কয়েক জোড়া পায়ের শব্দ সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে আসছে। সারা বাড়ি এখন মুখর।
একাই কথা বলছে মেয়েটি। অবিরল। গলার স্বর সতেজ, সুরেলা, তার সঙ্গে ঝংকার মেশানো। মনে হয় কোনও তরুণী। তার সঙ্গীরা মৃদু গলায় কী জবাব দিচ্ছে।
কলধ্বনি এবং পায়ের আওয়াজ অনেক কাছে চলে এসেছে। এবার ডাকটা শোনা গেল, বিনুদা– বিনুদা–
ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসে বিনু। দরজার ঠিক বাইরে দাঁড়িয়ে আছে সুনীতি মাধুরী এবং ঝুমা।
আদলটা একই রয়েছে। তবু কত বদলে গেছে ঝুমা। সে এখন পরমাশ্চর্য যুবতী। ভরাট, লম্বাটে মুখ। সুছাঁদ নাক। ডানা-মেলা সরু ভুরু। মসৃণ, স্বর্ণাভ ত্বক। জোড়া বেলের মতো পুষ্ট বুক। ঘন চুল একবেণী করে পিঠের ওপর ঝোলানো। সুগোল হাত সটান কাধ থেকে নেমে এসেছে। পেছন দিকটা অনেক ভারী হয়েছে। দু’চোখে কী এক গাঢ় মাদকতা। পরনে সিল্কের শাড়ি আর ব্লাউজ। বাঁ হাতে সোনার ব্যান্ডে ছোট্ট ঘড়ি, ডান হাতে রুলি। গলায় লকেটওলা হালকা সোনার চেন। সর্বাঙ্গ জুড়ে যৌবনের ইন্দ্রজাল। এমন নারী সেকালে জন্মালে তাকে নিয়ে রাজারাজড়াদের মধ্যে ধুন্ধুমার বেধে যেত। কিংবা দশ দিগন্ত তোলপাড় করে বসত স্বয়ম্বর সভা।
ঝুমার কাঁধ থেকে একটা নকশা করা চামড়ার ব্যাগ ঝুলছে। বাইরে থেকে মনে হয়, বইখাতায় বোঝাই।
চোখের পাতা পড়ছিল না বিনুর। সারা শরীরে শিহরন খেলে যাচ্ছে। পা থেকে মাথা অব্দি তীব্র তড়িৎস্পর্শে কেঁপে কেঁপে উঠছে যেন।
সেই যুদ্ধের সময় রাজদিয়ায় এক বিজন দুপুরে কিশোরী ঝুমা তার ভেজা ভেজা রক্তাভ ঠোঁট দিয়ে বিনুর ঠোঁট শুষে নিয়েছিল। একটি চুম্বন নরনারীর সম্পর্কের অপার রহস্যের প্রথম দরজা বিনুর সামনে খুলে দিয়েছিল। শিরায়ু সেদিন অবশ হয়ে গেছে। মাথা ঝিমঝিম। কিন্তু তারই মধ্যে টের পাচ্ছিল, বুকের ভেতর ভরা বর্ষার পদ্মা আর মেঘনা যেন সমস্ত কিছু ভেঙে চুরে উথলপাথল করে দিচ্ছে।
যুদ্ধ থামলে ঝুমা আনন্দদের সঙ্গে কলকাতায় চলে এসেছিল। সুনীতির বউ-ভাতে তার সঙ্গে শেষ দেখা। তারপরও মাঝে মাঝে সে চিঠি লিখত। বিনুও উত্তর দিয়েছে। স্বাভাবিক নিয়মেই একদিন চিঠি লেখালিখি বন্ধ হয়েছে। চোখের আড়াল হলে অনেক কিছুই তো হারিয়ে যায়।
সেই যে ঝুমার সঙ্গে যোগাযোগের সুতোটা ছিঁড়ে গেল তারপর কত কী-ই না ঘটে গেছে। দাঙ্গা। আগুন। ধর্ষণ। নারীহরণ। ব্যাপক হত্যা। দেশভাগ। সীমান্ত পেরিয়ে লক্ষ লক্ষ শরণার্থীর এপারে চলে আসা।
অগ্নিগর্ভ সময়ের উলটোপালটা হাওয়া ঝুমাকে অনেক দূরে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কে জানত, তার বুকের ভেতর কোনও অদৃশ্য প্রান্তে পদ্মা মেঘনা হয়ে লুকিয়ে ছিল মেয়েটা। সঙ্গোপনে। তাকে দেখামাত্র দুই নদী বান ডাকিয়ে পারকূল ভাঙতে ভাঙতে বেরিয়ে এসেছে।
ঝিনুকও যথেষ্ট সুন্দরী। তরুণী। ঝুমারই বয়সী। ঢাকা থেকে উদ্ধার করে আনার পর পাগলামির ঘোরে দু’হাতে মাঝে মাঝেই বিনুকে আঁকড়ে ধরত। রাজদিয়া থেকে বর্ডার পর্যন্ত দুটো দিন তাকে বুকের ভেতর সাপটে নিয়ে আসতে হয়েছে। ঝিনুকের কাঁধ গাল ঠোঁট স্তন পেট উরু তার গায়ে লেপটে থেকেছে। কখনও মনে হয় নি, রক্তে আগুনের ঝিলিক হেনে বিদ্যুৎ খেলে যাচ্ছে। অথচ ঝুমাকে দেখে অস্থির অস্থির লাগছে কেন? কিশোর বয়সের সেই প্রথম চুমুটির তীব্র মধুর অনুভূতি এখনও বুঝিবা তার ঠোঁটে মাখানো রয়েছে।
ঝুমার দু’চোখ থেকে খুশি আর উত্তেজনা উপচে পড়ছিল। গলার স্বর উঁচুতে তুলে বলে, কী দেখছ অমন করে? চিনতে পারছ না? আমি ঝুমা
নেশাগ্রস্ত, আচ্ছন্ন ভাবটা কেটে যায় বিনুর। লজ্জা পেয়ে বলল, চিনব না কেন? নিশ্চয়ই চিনেছি।
ঝুমা বলে, দরজার বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখবে নাকি?
বিব্রত বিনু ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়ে, আরে না না। এস—
ঝুমা ঘরে ঢুকে বিনুর খাটের একধারে ঝুপ করে বসে পড়ে। কাঁধের ব্যাগটা নামিয়ে পাশে রাখে।
সুনীতি আর মাধুরীও ঝুমার সঙ্গে ভেতরে এসেছিল। দু’টো চেয়ার টেনে তারাও কাছাকাছি বসে।
ঝুমা বলছিল, আজ সকালে খবর পেলাম তুমি পাকিস্তান থেকে চলে এসেছ। কী ভাল যে লাগছে! ওবেলাই দেখা করতে আসতাম। সাড়ে দশটা থেকে দু’টো অনার্স ক্লাস ছিল। তারপর পর পর পাসের। ফাঁকি মারার উপায় নেই। তাই ছুটি হতেই সোজা চলে এসেছি।
বিনু জিজ্ঞেস করে, আমার খবর কে দিল?
দিদা কী দরকারে যতীনদাকে মায়ের কাছে পাঠিয়েছিল। সে-ই বললে—
ঝুমা হেমনলিনীর নাতনী, আনন্দর দিদির মেয়ে। বিনু বলল, কোন কলেজে পড়?
স্কটিশ চার্চ।
কিসে অনার্স?
হিস্ট্রি।
কোন ইয়ার চলছে?
ফাস্ট ইয়ার।
ঝিনুকের মুখ চকিতে বিনুর চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গে মন ভারী হয়ে যায়। অল্পবয়সে মা-বাবার গৃহযুদ্ধের কারণে স্কুলে তিনটে বছর নষ্ট হয়েছিল ঝিনুকের। নইলে এতদিনে তারও বি.এ পড়ার কথা। ম্যাট্রিক পাস করার পর ঢাকায় সেই যে বিপর্যয়টা ঘটে গেল, তারপর ওর পড়াশোনার কথা কেউ আর ভাবে নি। ঝিনুক নিজেও না। ভাবার মতো মনের অবস্থা তখন কি ছিল? না, এখনও আছে?
ঝুমা বলল, কলকাতায় যখন চলে এসেছ, আমার সম্বন্ধে সব জানতে পারবে। হেমদাদু আর দুই দিদিমার কথা বল—
কলকাতায় পৌঁছবার পর আত্মীয়পরিজন যার সঙ্গেই দেখা হচ্ছে, হেমনাথদের সম্পর্কে বলতে হচ্ছে। ঝুমাকেও না বলে পারা গেল না। তবে অনেক কাটছাঁট করে। সংক্ষেপে। বিশদ করে বলার মতো উদ্যম তার আর অবশিষ্ট নেই।
