এতেই কি নিস্তার ছিল! স্কুল ছুটির পর, কিংবা কোনও কোনও দিন ক্লাস কামাই করে নিশি পাওয়া মানুষের মতো নদীর ধারে ঝুমাদের বাড়ি চলে যেত বিনু। আনন্দদার ভাগনীর মধ্যে চুম্বকের মতো কিছু একটা ছিল। কী তীব্র তার আকর্ষণ! কতদিন বিনু ভেবেছে, যাবে না। কিন্তু প্রতিজ্ঞাটা বজায় রাখা যেত কি? স্কুলে যাবার পরই সেটা খান খান হয়ে যেত। নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলত বিনু। আর একটা অদৃশ্য আঁকশি টানতে টানতে তাকে ঝুমার কাছে নিয়ে যেত। ঝিনুকের আড়ালে লুকোচুরি খেলাটা চিরদিন চালিয়ে যাবে, সাধ্য কী। কিভাবে কিভাবে বাতাসে গন্ধ পেয়ে সেও স্কুল ছুটির পর ঝুমাদের বাড়ি হাজির হত। নিজে আগলে আগলে বিনুকে ফিরিয়ে আনত। এমনই কত ঘটনা।
ক’বছর বাদে স্থানকাল পুরোপুরি বদলে গেছে। সেদিনের দুই কিশোরী এখন পূর্ণ যুবতী। পূর্ব বাংলার এক নগণ্য শহর থেকে যুদ্ধক্ষেত্র সরে এসেছে বিশাল মহানগরীতে।
খানিক আগে হেমনলিনী বলেছিলেন, ঝুমাকে নিয়ে ভোগান্তির শেষ থাকবে না বিনুর। ভবিষ্যদ্বাণীটা কি ফলে যাবে? যে মেয়ের মাথায় সন্দেহের কীট ঢুকে গেছে, পরে যদি সেটা নিরন্তর বাতিকে দাঁড়িয়ে যায়, তাকে কিভাবে সামাল দেবে বিনু? পাকিস্তানে থাকতে একরকম সমস্যা ছিল। সীমান্তের এপারে এসে উৎকণ্ঠার মাত্রাটা আরেক দিক থেকে বেড়ে গেল তার।
বিনুর রাগ হচ্ছিল। তবু শান্ত গলায় বলল, তোমাকে তখনই তো বললাম, মাধুরীদিকে আর বড়দিকে জিজ্ঞেস করে দেখ–
ঝিনুক বলল, মাধুরীদিরা সারাক্ষণ তোমাদের পাহারা দিয়েছে, এটা কি সম্ভব?
পাহারা শব্দটা বিনুর মাথায় তীক্ষ্ণ শলা বিঁধিয়ে দেয়। তবু ক্রোধটাকে সে ফেটে বেরিয়ে পড়তে দেয় না। ভুরু কুঁচকে, রুক্ষ চোখে শুধু তাকিয়ে থাকে।
ঝিনুক নিজের ঝোঁকে বলে যায়, কোনও দরকারে ওরা কি ঘর থেকে দু’একবারও বেরিয়ে যায় নি?
ইঙ্গিতটা পরিষ্কার। ধৈর্য ভেঙেচুরে যাচ্ছে বিনুর। অসহিষ্ণু গলায় বলল, হ্যাঁ। আমাদের দুজনকে ঘরে রেখে দু’একবার কেন, পঁচিশ তিরিশ বার বেরিয়ে গেছে। খুশি তো?
ঝিনুকের ঠোঁট থরথর কাঁপতে থাকে। দু’চোখ বাষ্পে ভরে যায়। নিজের রূঢ়তায় লজ্জা পেয়ে যায় বিনু। দুঃখী মেয়েটাকে এভাবে আঘাত না করলেই পারত। ঝিনুকের কাঁধে একটা হাত রেখে খুব নরম গলায় বলল, ববাঝে না, তোমার কষ্ট হয়, এমন কিছু কি আমি করতে পারি?
ঝিনুক উত্তর দেয় না। চোখ ফিরিয়ে, জানালার পাশে সরে যায়।
ধর্মতলার ট্রাম লাইন পেরিয়ে কার্জন পার্ক, হোয়াইটওয়ে লেডলো, গ্র্যান্ড হোটেল, ফারপো, লিন্ডসে স্ট্রিটের ফোকর দিয়ে সামান্য দূরে নিউ মার্কেট ইত্যাদি পেছনে ফেলে ঘোড়ার গাড়ি পার্ক স্ট্রিটের মোড় পেরুতে না পেরুতে সন্ধে নেমে এল লম্বা পায়ে। সেন্ট্রাল অ্যাভেনিউতে যে রোদ গুটিসুটি মেরে পড়ে ছিল, এখন তার লেশটুকু নেই। শহর এখন অনেক শীতল। হিমমাখানো বাতাস বয়ে যাচ্ছে ঢেউ তুলে তুলে। কুয়াশা পড়তে শুরু করেছিল অনেক আগেই। ময়দানের দিকটা পুরোপুরি ঝাঁপসা। সূর্য নেই। চাঁদ কিন্তু উঠে গেছে। কুয়াশার মায়াবরণের ওপারে হেমন্তের চাঁদ বড় বেশি পান্ডুর। কৃশ। আকাশ জুড়ে লক্ষ তারা ফুটেছে। চাঁদের মতো সেগুলোও নিষ্প্রভ।
চৌরঙ্গি জুড়ে এখন আলোর ঢল। রাস্তায় কর্পোরেশনের আলো, অফিস আর ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলোর আলো। সবচেয়ে উঁচু উঁচু বাড়িগুলোর মাথায় রঙ্গি নিওন। সব মিলিয়ে অবিরাম বর্ণচ্ছটা। চোখধাঁধানো। স্বপ্নের মতো।
পাশ থেকে আবার সেই গলা, কী অত ভাবছ?
ফের মুখ ফেরাতে হয় বিকে, কী ভাবব?
কিছুই না?
না।
চুপ করে বাইরে তাকিয়ে বসে আছ আর কিছু ভাবছ না, তাই কখনও হয়?
সেই পোকাটা ঝিনুকের মস্তিষ্কে কামড় বসিয়েই চলেছে। এখনই এটা থামানো দরকার। ধমকের সুরে বিনু বলল, আমার কথা বিশ্বাস হচ্ছে না?
ঝিনুক থমকে রইল এক মুহূর্ত। পরক্ষণে আরও ঘন হয়ে বসে বলল, ঠিক আছে, বিশ্বাস করছি।
একটু নীরবতা।
তারপর ঝিনুকই আবার শুরু করে, আমরা গাড়িতে ওঠার পর ঝুমা তোমাকে কী বলেছিল, মনে আছে?
বিনু উত্তর দেয় না। বিরক্তিতে তার ভুরু কুঁচকে যায়। ঝিনুক তাকে লক্ষ করছিল। তার চোখে চোখ রেখে আদুরে গলায় বলল, রাগ করো না। আগে আমার কথাটা শুনে নাও।
কী?
ঝুমা তোমার সঙ্গে দেখা করতে চাইছিল।
বিনু উত্তর দিল না। ঝিনুকের চিন্তা কোন সূক্ষ্ম, দুর্গম পথ ধরে চলছিল, সেটা আঁচ করতে চাইছে। ঝিনুক বলতে লাগল, তুমি অবশ্য নিজের থেকে দেখা করবে না। ওই যে বলছিলে, রাস্তাঘাটে হঠাৎ দেখা হয়েও যেতে পারে–
বিনু বলল, তুমিই বল, হতে পারে কিনা—
মাথা হেলিয়ে সায় দেয় দিল ঝিনুক, পুরুষ মানুষ। দিনরাত তো বাড়িতে বসে থাকতে পারবে না। বাইরে বেরুতেই হবে। তখন কোথাও না কোথাও– শেষ না করে চুপ করে গেল সে।
বিনু নিঃশব্দে ঝিনুককে লক্ষ করতে থাকে।
ঝিনুক নতুন উদ্যমে ফের শুরু করে, ধর যদি দেখা হয়েই যায় তখন কী করবে?
তুমি আমাকে কী করতে বল, মুখ ফিরিয়ে চলে যাব?
এবার ধন্দে পড়ে গেল ঝিনুক। কিছুক্ষণ আনমনা হয়ে রইল। চৌরঙ্গির নানা ধরনের মিশ্র শব্দপুঞ্জ ছাপিয়ে তাদের ঘোড়াটা একনাগাড়ে খট খট আওয়াজ তুলে যাচ্ছে।
একসময় ঝিনুক বলল, সেটা খারাপ দেখাবে। ওরা তোমাদের কুটুম্ব। কথা না বললে ঝুমা চারদিকে রটিয়ে বেড়াবে। তোমার নিন্দে হবে। একটু ভেবে বলে, কথা বলতে পার। তবে
