিনুক দেখতে পেল, ওখানে জলের ধার ঘেঁষে লাইন দিয়ে অনেকগুলো কঁকা ছিপ নৌকো। বেশ কিছু লোকজন রোয়িং ক্লাবের সামনের প্রশস্ত লনে বেতের চেয়ারে বসে আছে। অনেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। তাদের হাতে লম্বা দাঁড়। খুব সম্ভব বোটে ওঠার তোড়জোড় চলছে।
রোদ আরেকটু মরে এলে হিরণ সবাইকে নিয়ে উঠে পড়ে। চল, সাদার্ন অ্যাভেনিউর দিকটা দেখিয়ে আনি।
সেতু পেরিয়ে গল্প করতে করতে সবাই খুব চওড়া একটা রাস্তায় চলে আসে। দু’ধারে চওড়া ফুটপাত। কোথাও ধুলোময়লা জমে নেই। পরিচ্ছন্ন। ছিমছাম।
রাস্তাটার দুপাশে গাড়ি চলাচলের জন্য মসৃণ পথ। মাঝখানে বড় বড়, চতুষ্কোণ আইল্যান্ডগুলো ঘন সবুজ ঘাসে ঢাকা। কোনও কোনওটায় আঁকাবাঁকা, গভীর গর্ত খুঁড়ে রাখা হয়েছে। যেখানে যেখানে ঘাসের জমি, গর্ত নেই, সেখানে বাঁশের গোলপোস্ট পুঁতে ছেলেরা ফুটবল খেলছে।
যে আইল্যান্ডগুলোতে গর্ত, সেগুলো দেখিয়ে ঝিনুক বলে, এত সুন্দর জায়গায় এমন বিশ্রী খোঁড়াখুঁড়ি করে রেখেছে কেন?
হিরণ বলল, ওগুলো ট্রেঞ্চ। যুদ্ধের সময় জাপানি বোমার হাত থেকে বাঁচার জন্যে সাইরেন বাজলেই লোকজন গর্তগুলোর ভেতর ঢুকে পড়ত। সে বলতে লাগল, সাদার্ন অ্যাভেনিউর মাঝখানে যত আইল্যান্ড দেখছ, সবগুলোতে ট্রেঞ্চ কাটা হয়েছিল। যুদ্ধের পর বেশির ভাগ বুজিয়ে ফেলা হয়েছে। সেগুলোতে এখন ছেলেরা ফুটবল কি ক্রিকেট খেলে। বাকি গর্তগুলোও কর্পোরেশন শিগগিরই বুজিয়ে দেবে।
কিছুক্ষণ আগে লেকে ঢুকে ভাঙাচোরা সেনাশিবির দেখেছিল ঝিনুকরা, এখন দেখল ট্রেঞ্চ। মনে হল, মহাযুদ্ধের এমন স্মৃতি এখনও হয়তো এ শহরে আরও কিছু কিছু থেকে গেছে।
যে ফুটপাত দিয়ে ওরা হাঁটছিল তার উলটো দিকে সারি সারি মস্ত মস্ত বাড়ি। বেশির ভাগেরই সামনের দিকে অনেকটা জায়গা জুড়ে বাগান।
রাস্তা পার হয়ে হিরণরা হাঁটতে হাঁটতে যেখানে চলে এল তার পাশে বিশাল এলাকা জুড়ে সাদা রঙের অগুনতি ব্যারাক। সেগুলোর মাথায় অ্যাসবেস্টসের ছাউনি। রাস্তার দিকে বিরাট গেট।
ঝিনুক জিজ্ঞেস করে, এখানে কারা থাকে? মিলিটারিরা? খানিক আগে লেকের ও-প্রান্তে যে আধভাঙা ব্যারাক দেখেছিল সেগুলোর কথা তার মনে পড়ে গেছে। এই প্রশ্নটাই হয়তো তার মাথায় এসেছে, ওধারের ব্যারাক ভেঙেচুরে ফেললেও, এগুলো এখনও অটুট কেন? শুধু তাই নয়, বেশ সাজানো গোছানো। সব সেনা কি তা হলে চলে যায় নি?
