বোঝা গেল, আনন্দ এবং সুনীতি সুধাদের ব্যাপারটা গোপন রেখেছে। ভালই করেছে।
হেমনলিনীর ঝক ঝক প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে অযথা সময় নষ্ট। উঠে আসবে নানা অস্বস্তিকর প্রসঙ্গ। সব শুনলে তিনি আদৌ খুশি হবেন না।
উৎকণ্ঠায় দমাদ্দম হৃৎপিণ্ডে হাতুড়ির ঘা পড়ছে। বিনু এগিয়ে গিয়ে কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে মাউইমা?
ক্ষণেক আগে হেমনলিনী যা জানতে চাইছিলেন, এখন আর সে সব নিয়ে কৌতূহল নেই। বললেন, তোমার দেরি দেখে সেই দেড়টা থেকে ঝিনুক পাগলের মতো কেঁদে চলেছে। বিছানা থেকে নামছে না। কিছু মুখে তুলছে না। আমরা বাড়িসুষ্ঠু সবাই কত করে বলছি, শুনছেই না। তুমি একটু বোঝাও বাবা।
বিনু বলল, আমি দেখছি।
অনেকক্ষণ ঠায় দাঁড়িয়ে আছি। পা ধরে গেছে। এখন যাই?
আসুন–
দরজার বাইরে ঝিনুকের ছোঁয়া বাঁচিয়ে কর্তব্য পালন করছিলেন হেমনলিনী। দায়িত্ব হস্তান্তর করে তিনি চলে গেলেন। যে কাজের মেয়েগুলো দূরে দাঁড়িয়ে ছিল, ধমকে তাদের তাড়ালেন। শুধু আনন্দই দরজার মুখে দাঁড়িয়ে রইল।
বিনু ঘরের ভেতর চলে আসে। আনন্দও। দুই হাঁটুর ফাঁকে মাথা গুঁজে ঝিনুক খাটে বসে আছে। তার পাশে সুনীতি। ম্লান মুখে, নিঃশব্দে ঝিনুকের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
নিবিড় ভোলা চুল কাঁধের ওপর দিয়ে সামনে ছড়িয়ে পড়েছে। পিঠ কেঁপে কেঁপে উঠছে ঝিনুকের। অবিরল কান্নার দমকে। অবিকল সকাল বেলার সেই দৃশ্য।
বিনু নিচু গলায় ডাকল, ঝিনুক—
সাড়া নেই। কেঁদেই চলেছে মেয়েটা।
আরও বারকয়েক ডাকাডাকির পর মুখ তোলে ঝিনুক। চোখ রক্তের ডেলা।
কান্নাটা লহমায় উতরোল হয়ে ওঠে। গলা চিরে চিরে ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসে অপার্থিব কোনও ক্রন্দনের ধ্বনি। করুণ। কাতর। একটানা। তারই মধ্যে জড়িয়ে জড়িয়ে ঝিনুক বলে, দেড়টায় আসবে বলছিলে। কেন তিনটে বাজিয়ে ফিরলে?
বিনু নরম গলায় বলল, শহরের আরেক মাথায় গিয়েছিলাম। এখান থেকে অনেক দূর। ট্রামে বাসে যেতে হয়। আগে থেকে কি বোঝা যায়, সেখানে কতক্ষণ লাগবে? ভেবেছিলাম তাড়াতাড়ি ফিরতে পারব। কথা বলতে বলতে দেরি হয়ে গেল।
আমার ভীষণ ভয় করছিল।
বড়দি আছে, আনন্দদা আছে। কিসের ভয়?
জবাব নেই।
ঝিনুক ধীরে ধীরে শান্ত হচ্ছে। কান্নাটা ক্রমশ স্তিমিত হয়ে আসে।
বিনু জিজ্ঞেস করে, সবাই এত করে বলেছে, খাও নি কেন?
ঝিনুক সজল চোখে তাকায়, তুমি ফিরছিলে না, তাই—
কোথাও গিয়ে যদি আটকে যাই, তুমি না খেয়ে এমন কান্নাকাটি করবে? কোনও মানে হয়? জানো, তোমার জন্যে এখনও এ বাড়ির কারোর খাওয়া হয় নি?
ঝিনুক লজ্জা পেয়ে মুখ নামায়। হয়তো তার মনে হয়, নিজেকে নিয়েই সে বড় বেশি উতলা হয়ে পড়েছিল। অন্যদের কথা একবারও ভাবে নি।
বিনু বলল, যাও, বাথরুমে গিয়ে চোখেমুখে জল দিয়ে এস। সকালের জলখাবারের মতো এ ঘরেই ঝিনুকের ভাত পাঠিয়ে দিতে বলল সুনীতিকে।
সুনীতি খাট থেকে নেমে বেরিয়ে গেল। ঝিনুক গেল বাথরুমে।
খানিক পরে খেতে খেতে ঝিনুক মনে করিয়ে দেয়, আমরা কিন্তু আজই এখান থেকে চলে যাব–
বিনু বলে, সেই ব্যবস্থাই তো করতে গিয়েছিলাম। খেয়ে কিছুক্ষণ জিরিয়ে নাও। সন্ধের আগে বেরিয়ে পড়ব।
বিনু যখন কথা দিয়েছে, অগাধ স্বস্তি। সমস্ত দুর্ভাবনার অবসান। কোথায় নিয়ে যাওয়া হবে, একবারও জানতে চাইল না।
বিনু ঝিনুকের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার ওপর কী গভীর বিশ্বাস মেয়েটার! কী অসীম নির্ভরতা! বুকের ভেতর পুরনো মায়া নতুন করে উথলাতে থাকে।
ঝিনুকের খাওয়া হলে সুনীতি বিনু আর আনন্দকে খাওয়ার ঘরে নিয়ে গেল। এ বাড়িতে চিরকালের প্রথা, পুরুষেরা আগে খাবে, তারপর মেয়েরা। সবার শেষে কাজের লোকজন।
আনন্দর ভাই দীপক সাড়ে ন’টায় অফিসে চলে গেছে। পুরুষ বলতে আপাতত দু’জন। আনন্দ আর বিনু। ফুলতোলা আসন পেতে তাদের খেতে বসিয়ে দিল সুনীতি।
রান্নার ঠাকুর মাঝে মাঝে এসে দরকারমতো ভাত ডাল তরকারি মাছ মাংসটাংস দিয়ে যাচ্ছে। কত যে বাটি ঝকঝকে প্রকাণ্ড কাঁসার থালার চারপাশে!
টালিগঞ্জ থেকে আসার সময় এক গাদা লুচিমিষ্টি খাইয়ে দিয়েছিল সুধা। গলা পর্যন্ত ঠাসা। অবেলায় ভাত খেলে সহ্য হয় না বিনুর, সারা শরীর ঢিস টিস করতে থাকে। কাল মাঝরাতে আচমকা এসে পড়ায় সেভাবে খাওয়ানো যায় নি। তাই আজ রান্নাবান্নার বিপুল আয়োজন। শুধু তাদেরই জন্য। না বললে সুনীতি ছাড়বে না, ভীষণ কষ্ট পাবে। হেমনলিনীর কানে গেলে ছুটে আসবেন। আপ্যায়নের এতটুকু ত্রুটি হতে দেবেন না। বিনু খুঁটে খুঁটে একটু আধটু মুখে তুলতে লাগল।
হেমনলিনীদের সামনে কিছুই জিজ্ঞেস করা যায় নি। এমনকি ঝিনুক যখন তার ঘরে একা ছিল তখনও নয়। সুধাদের সঙ্গে কী কথাবার্তা হল, না জানা পর্যন্ত অন্যের সামনে মুখ খোলা ঠিক নয়। ভীষণ কৌতূহল হচ্ছিল সুনীতি আর আনন্দর। সেই সঙ্গে যথেষ্ট উৎকণ্ঠাও।
রাধুনি ঠাকুর রান্নাঘরে ফিরে গেছে। না ডাকলে আপাতত সে আসবে না। সতর্ক চোখে খাওয়ার ঘরের বাইরেটা এক লহমা দেখে নিয়ে সুনীতি ভাইয়ের দিকে ফিরে খুব নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল, ওখানে কী হল রে? হিরণের সঙ্গে দেখা হয়েছে?
আস্তে মাথা নাড়ে বিনু, হয়েছে।
কী বললে ওরা? রাজি?
হ্যাঁ।
এত সংক্ষিপ্ত উত্তরে তুষ্ট নয় সুনীতি। সবিস্তার বর্ণনা চায় সে। বলল, কী কী কথা হল বলবি তো।
