বিনু তাকিয়েই ছিল। হিরণ আর সুধা ঝিনুককে অন্ধকার পাতাল থেকে আলোয় তুলে এনেছে। ছোটদি আর ছোট জামাইবাবুটির জন্য কৃতজ্ঞতায় তার বুক ভরে যাচ্ছিল। তারা সুনীতিদের বাড়ি গিয়ে কাল রাতে একটু কষ্ট করে, খুঁজে পেতে যদি সুধাদের কাছে চলে আসত! পরক্ষণে হালকা একটা ভাবনা বিনুর মাথায় ছায়া ফেলে যায়। হেমনলিনীর মতো সুধারাও যদি আবর্জনার মতো ঝিনুককে একধারে ফেলে রাখত! না, সে সব চিন্তা করার এখন আর কোনও মানে হয় না।
.
দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর খানিকক্ষণ গড়িয়ে নিল হিরণরা। তারপর বেলা পড়ে এলে বেরিয়ে পড়ল। লেক এখান থেকে বেশি দূরে নয়। পায়ে হাঁটা দূরত্বে। হেঁটেই তারা চলে যাবে।
বড় রাস্তায় এসে ওরা ডানদিকের ফুটপাত ধরল। কাল আর আজ, মোট চার বার এখানে যাতায়াত করেছে বিনু। এখন ভাল করে লক্ষ করল, কলকাতার এদিকটায় তুলনায় মানুষজন কম। জমজমাট হয়ে উঠতে সময় লাগবে। ছাড়া ছাড়া বাড়িঘর, দোকানপাট, মাঝে মাঝে ফাঁকা জমি। উলটো দিকে খোলার চালের চাপ-বাঁধা বস্তি। অনেকটা এলাকা জুড়ে।
রাস্তাটা কিন্তু খুব পরিষ্কার। আবর্জনাশূন্য। মধ্যিখান দিয়ে ধাতব গুঞ্জন তুলে ট্রাম চলে যাচ্ছে। কোনওটা উত্তরে। কোনওটা দক্ষিণে। সেগুলোর গা ঘেঁষাঘেঁষি করে পাল্লা দিচ্ছে প্রাইভেট কার, ঘোড়ার গাড়ি আর পাবলিক বাস। কচিৎ দু’চারটে ট্যাক্সি। সেগুলোর স্টিয়ারিং ধরে বসে আছে দাড়িপাগড়িওলা শিখ ড্রাইভার। বাস কন্ডাক্টররা সরু, মোটা আর খ্যাসখেসে গলায় যান্ত্রিক সুর টেনে টেনে হেঁকে যাচ্ছে, খালি গাড়ি। আসেন আসেন। কালীঘাট, ভবানীপুর, ধরমতল্লা’ কিংবা টালিগঞ্জ, রানীকুঠি, গড়িয়া–
এলোমলো কথা বলতে বলতে ওরা রেলব্রিজের তলায় চলে এল। মাথার ওপর রেল লাইন, তলায় মানুষজন এবং গাড়িঘোডা চলার পথ।
এই মুহূর্তে একটা ট্রেন কয়লার ধোঁয়ায় আকাশ কালো করে, সিটি বাজাতে বাজাতে পশ্চিম দিকে ছুটে যাচ্ছিল।
ঝিনুক জিজ্ঞেস করল, ট্রেনটা কোথায় যাচ্ছে হিরণদা?
হিরণ বলল, বজবজ।
অনেক দূর?
না, কাছেই। এখান থেকে সাত আট মাইল।
কী আছে সেখানে?
ওটা ছোট শহর। চারদিকে অবশ্য প্রচুর কলকারখানা–
প্রায় সঙ্গে সঙ্গে উলটো দিক থেকে আরেকটা ট্রেন এসে পড়ল। আগের ট্রেনটার পাশ দিয়ে হুস হুস ছুটে গেল পুব দিকে।
ঝিনুক জানতে চাইল, আর এই ট্রেনটা?
এটা যাবে শিয়ালদায়—
পরশু গোয়ালন্দ থেকে যেখানে এসে আমরা নেমেছিলাম?
হ্যাঁ।
দাঙ্গার সময় ঢাকা থেকে উদ্ধার করে আনার পর জগতের কোনও বিষয়ে লেশমাত্র আগ্রহ ছিল না ঝিনুকের। পৃথিবী নামে এই গ্রহের অস্তিত্ব একেবারে লোপ পেয়ে গিয়েছিল তার কাছে। ঘরের কোণে পড়ে থাকত অসাড় স্নায়ু নিয়ে। সারাক্ষণ মুহ্যমান। কখনও বুক নিঙড়ে বেরিয়ে আসত সকরুণ কান্নার ধ্বনি। সেই ঝিনুকই অপার কৌতূহলে জানতে চাইছে কোন ট্রেনের গন্তব্য কোথায়। হয়তো এই সব ট্রেনে কোনও দিনই তার চড়া হবে না।
কাল সন্ধে থেকে আজ বিকেল। মাত্র কুড়ি একুশ ঘন্টার মধ্যে ঝিনুককে আগাগোড়া বদলে দিয়েছে। সুধারা। অবাক চোখে ঝিনুককে লক্ষ করছিল বিনু।
রেল ব্রিজের তলা দিয়ে ডান ধারে খানিক গেলেই চিলড্রেন্স পার্ক। রংকরা লোহার রেলিং দিয়ে ঘেরা। ভেতরে কয়েক ডজন দোলনা। উঁচু থেকে গড়গড়িয়ে নামার জন্য বেশ ক’টা স্লিপ। পার্কটার কোণে কোণে সাজানো রয়েছে সিমেন্টের হাতি, ঘোড়া, হরিণ, এমনি নানা জীবজন্তু। একধারে। ডিমের আকারে ছোট সুইমিং পুল।
রঙিন পোশাক-পরা বাচ্চারা আঁক বেঁধে উদ্দাম ছোটাছুটি করছে। একটা দোলনাও কঁকা নেই। সেগুলো দখল করে দোল খাচ্ছে আরেকটা দল। দুঃসাহসী যারা, সিঁড়ি ভেঙে তেতলা সমান উঁচুতে উঠে স্লিপ কেটে তরতরিয়ে নেমে আসছে চোখের পলকে। তাদের ওপর নজরদারি করার জন্য রয়েছে মায়েরা কিংবা আয়ার দল। যে মেয়েদের বয়স একটু বেশি, সুইমিং পুল তোলপাড় করে তারা সাঁতার কাটছে। স্বপ্নের কটি জলপরী। কলরবে সারা পার্ক মুখর।
ঝিনুক বলল, কী সুন্দর বাগানটা–
সুধা বলল, হ্যাঁ। এটা শুধু বাচ্চাদের জন্যে।
পার্ক পেছনে ফেলে একটা নিচু লোহার গেট খুলে হিরণ যেখানে সবাইকে নিয়ে ঢুকে পড়ল, সেখানে বিরাট বিরাট সব গাছ। আকাশে ডালপালা মেলে কত কাল ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। পায়ের তলায় নরম ঘাসে-ছাওয়া মাঠ। মাঠের পাশ দিয়ে সুবিশাল জলাশয়। হেমন্তেও প্রায় কানায় কানায় ভরা। সেটার কিনার ঘেঁষে বেড়ানোর জন্য ইট বাঁধানো রাস্তা। রাস্তার ধারে ধারে গ্যাস লাইটের সারি সারি পোস্ট।
হিরণ বলল, এই হল লেক–
ঝিনুক অনন্ত বিস্ময়ে বিপুল জলরাশির দিকে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করে, মাটি কেটে কেটে মানুষ এটা করেছে।
হিরণ হাসল, মানুষের অসাধ্য কিছু নেই ঝিনুক। ইচ্ছা করলে সে সব করতে পারে।
বিনুরাই শুধু নয়, চারপাশেরা ভ্রমণবিলাসীরাও চলে এসেছে এখানে। স্বাস্থ্য নিয়ে যাদের বাতিক, ফুসফুঁসে নির্মল বাতাস টানার জন্য তারাও হাজির। নানা বয়সের নারীপুরুষ। বড় বড় গাছের পেছনে জোড়ায় জোড়ায় তরুণ তরুণী। ওদের খুব সম্ভব একটু আড়াল দরকার।
আরও খানিকটা যাবার পর গাছপালা কমে এল। এখানে টানা ব্যারাকের ধাঁচে পর পর অনেকগুলো বাড়ি। কয়েকটা আস্ত রয়েছে। বাকিগুলো আধভাঙা।
