.
রাত আরেকটু বাড়লে ঝিনুককে সঙ্গে নিয়ে রান্নাঘরে চলে গেল সুধা। রান্নার লোক আছে তাদের। আজ তাকে ছুটি দিয়ে ঝিনুককে কাছাকাছি একটা মোড়ায় বসিয়ে, গল্প করতে করতে নিজের হাতে একের পর এক তেল কই, বড়ি-বেগুন দিয়ে পাবদা, সোনা মুগের ডাল রাঁধল। বেগুন ভাজল, ঝিরি ঝিরি করে কেটে আলু ভাজল। সব শেষে বসালো সরু চালের ভাত।
সুনীতিদের বাড়িতেও দু’দিন সুখাদ্যের আয়োজন কম ছিল না। কিন্তু কাল রাতে খাওয়াদাওয়া চুকবার পরই ঝিনুককে একতলার এককোণে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল। আজ বিকেল পর্যন্ত সেখানে মুখ গুঁজে পড়ে থেকেছে সে। কাল সঙ্গী ছিল দুলালী। ভারি নোংরা মেয়েমানুষ। জঘন্য। মাছির মতো পচা পুঁজরক্ত চেটে খাওয়ার স্বভাব।
খাওয়াদাওয়ার পর সুধা এক ঘরে হিরণ এবং বিনুর শোবার ব্যবস্থা করে দিল। আরেক ঘরে মস্ত খাটে বিছানা পেতে সুধাকে নিয়ে শুল।
ঝিনুক এবাড়িতে আসার পরও এত আন্তরিকতা, এত মায়া, এত যত্নের মধ্যেও নিজেকে শামুকের মতো গুটিয়ে রেখেছিল। সবার কথায় একটু আধটু হু হা করেছে শুধু। কখনও মৃদু, নির্জীব হাসি ফুটে উঠেছে ঠোঁটে।
কিন্তু সুধা যখন তার পাশে শুল, ভালবাসার উত্তাপ ঝিনুককে যেন তোলপাড় করে দিচ্ছিল। সুধারা তাকে অচ্ছুতের মতো দূরে সরিয়ে রাখে নি। আবেগে গলার কাছটায় লোহার ডেলার মতো শক্ত কিছু আটকে যাচ্ছিল তার। বুকের ভেতর কিসের যেন একটা চাপ। হঠাৎ ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল সে। ভাঙা ভাঙা, জড়ানো গলায় বলল, সুধাদি তোমার কাছে এসে বেঁচে গেলাম। তুমি নিশ্চয়ই জানো, সুনীতিদির শাশুড়ি কী খারাপ ব্যবহার করেছে। আমার যে সর্বনাশ হয়েছে, বল তাতে আমার কী দোষ!
সুধা চমকে ওঠে। পাছে তার লাঞ্ছনার কথা ওঠে, সে জন্য দাঙ্গার প্রসঙ্গই কেউ মুখে আনে নি। ওঠে নি সুনীতিদের বাড়ির প্রসঙ্গও। গল্পে গল্পে দমবন্ধ করা, মর্মান্তিক ব্যাপারটা তারা আড়াল করে রাখতে চেয়েছিল। মহাবিশ্বের সবার কাছে তার ধর্ষণের বার্তা পৌঁছে গেছে, আর সুধারাই শুধু জানে না, এটা কি বিশ্বাসযোগ্য? ঝিনুক জানে, দাঙ্গার পর থেকে সুনীতিদের বাড়িতে একটা দিন কাটানো পর্যন্ত কোনও ঘটনাই সুধাদের অজানা নেই।
সমানে কেঁদে যাচ্ছিল ঝিনুক। তাকে বুকের ভেতর জড়িয়ে নিয়ে আচ্ছন্নের মতো সুধা বলল, ওসব মনে করে রেখো না। এ নিয়ে যত ভাববে, শুধু কষ্টই পাবে–
রাজদিয়ায় রাজেকের নৌকোয় ওঠার পর থেকে কেঁদেই চলেছে ঝিনুক। ব্রাসে। আতঙ্কে। অকারণ গ্লানিবোধ। আজ রাতের কান্নাটা অন্যরকম। বিনু তো পাশে আছেই। কলকাতায় পা রাখার পর। এই প্রথম সে জানলো, নির্ভর করার মতো আরও কেউ কেউ রয়েছে। সুধার গায়ে নিজেকে মিশিয়ে দিতে দিতে তার কান্না উতরোল হয়ে উঠতে লাগল।
৩.২৬-৩০ পুরো দুটো দিন ভুগিয়ে
৩.২৬
পুরো দুটো দিন ভুগিয়ে ধুম জ্বরটা ভোরের দিকে ছেড়ে গিয়েছিল হিরণের। আজ সকালে শরীর বেশ ঝরঝরে লাগছে। মাথার টিপটিপ, কপালের দুপাশের রগগুলোর দপদপানি কি হাত পায়ের জোড়গুলোর চিবনো ভাব এখন আর নেই।
যুদ্ধের সময় অবনীমোহন রাজদিয়ায় হেমনাথের বাড়িতে সেই যে চা খাওয়া চালু করেছিলেন সেই অভ্যাস বিনুরা ছাড়তে পারে নি।
আজ সকালে জমাট মজলিশ বসেছিল। বিনু, হিরণ, সুধা, ঝিনুক। হিরণ বলছিল, দু’দিন জ্বরের জন্যে অফিসে যাই নি। ঝিনুকের অনারে আরও দুদিন যাব না। রবিবার এমনিতেই ছুটি। অফিসে যেতে যেতে সেই সোমবার।
কাল পর্যন্ত যে মেয়ে কুঁকড়ে ছিল, সেই ঝিনুককে এখন প্রায় চেনাই যায় না। ভয় লজ্জা অনিশ্চয়তা তার কাছ থেকে অনেক কিছু হরণ করে নিয়েছিল। ফের সেগুলো ফিরে আসতে শুরু করেছে। কঠিন খোলা ভেঙে সে বেরিয়ে আসছে। বেশ হাসিখুশি দেখাচ্ছে তাকে।
ঝিনুক বলল, খুব ভাল হয় তা হলে। এ ক’দিন আমরা অনেক গল্প করব। সে ভীষণ চাপা ধরনের মেয়ে। সেই কোন ছেলেবেলায় মা-বাবার সম্পর্কটা যখন থেকে বিষিয়ে উঠল, কেমন শুকিয়ে গিয়েছিল। সারাক্ষণ চুপচাপ। জড়সড়। ভয়কাতর। স্নেহলতা, শিবানী, হেমনাথ এবং পরে সুরমা সুধা সুনীতি, এবং বিনু ছাড়া অন্য কারোর সঙ্গে সহজে কথা বলত না। তারপর দাঙ্গার সময় তার জীবন একেবারে তছনছ হয়ে গেল। তখন ঘরের কোণে কখনও আচ্ছন্নের মতো বসে থাকত। কখনও অফুরান কান্না।
একদৃষ্টে লক্ষ করছিল বিনু। বহুকাল পর ঝিনুককে কী ভালই না লাগছে! এমন উচ্ছ্বসিত শেষ কবে তাকে দেখা গেছে! মনে পড়ে না।
হিরণ বলছিল, শুধু ঘরে বসে বসে গল্পই করব নাকি? একেক দিন একেক জায়গায় তোমাদের বেড়াতে নিয়ে যাব। আজ বিকেলে যাব লেকের ধারে।
ঝিনুক জিজ্ঞেস করে, লেক কী?
বাংলায় যাকে হ্রদ বলে। বেশ কয়েক বছর আগে মাটি কেটে কেটে ওটা করা হয়েছিল। চমৎকার বেড়াবার জায়গা।
হিরণ ধারাবাহিক ভ্রমণসূচি জানাতে থাকে। কাল সবাইকে নিয়ে সন্ধেবেলায় গানের জলসায় যাবে। পরশু যাদুঘর আর ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল। আপাতত এই তিন দিনের কথা ভেবে রেখেছে।
তারপর হাওড়ায় বোটানিক্যাল গার্ডেন আছে। আছে দক্ষিণেশ্বর। বেলুড় মঠ। সার্কাস। সিনেমা। থিয়েটার। এই শহর হাজার দিকে হাজার মজা সাজিয়ে রেখেছে। যাও, ঢুকে পড়। দু’হাত ভরে আনন্দ তুলে নাও।
যত শুনছিল, চোখমুখ আলো হয়ে উঠছিল ঝিনুকের। তার জন্য এত আয়োজন, ভাবাই যায় না। মাথা থেকে স্থায়ী আতঙ্কটা ক্রমশ সরে যাচ্ছে। ত্রাসমুক্ত, ভারমুক্ত ঝিনুক ভেতরে ভেতরে যেন উচ্ছল বালিকা হয়ে উঠছিল।
