হিরণ চুপচাপ বসে ছিল। এবার বলল, আমিও কত দিন বলেছি, নিচে বসো না। কিন্তু কে কার কথা শোনে। ওর মাথায় কী যে ঢুকে আছে! চেয়ারে কি সোফায় বসলে আমাদের সম্মান নাকি নষ্ট হবে!
এ নিয়ে কথা বাড়ানো বৃথা। হঠাৎ বিনুর চোখে পড়ল, ডান পা টান করার জন্য যুগলের পাজামা ঊরুর ওপর উঠে গেছে। গোড়ালি থেকে উরুর আধাআধি অব্দি মস্ত ব্যান্ডেজ। চমকে ওঠে সে, কী হয়েছে তোমার পায়ে?
নিশ্চয়ই মারাত্মক চোট পেয়েছে। যুগল কিন্তু আমলই ছিল না। ব্যথাটা একটু সইয়ে নিয়ে বলল, ত্যামন কিছু না। সুমুন্দির পুতেরা সড়কি চালাইয়া পাওখানেরে এফোড় ওফোড় কইরা ফালাইছিল।
উৎকণ্ঠিত বিনু জিজ্ঞেস করে, কারা? কাদের কথা বলছ?
যুগল জানায়, দেশভাগের পর এপারে এসে বেশ কয়েক মাস তারা শিয়ালদা স্টেশনে ঘাড় গুঁজে পড়ে ছিল। তারপর তাদের নিয়ে যাওয়া হয় রিফিউজি ক্যাম্পে। খুব মোলায়েম করে সেগুলোর নাম দেওয়া হয়েছে শরণার্থী শিবির। কিন্তু ক্যাম্পগুলোর এমন হাল, মানুষ দূরের কথা, পোকামাকড়ও থাকতে পারে না।
যুগল বলতে লাগল, শুনাশুন কানে আসতে লাগল, আমাগো চাইর পাশের কেম্পগুলান থিকা মেলা ‘রিফুজ’ ফাঁকা জমিন বিচরাইয়া (খুঁজে) বাইর কইরা বইসা পড়ছে। তমস্ত (সমস্ত) জনম কি কুত্তা বিলাইয়ের (বেড়ালের) লাখান কেম্পে পইড়া পইড়া মরুম? জান থাকতে না। আমাগো কেম্পের মানুষগুলানও হাত-পাও কোলে কইরা শুইয়া রইল না। ভোরে উইঠা চাউরগা (চাট্টি) মুখে দিয়া বাইর হই, ফিরি সন্ধ্যায় আন্ধার নামলে। ঘুইরা ঘুইরা শ্যাষম্যাষ একখান জমিন পাইয়া গেলাম। লগে লগে দখল কইরা ঘর তুলোম।
কিন্তু নিশ্চিন্ত হবার কি যো আছে? উদ্বাস্তুদের জীবনে নিরঙ্কুশ সুখভোগ বলে কিছু নেই। জমির মালিক তার মালিকানা ছাড়বে কেন? প্রথমে ভালয় ভালয় উঠে যেতে বলল। কাজ না হওয়ায় শুরু হল শাসানি। নিরন্তর হুমকি। কিন্তু যুগলরা অনড়।
জমিদারের হাতে অঢেল টাকা, প্রচুর গুন্ডা, রকমারি মারণাস্ত্র। এবার তারা পাঠাতে লাগল হানাদারের দঙ্গল। রাতের আঁধারে আততায়ীরা মশাল জ্বালিয়ে, রে রে করে দিগদিগন্ত কাপিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে লাগল। আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে ঝুড়িয়ে, খুন করে, যুগলদের উৎখাত করে দেবে। পাকিস্তানে। যেমনটা চলছে, অবিকল তাই। কিন্তু যুগলরা চায় না আবার ক্যাম্পে ফিরতে, চায় না নতুন করে উদ্বাস্তু হতে। ততদিনে তারা আশেপাশের বাঁশ ঝাড় আর সুপারি বন কেটে বানিয়ে নিয়েছে টেটা সড়কি ল্যাজা লাঠি এবং নানা আদিম অস্ত্রশস্ত্র। গড়ে তুলেছে প্রতিরোধ বাহিনী। হানাদারদের বিরুদ্ধে তারা রুখে দাঁড়াতে লাগল। তেমনই এক নৈশ যুদ্ধে সড়কির ফলা আমূল তার ঊরু থেকে পায়ের গোছ পর্যন্ত ঢুকে যায়।
এক রোমাঞ্চকর কাহিনী শুনছিল বিনু। শিহরন জাগানো। তাদের সেই যুগল, যে একদিন রাজদিয়ায় হেমনাথের বাড়ি কামলা খাটতে এসেছিল, পূর্ব বাংলার খাল বিল নদী এমনি অজস্র জলধারা, জলতলের অপার রহস্য, মাছ পাখি শাপলা শালুক, পাট খেত, ধানবন, ভুবনজোড়া বিপুল আকাশ যাকে সারাক্ষণ আচ্ছন্ন করে রাখত, সে কিনা সীমান্তের এপারে এসে এমন তুমুল, দুঃসাহসিক কান্ড বাধিয়ে বসেছে!
দেওয়াল ঘড়িতে সুরেলা আওয়াজ করে দুটো বাজল। চকিত হয়ে উঠল বিনু। যুগল সম্পর্কে আরও কত কী যে জানতে ইচ্ছা করছিল, কত অফুরান কৌতূহল যে সে উসকে দিয়েছে। কিন্তু এখন আর হাতে সময় নেই, যথেষ্ট দেরি হয়ে গেছে। উঠে পড়ার আগে সেই পুরনো প্রশ্নটা একটু ঘুরিয়ে ফের করল, তোমাদের সেই জবরদখল জায়গাটা কি খুব কাছে?
যুগল মাথা ঝাঁকায়, না ছুটোবাবু। মেলা (অনেক) দূরে। আগরপাড়ার নাম নি শুনছেন?
বিনু ভাবতে চেষ্টা করে। নামটা অজানা। বলল, না। কোথায় সেটা?
যুগল বুঝিয়ে দিল, শিয়ালদা থিকা রেলে কইরা যাইতে হয়। ইস্টিশানে লাইমা খাড়াখাড়ি মাইল দুই পুব দিকে হাটলে আমাগো জাগাখান (জায়গাটা)। নাম হইল মুকুন্দপুর।
বিনু অবাক, অত দূরে থাকো! ছোটদিদের এই বাড়ি চিনলে কী করে?
এই প্রশ্নটার জবাব দেয় হিরণ। ক্যাম্পবেল হাসপাতালে কিছুদিন আগে তার এক কলিগ ভীষণ অসুস্থ হয়ে ভর্তি হয়েছিল। প্রায়ই সে ভিজিটিং আওয়ার্সে সহকমটিকে দেখতে যেত। হাসপাতালের গেটের কাছে আচমকা যুগলের সঙ্গে দেখা। পায়ের চোট নিয়ে কদিন ধরেই সে ক্যাম্পবেলে আসছে, ডাক্তার নার্স ঝাড়দার থেকে ওয়ার্ড বয় পর্যন্ত সবার হাতে পায়ে ধরছে, কাকুতি মিনতি করছে, কিন্তু কেউ পাত্তা দিচ্ছে না। এদিকে ক্ষতস্থানটা পেকে দুনিয়ে উঠেছে। পা ফুলে তিন গুণ। যন্ত্রণায়, টাটানিতে প্রাণ বেরিয়ে যাবার যোগাড়।
ঢাকুরিয়া লেকের ধারে মিলিটারি হাসপাতালে হিরণের এক বন্ধু ডাক্তার। সে যুগলকে তার কাছে নিয়ে আসে। বন্ধুটি খুব যত্ন করে যুগলের চিকিৎসা শুরু করে। ফি বেস্পতিবার মুকুন্দপুর থেকে এসে পা দেখিয়ে ড্রেস করায় যুগল। হিরণদের ঠিকানা আগেই জেনে নিয়েছিল। ড্রেসিংয়ের পরসোজা এখানে চলে আসে। সারাটা দুপুর কাটিয়ে বেলা পড়লে ফিরে যায়।
যুগল বলল, এইবার বোঝলেন তো ক্যামন কইরা এই বাড়ির দিশা পাইছি। ছুটো জামাইবাবুর লগে হেইদিন কেমবেলে (ক্যাম্পবেল) দেখা না হইলে নিয্যস (নিশ্চয়ই) মইরা যাইতাম। তার গলার স্বর ভারী হয়ে ওঠে।
