সেদিন কী আদরযত্ন বিনুদের! কত খাতির। হেমনলিনী মুহুর্মুহু খোঁজ নিচ্ছিলেন, আপ্যায়নে কোনও রকম ত্রুটি ঘটছে কিনা। বউ-ভাতের পর আরও ক’টা দিন থেকে যাবার জন্য কী সনির্বন্ধ অনুরোধ তার। হেমনাথের হাত ধরে কত কাকুতি মিনতি।
আর আজ? ঝিনুককে সঙ্গে না নিয়ে এলে নিশ্চয়ই সব অন্যরকম হত। হেমনলিনী কিছুতেই তাকে এভাবে চলে যেতে দিতেন না। বিষাদময় আবহাওয়ায় এই নিরানন্দ বিদায় বিনুকে ভীষণ পীড়া দিচ্ছে কি? কোনও রকম আক্ষেপ? উত্তরটা সারাক্ষণ নিজের মধ্যেই প্রস্তুত থাকে। না, তিলমাত্রও না। প্রিয় নারীটিকে চূড়ান্ত ঝুঁকি নিয়ে হননকারীদের কাছ থেকে আড়াল করে করে এতদূরে নিয়ে এসেছে। তার জন্য যে কোনও কষ্টভোগ করতে সে তৈরি। যে কোনও পরিস্থিতির সামনে দাঁড়াতেও। ঝিনুকের জন্য বুকের ভেতরটা আবেগে, মায়ায় নতুন করে ফের উতরোল হয়ে ওঠে।
ঝিনুক শাড়ি ঠিকঠাক করে, চুল আঁচড়ে বসে ছিল। তাকে ডেকে নিয়ে এল সুনীতি। কোনও দিকে দৃকপাত না করে, কারও সঙ্গে একটি কথাও না বলে বিনুর পাশে পাশে হাঁটতে হাঁটতে রাস্তায় এসে গাড়িতে উঠে বসে। উলটো দিকের জানালার বাইরে মুখ ফিরিয়ে থাকে। বিনুও উঠে পড়ে।
আনন্দরা সঙ্গে এসেছিল। সে সুটকেসটা গাড়িতে তুলে দিয়ে কাঠের পলকা দরজা বন্ধ করে দেয়।
হেমনলিনী বললেন, সময় পেলেই চলে এস বিনু। আমন্ত্রণটা শুধু বিকেই। মাত্র কয়েক হাত দূরে ঝিনুককে তিনি দেখতেই পাননি।
ঝুমা বুঝে উঠতে পারছিল না, এভাবে বিনুদের চলে যাবার কী অর্থ? কোথাও বুঝি একটা গোলমাল আছে। যেমনটা হওয়ার কথা তেমনটা ঠিক হচ্ছে না। সব কেমন অস্বাভাবিক। আত্মীয়স্বজন এলে খুশির হাওয়া বয়ে যাবার কথা। তা নয়, পরিবেশটা কেমন দম-চাপা, গুমোট গুমোট। চুলবুলে যে তরুণী সারাক্ষণ বাতাসে উড়তে থাকে, কলরোলে মুখর করে রাখে চতুর্দিক, আচমকা সে হতভম্ব হয়ে গেছে। ঈষৎ ভারী গলায় ঝুমা বলল, তোমার সঙ্গে আর দেখা হবে না বিনুদা?
হেমনলিনী নানীর দিকে তাকিয়ে কুটি করলেন। তবে কিছু বললেন না।
ঝুমাকে দেখার পর যে তড়িৎপ্রবাহের সৃষ্টি হয়েছিল, পুরোপুরি তা স্তিমিত হয়ে যায় নি। অল্প হেসে বিনু বলল, একই শহরে থাকব। হয়তো কখনও দেখা হয়ে যাবে।
গোল টুপি-পরা মুসলমান কোচোয়ান গাড়ির মাথায় চাবুক হাতে বসে ছিল। আনন্দ তাকে বলল, বাবুদের ঠিকমতো পৌঁছে দিও।
জি, সাব– কোচোয়ান ঘাড় কাত করে।
ঘোড়ার গাড়ির বাহন অধৈর্য হয়ে পা ঠুকছিল। পিঠে চাবুকের ঘা পড়তে দৌড় শুরু করল।
হেমনলিনীর কাছে আগেই বিদায় নিয়েছিল বিনু। সামান্য হাত নেড়ে বাকিদের বলল, বড়দি আনন্দদা ঝুমা মাধুরীদি, আমরা চলোম
পিচের রাস্তায় অশ্বক্ষুরের ধ্বনি ক্রমশ দূরে সরে যেতে থাকে।
.
৩.২৪
ট্রাম রাস্তা ধরলে অনেকখানি ঘুরপথ হয়। সময় লাগে ঢের বেশি। কোচোয়ান সেদিকটায় না গিয়ে সেন্ট্রাল অ্যাভেনিউ দিয়ে গাড়ি ছোটাচ্ছিল।
হেমন্তের ভরদুপুরে সূর্য যখন সোজা মাথার ওপর, রোদ থাকে তেজীয়ান। বেলা যত ঢলতে থাকে, তার গনগনে কী খাই কী খাই ভাবটা দ্রুত ঝিমিয়ে আসে।
এখন পড়ন্ত বেলায় সূর্যটাকে দেখা যাচ্ছে না। পশ্চিম দিকে কোথায় যেন নেমে গেছে। দু’ধারের উঁচু উঁচু বাড়িগুলোর মাথায় যে মরা মরা, হলদে সূর্যরশ্মিটুকু লেপটে আছে, সেটা যেন পা বাড়িয়েই রয়েছে। কিছুক্ষণের ভেতর উধাও হয়ে যাবে।
শহরের তাপাঙ্ক নামছে হু হু করে। বাতাসে মিশে যাচ্ছে সূক্ষ্ম হিমের রেণু।
মধ্যরাত থেকে ভোর, এই সময়টা বাদ দিলে কলকাতা মানেই কোলাহল। একটানা। নিরবচ্ছিন্ন। সমস্ত শহর জুড়ে একটা চড়া সুরের অর্কেস্ট্রা অবিরল ঝাঁপতালে বেজে যায়।
জানালার বাইরে অন্যমনস্কর মতো তাকিয়ে আছে বিনু। চারপাশে কত রকম শব্দ, কত যানবাহন, মানুষজন। সে সব আবছাভাবে বিনুকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছিল। স্পষ্ট করে কিছুই সে দেখতে বা শুনতে পাচ্ছিল না।
পাশ থেকে পরিচিত ডাক কানে আসে, এই—
চমকে মুখ ফিরিয়ে তাকায় বিনু। কখন যেন ওধারের জানালা থেকে সরে এসে তার গা ঘেঁষে ঘন হয়ে বসেছে ঝিনুক।
বিনু জিজ্ঞেস করে, কিছু বলবে?
হুঁ।
বিনু অপেক্ষা করে থাকে। তার চোখে চোখ স্থির করে ঝিনুক বলে, একটা ঠিক ঠিক জবাব দেবে?
কী? বিনু সতর্ক হল।
তখন ঝুমার সঙ্গে কি শুধু পাকিস্তান আর হেমদাদুদের গল্পই করেছিলে?
তোমাকে তো সবই বলেছি। তারপরও এমন অদ্ভুত প্রশ্ন!
এমনি। কৌতূহল।
কৌতূহল কি মেটে নি?
মিটল আর কই?
ঝুমাকে দেখার পর থেকে অদৃশ্য একটা পোকা মাথায় ঢুকে গেছে ঝিনুকের। যার নাম সন্দেহ। যার নাম সংশয়। বিনু আঁচ করতে পারে, পোকাটা ক্রমাগত হুল ফোঁটাচ্ছে।
রাজদিয়ায় ক’বছর আগে তাকে নিয়ে দুই কিশোরীর মধ্যে এক অঘোষিত মহাযুদ্ধ শুরু হয়েছিল। কখনও প্রকাশ্যে। কখনও গোপনে। বিনুকে দখল করার জন্য কত অস্ত্রই না তারা শানিয়েছে। উদ্ভাবন করেছে নতুন নতুন রণকৌশল।
এক নির্জন দুপুরে ঝুমা অথৈ জলে তাকে নিয়ে শাপলা আর জলপদ্ম তুলতে গিয়েছিল। তারপর কাউফল পাড়তে গিয়ে গাছের ডাল ভেঙে জলে পড়ে যায়। কিন্তু ঝিনুকের চোখে ধূলো দেওয়া যায় নি। এই নিয়ে কম হুজ্জৎ করে নি মেয়েটা। বিনুকে নাকালের একশেষ করে ছেড়েছে।
একদিন রাত্রে বিনুকে নিয়ে দুঃসাহসী ঝুমা লুকিয়ে লুকিয়ে যুগলের সঙ্গে নদী পেরিয়ে সুজনগঞ্জের হাটে যাত্রা শুনতে যাবার নিখুঁত ছক কষে ফেলেছিল। কিন্তু প্রখর অনুমানশক্তি ঝিনুকের। বিনুর দিকে তাকালে লহমায় তার মনের যাবতীয় অন্ধিসন্ধির খোঁজ পায় সে। সেদিনও পেয়েছিল। নৌকোয় উঠতে গিয়ে বিনুদের চক্ষু চড়কগাছ। আগে থেকেই ছইয়ের তলায় বসে আছে ঝিনুক।
