আমার দিকে তাকিয়ে ছিলি! সুনীতি অবাক।
হ্যাঁ। মাথাটা একেবারে ঘাড় পর্যন্ত হেলিয়ে দিল সুধা। ফিসফিসিয়ে বলতে লাগল, তুই কী করছিলি জানিস দিদি?
ভয়ে ভয়ে সুনীতি শুধলো, কী করছিলাম?
গলার স্বর কাঁপয়ে কাঁপিয়ে সুধা বলল, একেবারে মুগ্ধ, মুগ্ধ হয়ে—
বিব্রত, বিপন্ন সুনীতি ঝঙ্কার দিয়ে উঠল, তোকে আর ইয়ার্কি দিতে হবে না ফাজিল মেয়ে—
হঠাৎ কে যেন ডেকে উঠল, বড়কত্তা, বড়কত্তা বড়কত্তা—
নিশ্চয়ই হেমনাথ। সবাই চকিত হয়ে উঠল।
১.০৮ অবনীমোহনের সঙ্গে কথা
অবনীমোহনের সঙ্গে কথা বলতে বলতে আগে আগে হাঁটছিলেন হেমনাথ। ডাকটা কানে আসতে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। তারপর এদিক সেদিক তাকাতেই তাঁর চোখে পড়ে গেল। বিনুরাও দেখতে পেল।
সামনের দিক থেকে একটা লোক লম্বা লম্বা পা ফেলে ব্যস্তভাবে এগিয়ে আসছে। কাছাকাছি আসতে টের পাওয়া গেল, তার বয়স অনেক দিন আগেই পঞ্চাশ পেরিয়েছে। এখন ষাট ছুঁই ছুঁই। বেশির ভাগ চুলই রুপোর তার। অবশ্য কাঁচা চুলেরা একেবারে দখল ছাড়েনি, এখানে ওখানে ছড়িয়ে থেকে যতখানি পেরেছে যৌবনের পতাকা তুলে রাখতে চেষ্ট করছে। মুখখানা পরিষ্কার কামাননা। পরনে বাড়িতেকাঁচা হাফহাতা পাঞ্জাবি, স্কুল প্রায় হাঁটু পর্যন্ত। তুলনায় ধুতিটা অস্বাভাবিক খাটো, খালি পা। গলায় তিন লহর তুলসীর মালা।
এতখানি বয়স হয়েছে, কিন্তু শরীর মেদশূন্য, স্বাস্থ্যের ভিত বেশ মজবুত। মাঝারি মাপের শক্ত সবল এই মানুষটিকে ঘিরে কোথায় যেন খানিকটা দৃঢ়তা ফুটে আছে।
হেমনাথ বললেন, আরে অধর যে। কেমন আছ?
লোকটা অর্থাৎ অধর বলল, ভালই। আপনের শরীল গতিক?
ওই একরকম চলছে। হেমনাথ হাসলেন, তারপর এই দুপুরবেলা সেজেগুঁজে গিয়েছিলে কোথায়?
বিনুর হাসি পেল। পরেছে তো একটা বেঢপ পাঞ্জাবি আর খাটো ধুতি, তাতে আবার পায়ে জুতো নেই। একে নাকি সাজা বলে!
অধর বলল, আপনের বাড়ি গেছিলাম। গিয়া শুনলাম, আমাগো এইদিকে আছেন। বৌ-ঠাইরেন বইতে কইছিল, আমি আর বসি নাই। লৌড়াইতে লৌড়াইতে ফিরা আইছি, যদি আপনেরে এইখানে ধরতে পারি। শ্যাষম্যাষ পারছি।
আমাদের বাড়ি গিয়েছিলে কেন?
বড় দরকার– বলতে বলতে বিনুদের সম্বন্ধে সচেতন হয়ে অধর শুধলো, এয়ারা? এগো তো আগে দেখি নাই।
হেমনাথ আলাপ করিয়ে দিলেন। অধরের পরিচয়টাও এবার পাওয়া গেল। পুরো নাম অধর সাহা। রাজদিয়া থেকে কয়েক মাইল উজানে কমলাঘাটের মস্ত গঞ্জ, অধর সেখানে বড় পাইকারি ব্যবসাদার। অনেকগুলো ধান-চালের আড়ত আছে তার। টাকাপয়সা যে কত তার লেখাজোখা নেই।
পরিচয় টরিচয় হল বটে, বিনুদের সম্বন্ধে কিন্তু তেমন আগ্রহ নেই অধরের। সে হেমনাথকে বলতে লাগল, এইদিকে যহন আইসাই পড়ছেন আর দেখাটাও হইয়া গ্যাছে তহন আমার বাড়ি একবার পায়ের ধূলা দিতে হইব।
হেমনাথ বললেন, আজ আর তোমার ওখানে যেতে বলো না অধর। তাকিয়ে দেখ কত বেলা হয়েছে। রামকেশবটা রাস্তা থেকে ওর বাড়ি ধরে নিয়ে গিয়েছিল। বড় দেরি করিয়ে দিয়েছে। বাড়ি ফিরতে ফিরতে আমাদের বেলা হেলে যাবে।
রামক্যাশবের বাড়ি যাইতে পারেন আর আমার বাড়ির কাছে আইসা যাইবেন না, হেয়া (তো) কিছুতেই হইব না। নাছোড় পেয়াদার মতো জেদ ধরল অধর, আসেন
হেমনাথ বোঝাতে চাইলেন, পরে একদিন আসব’খন। এখন তোমার ওখানে গেলে আরও দেরি হয়ে যাবে। ছেলেমেয়েগুলোর এখনও স্নান-খাওয়া হয়নি।
কিন্তু কে কার কথা শোনে। অধর বলতে লাগল, দুই দন্ডও না বড়কত্তা, হের (তার) আগেই আপনেরে ছাইড়া দিমু। এটু কষ্ট কইরা একবার খালি আহেন। জবর দরকার–
হেমনাথ বললেন, তোমার দরকারের কথাটা এখানেই বলে ফেল না।
এইখানে কইলে হইব না, বাড়িতে নিয়া কয়টা জিনিস আপনেরে দেখামু।
ছাড়বে না যখন কী আর করা। চল– অধরের জেদ আর মিনতির কাছে নিজেকে সঁপে দিলেন হেমনাথ।
এই সময় অবনীমোহন বলে উঠলেন, আপনি ঘুরে আসুন মামাবাবু, আমরা বরং রাস্তায় দাঁড়াই। হেমনাথ ব্যস্ত হয়ে পড়লেন, রাস্তায় কি দাঁড়িয়ে থাকবে, এস—এস—
অধরও সায় দিল, হ হ, আসেন—
বিনুরা যেদিক থেকে এসেছিল, আবার সেদিকে খানিকটা পিছিয়ে যেতে হল। তারপর রাস্তা থেকে ডান ধারে দু’পা গিয়ে সরু খালের ওপর বাঁশের সাঁকো, সাঁকো পেরিয়ে অধরের পিছু পিছু যেখানে এসে তারা পৌঁছল সেটা ফুলফলের বাগান। আশ্বিনের এই দুপুরবেলায় গাছগাছালির ঘন ছায়া এখানে নিবিড় হয়ে আছে। ছায়াচ্ছন্ন বাগানটার পর টিনের চমৎকার একখানা তিনতলা বাড়ি।
কলকাতায় সাততলা আটতলা কত বাড়ি দেখেছে বিন, তাদের ছাদগুলো যেন আকাশের মেঘেদের ছুঁয়ে আছে। কিন্তু টিনের তেতলা এই প্রথম দেখল। অবাক চোখে চারদিকে তাকাতে লাগল সে।
অধর সাহার বাড়িটার মাথায় প্যাগোডার মতো নকশা করা টিনের চাল। তার দু’ধারে দুটো টিনের ময়ূর পেখম মেলে আছে। দেওয়ালগুলো অবশ্য কাঠের।
বাড়ির ভেতরে ঢুকে অধর বলল, চলেন, দোতালায় যাই।
হেমনাথ বললেন, আবার টঙে ওঠাবে?
উপুরে না গ্যালে তো জিনিসগুলান দেখাইতে পারুম না।
কাঠের সিঁড়ি বেয়ে আগে আগে ওপরে উঠতে লাগল অধর। হেমনাথরা তাকে অনুসরণ করতে লাগলেন।
একটা ব্যাপার বিনু লক্ষ করল, বাড়িটা আশ্চর্য রকমের নির্জন আর স্তব্ধ। অধর সাহা ছাড়া আর কাউকেই দেখা যাচ্ছে না। শিশু-বৃদ্ধ-যুবক বা যুবতীর কণ্ঠস্বর কোনও দিক থেকেই ভেসে আসছে না। রূপকথার যক্ষপুরীর মতো এখানে জীবনের কোনও অস্তিত্ব বুঝি নেই।
