খানিক পর উমা যাকে সঙ্গে করে নিয়ে এল, তার সঙ্গে এ জীবনে আর কখনও দেখা হবে, তাও টালিগঞ্জের এই বাড়িতে, কে ভাবতে পেরেছিল! যুগল সামনে দাঁড়িয়ে।
দেশভাগের ঠিক পরে ফের দাঙ্গা বাধলে ভাটির দেশ থেকে শ্বশুরবাড়ির লোকজনদের নিয়ে রাজদিয়ায় এসে এক লহমা বিনুদের সঙ্গে দেখা করেই ইন্ডিয়ায় পালিয়ে এসেছিল যুগল। তারপর নতুন করে পাকিস্তান জুড়ে শুধুই আতঙ্ক। অন্তহীন। নিরবচ্ছিন্ন। যুগলের স্মৃতি কবেই ঝাঁপসা হয়ে গেছে। কিন্তু জীবন এক আশ্চর্য যাদুকর। কখন যে গোপন ঝুলি থেকে কী চমক বার করে আনবে, আগেভাগে টেরও পাওয়া মুশকিল। সময়ের পলি পড়ে পড়ে মন থেকে যে মুছে গিয়েছিল, পৃথিবীর আরেক প্রান্তে সহসাই হয়তো তার সঙ্গে একদিন দেখা হয়ে যায়।
রাজদিয়ায় হেমনাথের বাড়ি যেদিন প্রথম যুগলকে কামলা খাটতে দেখেছিল বিনু, কী চমৎকারই না ছিল সে। কষ্টিপাথরে কাটা চেহারা। পেটানো সতেজ স্বাস্থ্য, চওড়া বুকের ছাতি। সর্বক্ষণ টগবগ করে ফুটছে।
শক্তপোক্ত কাঠামোটা অটুটই আছে যুগলের। কিন্তু স্বাস্থ্যের অনেকটাই খোয়া গেছে। গাল ভাঙা, মুখে খাপচা খাপচা দাড়ি, কণ্ঠার হাড় গজালের মতো ঠেলে বেরিয়ে এসেছে। চোখ গর্তে ঢোকানো। চুল উঠে উঠে কপালটা মাঠ। পরনে আধময়লা পাজামা আর ডোরাকাটা সবুজ হাফ শার্ট। পায়ে তালিমারা স্যান্ডেল।
পরস্পরের দিকে অপার বিস্ময়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে দুজনে। বিনুকে দেখতে দেখতে যুগলের পা থেকে মাথা পর্যন্ত বিদ্যুৎ খেলে যায়। আনন্দে, উত্তেজনায় সে চেঁচিয়ে ওঠে, আমাগো ছুটোবাবু না!
বিনুও খুব খুশি, খানিক আগে যেমনটা হয়েছিল সুধাকে দেখে। বলল, হ্যাঁ। তোমাকে ছোটদির বাড়ি দেখব, ভাবতেই পারি নি। কাছেই থাকো নাকি?
কথাগুলো কানেই যায় না যুগলের। গভীর আবেগ তার ওপর ভর করে বসেছে। শিশুর মতো দুই হাত ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে ঝড়ের গতিতে বলে যায়, কত বচ্ছর পর দেখলাম। কী ভালা যে লাগতে আছে! গত বিষুদবারও এই বাড়ি আসছিলাম। ছুটোদিদিরা তো কয় নাই, আপনে পাকিস্থান থিকা ইন্ডিয়ায় চইলা আইছেন–
সুধা বলল, বিনু সবে কালই এসেছে। রাজদিয়া থেকে চিঠি লিখে জানিয়েছিল, আসছে। সে সব চিঠি আমরা পাই নি। তোমাকে খবর দেব কী করে?
যুগল মাথা নাড়ে, হেয়া (তা) ঠিকই। বিনুকে বলে, উই পার থিকা আসনের আগে রাইজদা গিয়া যেই দিন আপনেগো লগে দেখা করলাম তহনই কইছিলাম, পাহিস্থানে থাকন যাইব না। হয় খুন করব, নাইলে বাড়িঘরে আগুন লাগাইয়া বস্যের মাইয়া (যুবতী) উঠাইয়া লইয়া খেদাইয়া দিব। মনে আছে?
যুগল লেখাপড়া শেখে নি, অক্ষরপরিচয়হীন। কিন্তু দূরদর্শী। পাকিস্তানে কী ঘটতে পারে, ভবিষ্যতের সেই চেহারাটা তার কাছে বহুকাল আগেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল।
রাজদিয়া থেকে শিয়ালদা পর্যন্ত স্টিমারে আর ট্রেনে গাদাগাদি করে আসার সময় হাজার হাজার ভিটেমাটি খোয়ানো মানুষের মুখে একই কথা শুনেছে বিনু। হুবহু একই অভিযোগ। একই আক্ষেপ। একই সর্বনাশের কাহিনী।
অন্যের কথা শুনতে হবে কেন? ঝিনুককে নিয়ে তার নিদারুণ আতঙ্ক আর অভিজ্ঞতা কি আলাদা কিছু? বিমর্ষ মুখে বিনু বলে, সবই মনে আছে।
যুগল বলল, অনেক আগেই আপনেগো চইলা আসন উচিত আছিল ছুটোবাবু।
বিনু চুপ করে থাকে।
যুগল উৎসুক সুরে এবার বলে, বড়কত্তা, দুই ঠাউরমা–তেনারা কই? ছুটোদিদি, উনাগো ডাইকা আনেন। কত কাল পর দেখা হইব। স্যাবা দিতে (প্রণাম করতে) পারুম। আমারে কী ভালাটাই না বাসতেন!
বিনু বলল, দাদুরা আসেন নি।
যুগল চমকে ওঠে, ক্যান?
হেমনাথদের রাজদিয়া ছেড়ে না আসার কারণটা সংক্ষেপে জানিয়ে দেয় বিনু।
যুগলকে বিচলিত দেখায়। ভীষণ চিন্তাগ্রস্ত। অধীরভাবে মাথা ঝাঁকিয়ে বলে, এইটা কিলাম (কিন্তু) ঠিক হয় নাই ছুটোবাবু। বড়কত্তায় এত জ্ঞেয়ানী, প্যাটে কত বিদ্যা। অত বুঝমান হইয়াও বোঝলেন না, দিনকাল আর আগের লাখান নাই! দশ বিশজন বাদ দিলে পাকিস্থানের মানুষ অন্য কিসিমের হইয়া গ্যাছে। অহনও সোময় আছে ছুটোবাবু। য্যামন কইরা পারেন, বড়কত্তারে লইয়া আসেন। কুনদিন কী বিপদ যে ঘইটা যাইব! বাকি জমন কাইন্দা কুল পাইবেন না।
হেমনাথ যে কী জেদী, কতখানি একরোখা, বিনুর চেয়ে কে আর ভাল জানে। অনেক বুঝিয়েছে তাকে, কিন্তু অবুঝ গোঁ থেকে তাকে নড়ানো যায় নি। জন্মভূমির মায়া কাটিয়ে তিনি কিছুতেই আসবেন না। রাজদিয়ার মাটি আঁকড়ে পড়ে থাকবেন। এতে যা ঘটার ঘটুক। যে কোনও পরিস্থিতির জন্য তিনি প্রস্তুত।
কিন্তু এসব আদৌ বুঝতে চাইবে না যুগল। তার কাছে পাকিস্তান হল নৃশংস এক বধ্যভূমি। কসাইখানা। সেখানে তিলমাত্র নিরাপত্তা নেই। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, যে কোনও উপায়ে সীমান্তের এপারে চলে আসা দরকার। বিনু বলল, দেখি কী করা যায়–হঠাৎ খেয়াল হল, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এক নাগাড়ে কথা বলে যাচ্ছে যুগল। ব্যস্তভাবে তাকে বসতে বলল।
যুগল বাঁ হাঁটু দুমড়ে, ডান পা’টা অনেকখানি ছড়িয়ে, খুব কষ্টেসৃষ্টে মেঝেতে বসে পড়ল। দাঁতে দাঁত চেপে কী এক যন্ত্রণা সামলাতে চাইছে।
বিনু যুগলের চোখমুখ লক্ষ করে নি। বলল, এ কী, নিচে কেন? সোফায় উঠে বসো।
যুগল বলল, বড়কত্তায় হইল আমার পুরান মুনিব। তেনার নাতি, নাতিন, নাতিন জামাইয়ের সুমখে কি চ্যারে (চেয়ারে) বইতে পারি?
