ঝুমার গোড়ার দিকের উন্মাদনা হঠাৎ ঝিমিয়ে আসে। ঝপ করে গলা নামিয়ে মলিন মুখে বলে, যতীনদা বলছিল, ঝিনুকও তোমার সঙ্গে এসেছে। একতলায় তাকে দেখেও এলাম। ভীষণ খারাপ লাগছিল। ওর সম্বন্ধে আগেই অনেক খবর কানে এসেছিল। অনেক কষ্ট’ শেষ না করে থেমে যায় সে।
কোন খবরের ইঙ্গিত ঝুমা দিয়েছে, বুঝতে বাকি থাকে না। এত বছর বাদে তাকে দেখে বিনুর স্নায়ুমন্ডলীতে যে ঝড় উঠেছিল, মুহূর্তে তা উধাও। সে উত্তর দিল না। ঘন বিষাদে ছেয়ে যায় মন।
দুঃখ, ক্লেশ, মানসিক যাতনা ইত্যাদি ব্যাপারগুলো নিয়ে বেশিক্ষণ নাড়াচাড়া করতে ইচ্ছা করে না ঝুমার। শ্বাস আটকে আসে। সে সবের বেড়াজাল কেটে বেরিয়ে আসার জন্য একেবারে অন্য প্রসঙ্গে চলে যায়, এখন তো তোমরা এখানেই থাক। আমাদের বাড়ি খুব কাছে। হেদুয়ার সুইমিং পুলের ওধারে। কবে যাবে বল–
একটি যুবককে এমন অসঙ্কোচে আর কোনও মেয়ে কি নিজেদের বাড়ি যাবার কথা বলতে পারত? বিশ্বব্রহ্মান্ডে একমাত্র কুমার পক্ষে বুঝিবা কিছুই অসম্ভব নয়।
বিনু বলল, কবে যেতে পারব, জানি না।
মানে?
আমরা এখানে থাকছি না।
কুমার বিশ্বাস হচ্ছিল না। আবার অবিশ্বাসও করতে পারছিল না। কয়েক পলক হতবাক তাকিয়ে থাকে সে। তারপর বলে, সত্যি?
আস্তে মাথা নাড়ে বিনু। সুনীতির দিকে আঙুলে বাড়িয়ে বলে, তোমার এই মামীকেই জিজ্ঞেস কর না–
ধরা গলায় সুনীতি জানায়, হ্যাঁ। ওরা চলে যাবে।
ঝুমা বিনুকে জিজ্ঞেস করল, কবে যাচ্ছ?
আজই। একটু পরেই বেরুব।
এ বাড়িটা যেন ঝুমার খাস সম্পত্তি। বিনুর সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারছিল না সে। বলল, সবে তো কাল এলে। আজই চলে যাবার কী হল? না না, এখন তোমাদের কোনওভাবেই যাওয়া হবে না। কদিন থেকে যাও।
বিনু নিচু গলায় বলে, থাকার উপায় নেই।
ঝুমা অধীর হয়ে ওঠে, কেন নেই? তোমাকে কি কেউ তাড়িয়ে দিচ্ছে?
না।
তা হলে যাবার জন্যে খেপে উঠেছ কেন?
বিনু চুপ। কী বলবে সে? এ বাড়িতে না থাকার মূল কারণটা আর যাকেই হোক, হেমনলিনীর নাতনীকে কোনওভাবেই জানানো সম্ভব নয়।
ঝুমা ত্বরিত পায়ে উঠে দাঁড়ায়, আনন্দমামা, দিদা সবাই বাড়িতে আছে। তাদের ডেকে আনছি। মামীরাও এখানে রয়েছে। কী করে তোমাদের যাওয়া হয় দেখছি–
বিনু হতচকিত। ঝুমা যা মেয়ে, ত্রিভুবন কাঁপিয়ে তুমুল কিছু বাধিয়ে বসার অলৌকিক ক্ষমতা তার আছে। আনন্দদের ডেকে এনে তাদের এখানে রাখার জন্য যদি ঝুমা জেদ ধরে বসে, লজ্জায় মাথা কাটা যাবে। মুহূর্তে নিজেকে সামলে গম্ভীর মুখে বিনু বলে, বসো।
বিনুর স্বরে এমন এক ঋজুতা রয়েছে যা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। নীরবে বসে পড়ে ঝুমা। বিনু বাধা দেওয়ায় মনে ক্ষোভ জমছে। ফর্সা মুখে তা ফুটেও উঠছে। আসলে সে যা চায় সেটি হওয়া চাই। এবং তৎক্ষণাৎ। তার কোনও কাজে, কোনও আচরণে আপত্তি করা চলবে না। তার মর্জিমাফিক চলতে হবে সবাইকে। নতমস্তকে। ঝুমার কাছে এটাই জাগতিক নিয়ম। রাজদিয়ায় থাকতে এ সব লক্ষ করেছে বিনু। বড্ড বেশি অধিকার-বোধ মেয়েটার।
কিছুক্ষণ গুম হয়ে বসে থাকে ঝুমা। তারপর জিজ্ঞেস করে, তোমরা কোথায় যাবে? ভবানীপুরে তোমাদের সেই বাড়িতে?
না।
তবে?
সুধাদের কাছে যাওয়ার ব্যাপারটা সুনীতি আর আনন্দ ছাড়া অন্য কেউ জানে না। আপাতত সেটা গোপন রাখতেই হবে। বিনু বলল, যাব এক জায়গায়। তুমি তাদের চেনো না। হাজার গন্ডা জবাবদিহি এড়াবার জন্য মিথ্যেই বলতে হল।
হেমনলিনী ছুটতে ছুটতে ঘরে ঢুকলেন। চোখেমুখে শঙ্কা, উত্তেজনা, উদ্বেগ। শ্বাসটানা ত্রস্ত সুরে বিনুকে বললেন, তুমি একবার নিচে যাও বাবা। সন্ধ্যা এসে বললে, ঝিনুক ফের কান্নাকাটি শুরু করেছে। কাজের মেয়েরা সামলাতে পারছে না। দুলালীকে বাদ দিয়ে সন্ধ্যাকে আজ থেকে ঝিনুকের দেখাশোনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
নতুন করে ঝিনুকের কান্নার হেতুটা মোটামুটি আঁচ করে নিল বিনু। লাফ দিয়ে খাট থেকে নেমে পড়ে সে। ঝুমারা সঙ্গে আসতে চেয়েছিল, হাতের ইশারায় তাদের থামিয়ে দৌড়ে বারান্দা পেরিয়ে সিঁড়ির দিকে চলে গেল। একতলায় ঝিনুকের ঘরে ঢুকতেই চোখে পড়ল, উতরোল কান্নায় খান খান হয়ে যাচ্ছে ঝিনুক। মুখটা বিকৃত। দু’চোখ থেকে অবিরল জলের ধারা বইছে।
সন্ধ্যা এবং আরও দুটি কাজের মেয়ে শান্ত করতে চেষ্টা করছে, কিন্তু পার্থিব কোনও শব্দই কানে যাচ্ছে না ঝিনুকের। একেবারে বধির।
সন্ধ্যাদের চলে যেতে বলে ঘর ফাঁকা করল বিনু। ঝিনুকের পাশে বসে নরম গলায় বলল, আবার কী হল? শুধু শুধু কাঁদছ কেন?
কান্নাজড়ানো, ভাঙাচোরা গলায় ঝিনুক বলল, শুধু শুধু? ওই মেয়েটা এসেছে না?
যা অনুমান করা গিয়েছিল, হুবহু তা-ই। হুলটা হৃদয়ের কোন অন্তঃপুরে গিয়ে বিধেছে, টের পাওয়া যাচ্ছে। ঝুমার প্রতি ঝিনুকের হিংসেটা অনেক কালের পুরনো। রাজদিয়ায় থাকতেই সূত্রপাত। এত লাঞ্ছনা, এত বিপর্যয় ঘটে গেছে জীবনে, কিন্তু সেটা স্মৃতির গোপন কক্ষে লুকনোই ছিল। সব দেওয়াল ভেদ করে আবার বেরিয়ে এসেছে।
বিনু বলল, কী আশ্চর্য, এটা ওর মামাবাড়ি। আসবে না?
আসার আর সময় পেল না?, আমরা চলে গেলেই তো আসতে পারত।
অবুঝের মতো কথা বলো না। নিজের মামাবাড়িতে কখন আসবে, কেন আসবে, সেটা সে বুঝবে। তোমার আমার সেখানে কিছু করারও নেই, বলারও নেই। তা ছাড়া–
