ক্ষণিক নীরবতা।
তারপর যুগল জিজ্ঞেস করে, অহন ছুটোদিদির বাড়িতেই তো থাকবেন?
বিনু বলে, কিছুদিন তো আছিই। তারপর দেখা যাক তার মাথায় অবনীমোহনের চিন্তাটা ঘুরে গেল। তীর্থস্থান থেকে ফিরে এলে ঝিনুককে নিয়ে তার কাছে চলে যাবে সে। যুগলকে আপাতত বাবার কথাটা বলল না।
যুগল উৎসাহের সুরে বলে, একদিন আপনেরে আমাগো মুকুন্দপুরে লইয়া যামু। যাইবেন তো ছুটোবাবু?
যুগলদের দখল-করা ভূখন্ডটি দেখার জন্য ভীষণ আগ্রহ বোধ করছিল বিনু। বলল, নিশ্চয়ই যাব।
হেইখানে গ্যালে চিনাজানা মেলা মাইনষের লগে দেখা হইব। আমাগো রাইজদারই দশ ঘর পাইবেন। হেয়া (তা) ছাড়া, রসুইনা তাজপুর গিরিগুঞ্জ ইনামগুঞ্জের মানুষও আছে।
এরা কারা? কী নাম?
যুগল রহস্য করে বলে, অহন কিছু কমু না। মুকুন্দপুরে গ্যালে নিজের চৌখে দেখতে পাইবেন।
বিনু হাসল। এই নিয়ে আর পীড়াপীড়ি করল না।
যুগল এবার বলে, আমিই খালি ব্যাজর ব্যাজর কইরা যাইতে আছি। আপনের কথা কিছুই তো শুনা হইল না। দ্যাশ থিকা একাই নি আইছেন? নিকি রাইজদার আরও কেও কেও লগে আছিল?
খানিক দ্বিধা হল বিনুর। ঝিনুকের কথা বলা কি ঠিক হবে? তার সেই খবরটা কি যুগল পেয়ে গেছে? সুধাদের বাড়ি যখন তার নিয়মিত যাতায়াত, পেলেও পেতে পারে। যদি নাও পায়, বিশ্বব্রহ্মান্ডের সবাই যখন জেনে গেছে, তখন বাড়তি একজন জানলে সর্বনাশের মাত্রা নতুন করে কতটা আর বাড়বে?
ঝিনুকের লাঞ্ছনার জন্য বিনু সর্বক্ষণ কুঁকড়ে থাকে। সেটা গোপন রাখতে তার অবিরত প্রয়াস। সহসা বিনুর মনে হয়, এসবের কি প্রয়োজন আছে? তার চেয়ে সারা পৃথিবীর মুখোমুখি দাঁড়ানো দরকার। নিজেকে শক্ত করে নিল সে, ঝিনুক আমার সঙ্গে এসেছে।
কই ঝিনুক বইনে? তেনারে লইয়া আসেন। কত বচ্ছর দেখি নাই–যুগলের রুক্ষ মুখ ঝলমলিয়ে ওঠে।
বিনু বলে, ঝিনুক এখানে নেই। কাল বড়দির বাড়ি এসেছিলাম, সেখানেই আছে।
যুগলের কপাল কুঁচকে যায়, বড়দিদি আর বড় জামাইবাবু বড় ভালা। কিন্তুক দিদির শাউড়ির সাই (প্রচন্ড) দেমাক। রোখাচোখা। একবার ছুটোদিদির কাছ থিকা ঠিকানা লইয়া হেইখানে গেছিলাম। রিফুজ বইলা বাড়ির ভিতরে ঢুকতেই দিল না, দুয়ার থিকাই খেদাইয়া দিল। বড়দিদি আর বড় জামাইবাবু মুখ কালা কইরা খাড়ইয়া রইল। সে বলতে থাকে, ঝিনুক বইনেরে উইখানে রাইখেন না। পোলাপান কাল থিকা তো দেখছি, জবর অভিমান–
দুঃসংবাদটা যুগল পেয়েছে কিনা, সঠিক বোঝা গেল না। বিনু বলল, আজই ওকে এখানে নিয়ে আসব। বলতে বলতে সে উঠে পড়ে।
খুব ভালা। পরের বিষুদবার যহন আসুম, ঝিনুক বইনের লগে দেখা হইব। যুগলের চোখে ফের আলোর ছটা।
আস্তে মাথা হেলিয়ে এগিয়ে যায় বিনু। তার পেছন পেছন সুধা হিরণ আর যুগল।
সুধা বলল, বেশি দেরি করিস না।
বিনু বলে, না না, সন্ধের আগেই চলে আসব।
যুগল বলল, আপনেগো পরের বিষুদবারে কিলাম আমাগো মুকুন্দপুরে নিয়া যামু।
বিনু উত্তর দিল না।
একতলার সদর দরজা পর্যন্ত এসে সুধা আর যুগল দাঁড়িয়ে পড়ে। হিরণ কিন্তু বিনুর সঙ্গ ছাড়ে না।
হিরণের উদ্দেশ্যটা আঁচ করে নিয়েছিল বিনু। কুণ্ঠিতভাবে বলে, আপনি কোথায় যাচ্ছেন?
হিরণ হাসিমুখে বলে, চলই না—
জ্বর গায়ে আমার সঙ্গে যেতে হবে না। বাড়ি গিয়ে শুয়ে থাকুন।
জবাব না দিয়ে পাশাপাশি হাঁটতে থাকে হিরণ। বাড়ি থেকে খানিকটা যাবার পর হঠাৎই একতাড়া নোট বার করে বিনুর পকেটে ঠেসে ঠেসে ভরতে থাকে।
বিনু চমকে ওঠে, না না, দেবেন না। আমার কাছে এখনও সাড়ে ছ শ’র বেশি টাকা আছে।
থাক। এটাও রাখো–
দরকার হলে পরে চেয়ে নেব।
টাকাগুলো ফিরিয়ে দিতে যাচ্ছিল বিনু। তার হাত চেপে ধরে হিরণ। স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আস্তে আস্তে বলে, বড়রা কিছু দিলে না বলতে নেই।
তার দৃষ্টিতে কত কীই না মেশানো! স্নেহ, আবেগ, চাপা ভর্ৎসনা। বিনুর আর আপত্তি করতে সাহস হয় না। মাথা নিচু করে সে হাঁটতে লাগল।
বড় রাস্তায় এসে বিনুকে ধর্মতলার ট্রামে তুলে দিল হিরণ।
.
৩.২৩
ধর্মতলায় ট্রাম বদলে আনন্দদের বাড়ির কাছাকাছি এসে বিনু যখন নামল, হেমন্তের দিনটা বিকেলের দিকে ঢলতে শুরু করেছে। খানিক আগেও রোদে বেশ ঝাঁঝ ছিল। তপ্ত শহর দ্রুত জুড়িয়ে যাচ্ছে। ঝিরঝিরে হাওয়া এখনও তেমন ঠান্ডা হয় নি, তবু আরামে গা জুড়িয়ে যায়।
চারদিকে যথারীতি ভিড়। প্রচুর মানুষ। প্রচুর গাড়িঘোড়া। নানা ধরনের মিশ্র আওয়াজ। কোনও দিকে দৃকপাত না করে জোরে জোরে পা চালাচ্ছে বিনু। ঢের আগেই ফিরে আসতে পারত। আসা উচিতও ছিল। কিন্তু যুগলের সঙ্গে এত বছর বাদে দেখা। সহজে কি ছাড়ান পাওয়া যায়? কথায়। কথায় কত দেরি হয়ে গেল!
ট্রাম স্টপেজ থেকে বাঁ দিকে একটা চওড়া রাস্তা চলে গেছে। সেটা ধরে মিনিট তিনেক হাঁটলেই আনন্দদের বাড়ি।
ভেতরে ঢুকতেই একতলায় ঝিনুকের ঘরের সামনে জটলাটা চোখে পড়ল। হেমনলিনী আনন্দ এবং আরও দু’তিনটি কাজের মেয়ে। দুলালী ধারে কাছে নেই। সবার চোখেমুখে দুশ্চিন্তার ছাপ। কিছুটা উদ্বেগ। আনেকখানি বিরক্তি।
কী হতে পারে? বিনুর বুকের ধকধকটা শতগুণ বেড়ে যায়।
তাকে দেখতে পেয়ে হেমনলিনী হাঁফ ছাড়লেন, মনে হল। এক নিশ্বাসে তার হাজারটা প্রশ্ন। আনন্দর কাছে শুনেছেন, কী দরকারে বিনু একজনের সঙ্গে দেখা করতে গেছে। একটা, সোয়া একটায় ফিরে আসবে। এখন সাড়ে তিনটে বাজে। কোথায় গিয়েছিল সে? কার কাছে গিয়েছিল? এত দেরি হল কেন?
