একটা শর্ত জুড়ে দিয়ে চাইছে ঝিনুক। সে জন্য অপেক্ষা করতে লাগল বিনু। সহজভাবে ঝুমার সঙ্গে যে মিশবে, গল্প করবে, তার উপায় নেই।
বলল, ও বলল, আর তুমি নাচতে নাচতে ওদের বাড়ি চলে গেলে, সেটা কিন্তু চলবে না।
আমি কি ওদের বাড়ি কখনও গেছি?
কলকাতায় তো সবে এলে। যাবার সময়টা পেলে কোথায়? ঝুমা যা মেয়ে, ঠিক টেনে নিয়ে যেতে চাইবে।
চাইলেই তো আর হল না।
রাজদিয়ায় থাকতে ঝুমা চাইত, আর তুমি লুকিয়ে লুকিয়ে ক্লাস ফাঁকি দিয়ে ওদের বাড়ি চলে যেতে। কি, যাও নি?
বিনু কোণঠাসা হয়ে পড়ে। কাঁচুমাচু মুখে বলে, দু’একবার গেছি।
দু’একবার! স্বর উঁচুতে তুলে গলা থেকে শ্লেষ ঢেলে দিল ঝিনুক, আমি কতদিন ওদের বাড়ি থেকে তোমাকে ধরে এনেছি। ভুলে গেছ?
প্রসঙ্গটা স্বস্তিকর নয়। ঝিনুক যেভাবে বাঁকা পথে চলেছে, একটু পরেই তুমূল কান্ড বাধিয়ে দেবে। দুই কিশোরীর মাঝখানে সেই টানাপোড়েনের ব্যাপারটা বিনু প্রাণপণে এড়াতে চাইল, কলকাতায় আমি ঝুমাদের বাড়ি যাব না, যাব না, যাব না। হল তো?
ঝিনুকের চোখেমুখে খুশির ঝলক খেলে গেল কি? হয়তো সে খানিক পরিতৃপ্তও। বিনুর কাছ থেকে নতুন করে একটা অঙ্গীকার আদায় করে নিতে পেরেছে। লম্বা বাক্সমতো গাড়ির ভেতর তাকে ঘিরে আলোছায়ার খেলা।
ঘোড়ার গাড়ি ভবানীপুর, হাজরা পেছনে ফেলে এখন রাসবিহারী ক্রসিংয়ের কাছাকাছি চলে এসেছে। এদিকটায় চৌরঙ্গির মতো চাকচিক্য নেই। নেই সহস্র আলোর স্বপ্নমায়া। সব কেমন যেন ম্যাড়মেড়ে। রাস্তার দু’ধারে উঁচু উঁচু ল্যাম্পপোস্টগুলোর মাথায় মিটমিট করে নির্জীব বাল্ব জ্বলছে। ট্রামরাস্তার গা থেকে ভেতরে ভেতরে যে গলিগুলো চলে গেছে, সেখানে বেশির ভাগই গ্যাসবাতি, কচিৎ বিদ্যুতের আলো।
ঝিনুক হঠাৎ বলল, আমরা কোথায় যাচ্ছি বল তো? সুনীতিদের বাড়ি থেকে চলে যেতে পারবে, এতেই ছিল তার অনন্ত স্বস্তি। বিনু তাকে কোথায় নিয়ে যাবে, আগে একবারও জিজ্ঞেস করে নি। ঘোড়ার গাড়িতে ওঠার পরও জানতে চায় নি, তাদের যাত্রাপথ কোথায় গিয়ে শেষ হচ্ছে।
অল্পক্ষণের মধ্যে হিরণদের বাড়ি পৌঁছে যাবে ঘোড়ার গাড়ি। আগে জানালে ঝিনুকের কী প্রতিক্রিয়া হত, তার জানা নেই। এক দিদির বাড়ি থেকে আরেক দিদির বাড়ি গিয়ে ফের লাঞ্ছনার মাত্রাটা বাড়ত কিনা, এক অগ্নিকুন্ড থেকে আরেক বেড়া আগুনে গিয়ে পড়তে হত কিনা, স্বাভাবিকভাবেই এই সব প্রশ্ন তুলে ঝিনুক চেঁচামেচি জুড়ে দিত।
কিন্তু এখন আর লুকোছাপা করে কী হবে? কমিনিট আগে পরে জানলে কী এমন ক্ষতি বৃদ্ধি? বিনু মনস্থির করে ফেলে, আমরা ছোটদির বাড়ি যাচ্ছি।
বুকে শ্বাস আটকে যায় ঝিনুকের। সচকিত হয়ে বলে, তোমার এক দিদির বাড়িতে আমার কী হাল হয়েছে, জানো না? তারপরও আরেক দিদির কাছে নিয়ে যাচ্ছ?
বিনু ঝিনুকের চুলে হাত বুলোতে বুলোতে নরম গলায় বলে, কোনও ভয় নেই। ওখানে তোমার একটুও অসুবিধে হবে না।
ঝিনুক অবুঝ হয়ে ওঠে, এই আশা দিয়ে তুমি আমাকে সুনীতিদির ওখানে নিয়ে গিয়েছিলে। ফের ওরকম হলে আমি কিন্তু আর বাঁচব না।
কিছুই হবে না। আমি ওবেলা এসে ছোটদি আর হিরণদার সঙ্গে কথা বলে গেছি।
তাই তোমার ফিরতে দেরি হয়েছিল?
হ্যাঁ। তুমি তো কেঁদে কেটে একশা।
তুমি সুধাদিদের সঙ্গে দেখা করবে, আমি বুঝব কী করে? বলে আসো নি কেন?
তোমার সম্বন্ধে ওরা কী ভাবে, সেটা আগে বুঝে নিতে হবে না? দেখলাম কোনও সমস্যা নেই। তাই তোমাকে নিয়ে যাচ্ছি।
আর কোনও প্রশ্ন করল না ঝিনুক। এখন পরম আশ্বস্ত। ধীরে ধীরে বিনুর একটা হাত তুলে নিয়ে নিজের দুই মুঠির ভেতর জড়িয়ে নিল।
.
৩.২৫
সন্ধের পরে পরে সুধাদের বাড়ি পৌঁছে গেল বিরা। দাঙ্গার সময় ঝিনুকের চূড়ান্ত সর্বনাশ হয়ে গেছে, এ নিয়ে একটি শব্দও কেউ উচ্চারণ করল না। তারা যে সমস্ত জানে, ঘুণাক্ষরেও টের পেতে দিল না। বরং ঝিনুক আসায় তারা কী পরিমাণ খুশি, শতমুখে হইচই করে সেটা বুঝিয়ে দিচ্ছিল। ঝিনুককে নিয়ে তারা কী করবে, কোথায় বসাবে, তাকে কী খাওয়াবে, এই নিয়ে সারাক্ষণ সুধারা শশব্যস্ত।
ঝিনুকের রুক্ষ চুল এলোমেলো হয়ে উড়ছিল। কতক লেপটে আছে কপালে, কতক গালে। সারা মুখে ধুলোর স্তর। নিজের একখানা সিল্কের শাড়ি, ব্লাউজ আর ভোয়ালে ঝিনুককে দিয়ে স্নানঘরে পাঠিয়ে দিল সুধা। পোশাক পালটে ঝিনুক ফিরে এলে তার ভেজা মুখ মুছে দিয়ে খুব যত্ন করে ক্রিম মাখিয়ে দিল। দুই ভুরুর মাঝখানে পরাল গাঢ় মেরুন রঙের বড় টিপ। চোখে সরু রেখায় টেনে দিল কাজল।
তারপর বাইরের ঘরে ঝিনুককে মাঝখানে বসিয়ে পরোটা আলুর দম মিষ্টি খেতে খেতে কলকল করে শুরু হল কত যে গল্প! বেশির ভাগই রাজদিয়ার। স্মৃতির ঝাপি খুলে বেরিয়ে আসে সেখানকার খাল বিল নদী, ধানের খেত, পাটের খেত, যাত্রাগান, ঢপের গান, সারি গান, পুজোর সময় সারা রাজদিয়ায় টহল দিয়ে সাতখানা প্রতিমা বার বার দেখা, নবমী নিশিতে বিজয়া’ কি ‘মেবার পতন’ নাটক, দশমীর পরদিন নদীতে নৌকো বাইচ, কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোয় বাড়ি বাড়ি প্রসাদ খেয়ে বেড়ানো, বাস্তুপুজোয়, চৈত্রসংক্রান্তির মেলায় ঘুরে ঘুরে তিলা কদমা চিনির রনি মঠ কেনা, ফানা ফানা সোনার বরণ সবরি কলা কেনা, মাটির হাঁড়ি বোঝাই করে মোহনভোগ কি রসগোল্লা কেনা, বায়োস্কোপের বাক্সে চোখ রেখে দিল্লি দেখা, বম্বে দেখা, বিলাত দেখা। কতবার যে হেমনাথ স্নেহলতা শিবানী। আর অগুনতি রাজদিয়াবাসীর নাম উঠল! কিন্তু হিরণ বা সুধা দাঙ্গার কথা, দেশভাগের কথা কিংবা লক্ষ লক্ষ শরণার্থীর সীমান্তের এপারে চলে আসার প্রসঙ্গ একবারও তুলল না। যা কিছু মনোরম, মায়াময় এবং স্বপ্নবৎ, তার বাইরে আর কিছু যেন কখনও রাজদিয়ায় ছিল না, বা কোনও দিন ঘটে নি। রাজদিয়ায় সময় যেন দাঙ্গার আগে পর্যন্ত থমকে গেছে। তারপর আর এগোয় নি।
