তা ছাড়া কী?
সে আসায় তোমার আমার কী অসুবিধে হয়েছে?
কান্না থেমে গিয়েছিল ঝিনুকের। শ্লেষে তার গলা রন রন করে ওঠে, ও ও! আমার যা-ই হোক, তোমার সুবিধে তো ষোল আনার জায়গায় আঠার আনা। আমাকে ঝি’দের হাতে তুলে দিয়ে দোতলায় বসে ঝুমার সঙ্গে কত গল্প, কত হাসাহাসি! হা হা, হি হি
রাজদিয়া থেকে বেরুবার পর এই প্রথম একটু কঠোর হল বিনু, কী অদ্ভুত কথা! হ্যাঁ হ্যাঁ, হি হি, গল্প! এসব কী বলছ তুমি!
ঝিনুক নিজের ঝেকেই বলে যায়, মনে করেছ, আমি নিচে আছি বলে কিছুই টের পাই নি! তুমি কী কর, না কর, সব বুঝতে পারি।
বিনু হাল ছেড়ে দেয়। যে প্রতিজ্ঞা করেছে, যুক্তির ধার ধারবে না, তাকে বোঝাতে যাওয়া নেহাতই বৃথা। বলল, এতদিন পর ঝুমার সঙ্গে দেখা। পাকিস্তানের কথা জানতে চাইছিল, দাদু-দিদাদের কথা জিজ্ঞেস করছিল। সে সব বলছিলাম। একে কি গল্প করা বলে? হা হা, হিহি বলে? বড়দি, মাধুরীদি সামনেই বসে ছিল। বিশ্বাস না হলে তাদের জিজ্ঞেস করতে পার।
ঝিনুকের মাথায় অবুঝপনা ভর করেই থাকে। বলে, কোনও সাক্ষীর দরকার নেই। আমাদের যাবার কী হল? এক মিনিটও আমি আর এখানে থাকব না।
ঝুমাকে দেখে খ্যাপামিটা মাত্রাছাড়া হয়ে উঠেছে। আর বেশিক্ষণ এ বাড়িতে থাকলে ঝিনুক কী কান্ড যে বাধিয়ে বসবে, কে জানে। বিনু বলল, চোখমুখ ধুয়ে রেডি হয়ে নাও। আমি ওপর থেকে আসছি।
ঝিনুক বলল, মোটেও দেরি করবে না। কথায় স্পষ্ট ইঙ্গিত, তার চোখের আড়ালে বিনু ঝুমার সংস্পর্শে এক লহমাও থাকুক, আদৌ সে তা চায় না।
এতদিন ঝিনুক ছিল সদাস্ত। আতঙ্ক লজ্জা সঙ্কোচ ছিল তার সর্বক্ষণের সঙ্গী। সে সবের সঙ্গে নতুন উপসর্গ যোগ হল–ঈর্ষা। জট ক্রমশ বাড়ছে। একই শহরে যখন ঝুমা রয়েছে, সেগুলো আরও বাড়বে। এই মেয়েকে কিভাবে সামলাবে বিনু?
দোতলার সেই দক্ষিণের ঘরে এসে আনন্দকে দেখতে পেল বিনু। হেমনলিনীরা তো ছিলেনই। সে যখন একতলায়, খুব সম্ভব সেই সময় আনন্দ এখানে এসেছে।
সবাই উদগ্রীব হয়ে আছে। হেমনলিনী জিজ্ঞেস করলেন, ঝিনুক শান্ত হয়েছে?
মাথা সামান্য হেলিয়ে দেয় বিনু, হ্যাঁ—
হেমনলিনী এবার জানতে চাইলেন, কী হয়েছিল?
আসল কারণ কোনওভাবেই বলা যাবে না। এমনকি, ইঙ্গিতেও নয়। বিষয়টা লঘু করার জন্য বিনু বলল, অনেকক্ষণ আমাকে দেখেনি, তাই অস্থির হয়ে পড়েছিল।
হেমনলিনী ভবিষ্যদ্বাণীর সুরে বললেন, এই মেয়েকে নিয়ে তোমার অনেক ভোগান্তি আছে বিনু—
মানসিক দিক থেকে মেয়েটা ভীষণ ধাক্কা খেয়েছে। কলকাতায় কাউকেই চেনে না। বড়দিকেও রাজদিয়ায় অল্প বয়েসে দেখেছে। আমি বেশিক্ষণ কাছে না থাকলে ভীষণ ভয় পেয়ে যায়।
হেমনলিনীর হয়তো আরও কিছু বলার ছিল। কী ভেবে বললেন না।
বিনুও অনেকক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর বলে, মাউইমা, আপনাকে একটা কথা বলার ছিল–
হেমনলিনী সামান্য উৎসুক হলেন, কী কথা বাবা?
আমরা আজ এখান থেকে চলে যাব।
খবরটা হেমনলিনী হয়তো আগেই পেয়েছেন। অবাক হবার ভান করে বললেন, সে কী! একটি আধো-অপ্রকৃতিস্থ পূর্ণ যুবতাঁকে নিয়ে কোথায় যাবে বিনু, প্রায়-অচেনা এই শহরের কোন প্রান্তে, তা নিয়ে কিন্তু আগ্রহ দেখালেন না।
বেশ জোর দিয়ে বিনু বলল, হ্যাঁ মাউইমা–
হেমনলিনী বললেন, আমি তো বলেছিলাম, তোমার বাবা যতদিন না ফিরে আসছেন, এখানেই থাকো। তাঁরা কণ্ঠস্বরে আবেগ নেই, আন্তরিকতা নেই। কেমন যেমন শুষ্ক। নেহাত ভদ্রতার খাতিরে বলতে হয়, তাই বলা।
না মাউইমা, আমাদের যেতেই হবে।
নিতান্ত নিরুপায় হয়েই যেন হেমনলিনী বললেন, তা হলে আর কী করে আটকাব?
মুখ দেখে বোঝার যো নেই। কিন্তু বিনু টের পায়, বড়দির এই শাশুড়িটি ভেতরে ভেতরে হাঁফ ছেড়ে বাঁচছেন। এখন তার অপার স্বস্তি।
বিনু সুনীতির দিকে ফেরে, দিদি, ওবেলা আনন্দদা যে নতুন জামাকাপড়গুলো কিনে দিল—
সুনীতি পাথরপ্রতিমা হয়ে বসে ছিল। শিথিল পায়ে উঠে দাঁড়ায়, সব গুছিয়ে রেখেছি। নিয়ে
আসছি। সে চলে যায়।
বিনু এবার আনন্দর দিকে তাকায়, আমাদের ঘোড়ার গাড়ির ব্যবস্থা করে দেবেন বলেছিলেন–
হ্যাঁ। যতীনকে পাঠাচ্ছি। আনন্দও বেরিয়ে যায়।
ঘরের ভেতর অন্তহীন নৈঃশব্দ। যে কুমার মুখে সারাক্ষণ খই ফোটে, অন্য কাউকে মুখ খোলার সুযোগই দেয় না, তার কলকলানি পর্যন্ত থেমে গেছে।
দু’তিন মিনিট আগে পরে সুনীতি আর আনন্দ ফিরে এল। সুনীতির হাতে একটা চামড়ার বড় সুটকেস। বলল, এটার ভেতর তোদের ধুতি শাড়িটাড়ি আছে–
আনন্দ জানায়, যতীন ঘোড়ার গাড়ি ডেকে এনেছে। রাস্তায় সেটা দাঁড়িয়ে আছে।
খাট থেকে নেমে হেমনলিনীকে প্রণাম করে বিনু বলল, চলি মাউইমা– সুনীতির হাত থেকে সুটকেসটা নিতে যাচ্ছিল, আনন্দ নিতে দিল না। নিজের হাতেই ঝুলিয়ে নিল।
বিনু ঘরের বাইরে এসে বারান্দা ধরে সিঁড়ির দিকে এগোয়। তার পেছনে বাকি সবাই। নিপ্রাণ ক’টি পাথরের পুতুল তাকে অনুসরণ করছে।
এই বাড়িতে বিনুর শেষ আসা সুনীতির বউ-ভাতে। সারা বাড়ি জুড়ে সেদিন উৎসবের মাতন। অজস্র আলো শতধারায় ছড়িয়ে পড়ছিল। অবিরাম বাজছিল সানাই। কত যে ফুল! গোলাপ। রজনীগন্ধা। জুই। রুপোর পিচকিরিতে অতিথিদের গায়ে ছিটনো হচ্ছিল সুগন্ধি গোলাপজল। চারদিক মুখর। হাসি। আনন্দ। কলরব। কিশোরীরা তরুণীরা জলপ্রপাত হয়ে একবার উঠে যাচ্ছিল দোতলায়, যেখানে রানীর মতো সাজিয়ে ভেলভেটের সিংহাসনে বসিয়ে রাখা হয়েছে সুনীতিকে। পরক্ষণে নিচে নেমে সামনের লনের মস্ত শামিয়ানারা তলায়। সেখানে নিমন্ত্রিতরা হাসি-পরিহাসে মাতোয়ারা। আনন্দদের এই বাড়ি সেদিন এক স্বপ্নপুরী।
