ঝিনুক আঙুল বাড়িয়ে বলে, এগুলো কিসের বাড়ি?
হিরণ জানায়, বাড়িগুলো মিলিটারি ব্যারাক। যুদ্ধে গোড়ার দিকে সারা লেক জুড়ে টমিদের জন্য অগুনতি সেনাশিবির তৈরি হয়েছিল। যুদ্ধশেষে টমিরা চলে যায়। ব্যারাকগুলোর প্রয়োজনও ফুরোয়। এই ক’বছরে প্রায় সব ব্যারাকই ভেঙে ফেলা হয়েছে। যে কটা রয়েছে, সেগুলোর আয়ুও ফুরিয়ে এল বলে। লেকের পাড় থেকে মহাযুদ্ধের একটা স্মৃতি চিরতরে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।
ব্যারাকগুলো পেরিয়ে খোলামেলা বড় একটা জায়গায় এসে পড়ল সবাই। এখানে গাছপালা নেই, শুধু সবুজ ঘাসের গালিচা। একধারে লাইন দিয়ে বাদামওলা, ফুচকাওলা, আইসক্রিমওলা, ঝালমুড়িওলারা খদ্দের সামলাতে হিমসিম। এছাড়া রয়েছে গরম চা, গুলাবি রেউড়ি, ক্যান্ডি ফ্লস, কুড়মুড় ভাজা, এমনি রকমারি খাবার। হিরণ ঝিনুককে বলল, তোমাকে এমন একটা জিনিস খাওয়াব, জীবনে কখনও খাও নি। এমনকি চোখেও দেখ নি।
ঝিনুক উৎসুক সুরে জিজ্ঞেস করে, কী জিনিস?
চলই না–
একটা ফুচকাওলার কাছে এসে সবাইকে ফুচকা দিতে বলল হিরণ। হাতে হাতে শালপাতার ঠোঙা ধরিয়ে, পরমাশ্চর্য দক্ষতায় ছোট ছোট লুচির সাইজের কড়কড়ে গোলকগুলো ফুটো করে, সেদ্ধ আলু মটর আর তেঁতুলগোলা জল ভেতরে ভরে, একের পর এক দিয়ে যেতে লাগল লোকটা।
এমন খাদ্যবস্তু সত্যিই আগে কখনও দেখে নি ঝিনুক। সে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে লক্ষ করতে লাগল।
হিরণ তাড়া দেয়, কী হল, খাও–
ফুচকা তুলে মুখে পোরে ঝিনুক। সম-পরিমাণ টক ঝাল আর নুনের মিশ্রণে ভারি উপাদেয়। মুখের ভেতরটা অচেনা, অপূর্ব স্বাদে ভরে যায়। ঝিনুকের মনে হল, কলকাতায় কত কিছুই না পাওয়া যায়!
মাথাপিছু আটটা করে ফুচকা। সব মিলিয়ে চারজনে বত্রিশটা, মোট দাম ছ’আনা।
পয়সা মিটিয়ে দিয়ে হিরণ জিজ্ঞেস করে, ফুচকা কেমন লাগল?
মাথা অনেকখানি হেলিয়ে দেয় ঝিনুক, খুব ভাল–
ফুচকার পর হিমশীতল আইসক্রিম। চকোলটের পুরু কোটিং লাগান। একেকটা দু’আনা। আইসক্রিমের পর চার ঠোঙা ঝালমুড়ি কিনল হিরণ।
ফুচকা এবং আইসক্রিম খেয়ে পেট বোঝাই হয়ে গিয়েছিল। ঝিনুক সুধা বিনু, সবাই প্রবল আপত্তি জানায়। এখন আর কিছু খাওয়া সম্ভব নয়।
হিরণ বলল, এগুলো আমাদের জন্যে নয়। মাছেরা খাবে।
ঝিনুক অবাক, এখানে মাছ কোথায়?
আছে আছে। চল–
ফুচকাওলা আইসক্রিমওলাদের পেছনে ফেলে কোনাকুনি বাঁ দিকের সরু রাস্তা ধরে একটা পুলের কাছে চলে এল ওরা। কাঠের পাটাতন-বসানো ঝুলন্ত সাঁকোটা এত সরু, তিনজনের বেশি পাশাপাশি চলতে পারে না। লেকের মাঝখানে একটা ছোট্ট দ্বীপে গিয়ে ওটা নেমেছে। দ্বীপটার এক ধারে ছোট্ট মসজিদ। সাদা ধবধবে।
পুলের ওপর বেশ কিছু লোকজন। দু’ধারের রেলিংয়ের ওপর ঝুঁকে জলে মুড়ি ছুঁড়ে ছুঁড়ে দিচ্ছে।
হিরণরা সাঁকোর মধ্যিখানে এসে ভিড়ের ভেতর জায়গা করে নেয়। নিচে আঙুল বাড়িয়ে সে বলে, ওই দেখ–
মুড়ি ফেললেই ঝাকে ঝাকে মাছ জলে ঘাই মেরে মেরে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। বেশির ভাগই বিরাট বিরাট আকারের বয়স্ক রুই, কাতলা আর মৃগেল। বেশ ক’টা কালবোসও। সেগুলোর গায়ে পুরু শ্যাওলা। ছোট মাছগুলোকে তারা কাছেই ঘেঁষতে দিচ্ছে না।
এই সব বড় মাছের কয়েকটার দক্ষতার তুলনা নেই। মুড়ি জলে পড়ার আগেই জল থেকে দু’তিন হাত উঁচুতে লাফিয়ে উঠে হাঁ করে মুখের ভেতর পুরে ফেলছে।
হিরণ ঝিনুককে বলে, কিরকম প্র্যাকটিস করেছে, দেখেছ! দাও দাও, ওদের মুড়ি দাও–
ওপর থেকে মুড়ি ছড়াতে ছড়াতে একেবারে বালিকা হয়ে যায় ঝিনুক। তার দু’চোখে খুশি চলকাতে থাকে, উঃ, কত মাছ হিরণদা!
ঝিনুককে যত দেখছে, বিস্ময়টা ধাপে ধাপে বেড়েই চলেছে বিনুর। কত কাল পর তাকে এমন উচ্ছ্বসিত, এমন খুশি হবে দেখছে সে!
হিরণ বলল, সারা লেকটাই মাছে বোঝাই। মাঝে মাঝে ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট টিকেট বেচে বড়শি দিয়ে ধরতে দেয়। গেল বছর কী হয়েছিল, জানো?
কী?
একটা সাড়ে চার সের ওয়েটের কালবোস ধরে নিয়ে গিয়েছিলাম–
সুধা ঠোঁট বাঁকিয়ে ভ্রুকুটি হানে, কাঁচকলা—
ঝিনুক জিজ্ঞেস করে, মানে?
মাছ ধরেছে না, ছাই। লেক মার্কেট থেকে কিনে নিয়ে গিয়েছিল। তিন দিন ধরে চার তৈরি করা, বন্ধুদের সঙ্গে দিনরাত হইহই করে পরামর্শ। তার রেজাল্ট কী হল? কপাল কুঁচকে বুড়ো আঙুল নাচাতে লাগল সুধা। পরক্ষণে বলল, খালি হাতে কী করে বাড়িতে ঢোকে! মুখরক্ষার জন্যে বাজারে ছুটেছিল।
হিরণ কপট রাগে ঝাঁঝিয়ে ওঠে, এই, একদম বাজে কথা বলবে না। আমার সঙ্গে যারা মাছ ধরতে গিয়েছিল তারা তোমাকে বলে নি?
সুধা একটুও দমে না, চোরের সাক্ষী গ্রন্থিছেদক– বি. এতে তার সংস্কৃত ছিল। গ্রন্থিছেদক তারই নমুনা।
হিরণ এবং সুধার এই খুনসুটিটা বড়ই মনোরম। ভীষণ মজা পাচ্ছিল বিনু আর ঝিনুক। বিনু খুঁচিয়ে দেবার জন্য বলে, ছোটদি যা বলল তা কি সত্যি?
হিরণ বলল, তুমিও পেছনে লাগলে? ঠিক আছে, আসছে মাসে ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট আবার মাছ ধরতে দেবে। তোমাকে সঙ্গে নিয়ে আসব। সেবার সাড়ে চার সের ওজনের কালবোস ধরেছিলাম। এবার মিনিমাম দশ সেরের কাতলা তুলব। নিজের চোখে দেখলে বিশ্বাস হবে তো?
নিশ্চয়ই। ছোটদির টা ফো তখন আর চলবে না। কিন্তু—
আবার কী হল?
রাজদিয়ায় থাকতে কোনও দিন তো আপনাকে মাছ ধরতে দেখিনি।
