সেই সাড়ে ন’টায় বেরিয়েছে। হাতিবাগান বাজার ঘুরে টালিগঞ্জ পর্যন্ত ছোটা, ফিরে আসা। সমস্ত দিন প্রায় দৌড়ের মধ্যেই কেটেছে। সারা শরীর জুড়ে অবসাদ। ক্লান্তি। খানিক পরে ফের বেরুতে হবে। কথা বলার মতো যথেষ্ট উদ্যম বা শক্তি তেমন আর অবশিষ্ট নেই। তবু সব জানাতে হল।
নতমুখে ম্রিয়মাণ বসে থাকে সুনীতি। আনন্দর খাওয়া থেমে গিয়েছিল। সেও নিশ্ৰুপ। অনেকক্ষণ পর বিষাদমাখা গলায় সুনীতি বলল, আমরা তো পারলাম না। সুধাদের কাছে গিয়েই থাক।
সুনীতিরা কতটা দুঃখ পেয়েছে, কী নিদারুণ লজ্জা, আবার তা টের পাওয়া যাচ্ছে। গুমোট, ভারী আবহাওয়া হালকা করার জন্য কণ্ঠস্বরে উত্তেজনা মিশিয়ে বিনু বলল, আজ হিরণদাদের বাড়িতে কার সঙ্গে দেখা হয়েছে জানিস বড়দি?
সুনীতি জিজ্ঞেস করল, কার সঙ্গে?
বল না–
কী করে বলব? আমরা কি ওখানে ছিলাম? না এখান থেকে সুধাদের বাড়ির ভেতর পর্যন্ত দেখা যায়?
বিনু বলল, আমাদের সেই রাজদিয়ার যুগল এসেছিল। কত বছর পর দেখা—
সুনীতি নিচু গলায় বলল, শুনেছি, যুগল সুধাদের বাড়ি মাঝে মাঝে আসে।
ওরা মুকুন্দপুর বলে একটা জায়গায় ফাঁকা জমি দখল করে বাড়িঘর তুলেছে। এই নিয়ে জমি মালিকের গুন্ডাদের সঙ্গে রোজ হাঙ্গামা লেগে আছে। সেই সব বলছিল।
জানি। আমাদের এখানেও একদিন যুগল এসেছিল। কিন্তু—
সুনীতি হঠাৎ চুপ করে গেল। তার মুখে মলিন ছায়া পড়েছে।
দিদিকে লক্ষ করছিল বিনু। সুধাদের বাড়িতে যুগলের সেই কথাগুলো মনে পড়ে গেল। হেমনলিনী তাকে বাড়ির ভেতর ঢুকতে দেন নি, দরজা থেকেই পোকামাকড়ের মতো হাঁকিয়ে দিয়েছেন। যুগলের বলার মধ্যে তীব্র অনুযোগ ছিল। ছিল প্রবল আক্ষেপ। হতাশা। রাগ। হেমনলিনীর রূঢ় আচরণের কথা ভেবেই হয়তো থেমে গেছে সুনীতি। যুগল সুধাদের কাছে আসে, অথচ এ বাড়ির দরজা তার কাছে বন্ধ, এটাই সুনীতিকে নতুন করে পীড়া দিচ্ছে। যুগল আর কখনও আসবে না, বিনুরাও চলে যাবে। প্রিয়জনদের সঙ্গে সম্পর্কের সুতোগুলো একে একে ছিঁড়ে যাচ্ছে।
বিনু ভাবে, তাদের এ বাড়িতে থাকতে দেওয়া গেল না, তাই সুনীতির মন ভীষণ খারাপ। তার ওপর যুগলের প্রসঙ্গটা না তুললেই ভাল হত।
একসময় নিয়মরক্ষার খাওয়া চুকিয়ে উঠে পড়ল বিনু। সঙ্গে আনন্দও। এ ঘরেরই এক কোণে। হাতমুখ ধোয়ার ব্যবস্থা। জলের কল, বেসিন। আঁচানো হলে সুনীতি বলল, তোর আনন্দদার সঙ্গে ওপরে যা। ঘন্টাখানেক ঘুমিয়ে নে। আমি পরে আসছি।
দোতলায় উঠে দক্ষিণের সেই ঘরখানার দিকে যেতে যেতে বিনু বলল, আনন্দদা, আমরা বেশি দেরি করব না। পাঁচটা সোয়া পাঁচটায় বেরিয়ে পড়ব। ঘোড়ার গাড়ি কিভাবে পাওয়া যাবে?
আনন্দ বলে, এ নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। যতীনকে দিয়ে ডাকিয়ে আনব। ঘরের দরজা পর্যন্ত এল সে। ভেতরে ঢুকল না। যাও, শুয়ে পড়। আমি থাকলে তোমার বিশ্রাম হবে না।
আনন্দ চলে গেলে ঘরে এসে বিছানায় শরীর ঢেলে দেয় বিনু। কিন্তু ঘুম আসে না।
বাইরে হেমন্তের বিকেল নিস্তেজ হয়ে আসছে। জানালা দিয়ে আকাশের যে আয়তক্ষেত্র চোখে পড়ে সেখানে মহাশূন্যে কটা চিল অলস ডানায় ভেসে বেড়াচ্ছে। রোদে দুপুরের সেই ঝলমলে ভাবটা নেই। যতদূর নজর যায়, হালকা কালচে ছায়া দ্রুত ছড়িয়ে যাচ্ছে।
মস্তিষ্কের গোপন কুঠুরি থেকে সেই চিন্তাটা ফের বেরিয়ে আসে। আপাতত কয়েকটা দিন সে চাপমুক্ত। ঝিনুককে নিয়ে সুধাদের বাড়িতে অন্তত লজ্জায়, গ্লানিতে কুঁকড়ে থাকতে হবে না।
কিন্তু এ তো সাময়িক বিরতি। রুদ্ধশ্বাসে ছুটতে ছুটতে ফুসফুঁসে বাতাস টেনে নেবার সামান্য অবকাশ। অনন্ত দুর্ভাবনার চিরতরে অবসান তাতে ঘটবে না।
সুধাদের বাড়িতে ক’দিন আর থাকতে পারবে? এক সপ্তাহ, দু’সপ্তাহ। তারপরও রয়েছে শতসহস্র দিন। পারাপারহীন, দীর্ঘ ভবিষ্যৎ কোথায় কতদূরে গিয়ে ঠেকেছে, কে জানে। ঝিনুকের মতো একটি ধর্ষিত মেয়েকে নিয়ে কিভাবে বাকি জীবন কাটবে, ভাবতে ভরসা হয় না বিনুর। মাঝে মাঝে বেপরোয়া হয়ে উঠতে ইচ্ছা করে। যা ঘটার ঘটুক, যে কোনও পরিস্থিতির মুখোমুখি বুক চিতিয়ে দাঁড়াবে। কাউকে তোয়াক্কা করবে না। কিন্তু এই পর্যন্তই। পরক্ষণে তার প্রতিজ্ঞা, তার আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরে যায়। সামনে হাজারটা বাধা। কত রকম প্রতিবন্ধকতা মাথা উঁচিয়ে আছে। সে সব পেরিয়ে যাওয়া কী যে কঠিন!
হঠাৎ সূক্ষ্মভাবে একটা আক্ষেপ বিনুকে ভেতর থেকে ঝকানি দিতে থাকে। ঝিনুককে পাকিস্তান থেকে না আনলেই বোধহয় ভাল হত। একা, ঝাড়া হাত-পায়ে এলে তার কোনও সমস্যাই থাকত। জীবন হত ভারশূন্য, মুক্ত। সুধা সুনীতি বা অবনীমোহনের কাছে থেকে ধীরেসুস্থে নিজের ভবিষ্যৎ সে তৈরি করে নিতে পারত।
ভাবনার বৃত্তটা পূর্ণ হবার আগেই চাবুকের ঘা পড়ে মুখের ওপর। একের পর এক। অবিরাম।
এ কী ভাবছিল সে! যে মেয়েটা সেই কোন ছেলেবেলা থেকে তার সঙ্গে লক্ষ পাকে জড়িয়ে আছে, মিশে আছে তার স্বাসবায়ুতে, তাকে ফেলে আসার চিন্তা কেমন করে তার মাথায় এল? নিজেকে ধিক্কার দেয় বিনু। আত্মগ্লানিতে মন ভরে ওঠে।
আচমকা কার কলকলানি কানে ভেসে আসে। কোনও মেয়ের কণ্ঠস্বর। গলাটা চেনা চেনা। তবে সুনীতি নয়, মাধুরী নয়। হেমনলিনীও নন। দুলালী বা বাড়ির অন্য কাজের মেয়েও না। কাজের মেয়েদের সাধ্য কী, এমন হইচই বাধায়।
