ঝিনুক। জোর করে ওখানে রাখলে মেয়েটা মরে যাবে। বাবা যে কদিন না ফিরছে আপনাদের বাড়িতে আমাদের থাকতে দেবেন?
হিরণ হকচকিয়ে যায়। বলে, এ তুমি কী বলছ বিনু! কদিন কেন, যতদিন ইচ্ছে আমাদের কাছে থাকবে। তোমার ছোটদির বাড়ি তোমার বাড়ি। আবেগে তার গলা কাঁপতে থাকে। জিজ্ঞেস করে, ঝিনুককে কবে নিয়ে আসতে চাইছ?
কতকাল পর ফুসফুস বোঝাই করে সহজভাবে বাতাস টানতে পারল, নিজেই জানে না বিনু। টালিগঞ্জের দিকে পা বাড়ানোর সময় যে দ্বিধা আর সংশয়টুকু ছিল, সব উধাও। বলল, আজই– কৃতজ্ঞতায় তার স্বর বুজে আসে। চোখের কোণদুটো সির সির করছে।
হিরণ বলল, চল, আমি তোমার সঙ্গে যাচ্ছি।
সুধা ব্যস্তভাবে বলল, জ্বর গায়ে তোমাকে বেরুতে হবে না। ঝিনুককে আনতে আমি ওর সঙ্গে যাব।
কয়েক পলক কী ভেবে নিল বিনু। সুধাকে বলল, না, কারোরই যাবার দরকার নেই। তোরা গেলে মনে করবে, আমি নালিশ করতে এসেছিলাম। তাই ঝিনুককে নিয়ে যেতে এসেছিস। এতে ওরা ভীষণ অপমানিত বোধ করবে।
এক ঘনিষ্ঠ আত্মজনের কাছে যে মেয়ে অবাঞ্ছিত, আরেক আত্মীয় তাকে আশ্রয় দেবার জন্য পড়ি মড়ি করে বাড়ি অব্দি দৌড়ে এসেছে, হেমনলিনী তা ভাল চোখে দেখবেন না। তার অহংবোধে ঘা লাগবে।
বিনু বলতে থাকে, মাঝখান থেকে তোদের সঙ্গে বড়দির শ্বশুরবাড়ির সম্পর্কটা খারাপ হয়ে যাবে।
সুধা বলল, তোরা এখানে এসে থাকবি। সেটা কি ওরা জানতে পারবে না?
জানুক। ভাববে, আমিই ঝিনুককে তোদের কাছে নিয়ে এসেছি। তোরা নিতে আসিস নি।
আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে কত রকম জটিলতা, কত রকম টানাপোড়েন! সামান্য এদিক ওদিক হলে সম্পর্কের সুতোগুলো কখন পট পট ছিঁড়ে যাবে, কেউ জানে না। কলকাতায় পা দিয়ে এসব বুঝতে শিখেছে বিনু। এক লহমায় তার বয়স আচমকা অনেকটা বেড়ে গেছে যেন।
হিরণ একদৃষ্টে লক্ষ করছিল। ক’বছর আগে রাজদিয়ায় যে চঞ্চল কিশোরটিকে দেখে এসেছে, কী নিষ্পাপই না ছিল সে। মুখে জগতের সবটুকু সারল্য মাখানো। দু’চোখে অগাধ বিস্ময় নিয়ে এই পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে থাকত। সে কি এই বিনু যে তার আর সুধার মাঝখানে এখন বসে আছে! কত অল্প সময়ে কত পরিণত হয়ে উঠেছে সে। কত অভিজ্ঞ। সংসারের নানা খুঁটিনাটির দিকে তার এখন তীক্ষ্ণ নজর।
হিরণ বলল, বিনু ঠিকই বলেছে। ও নিজেই ঝিনুককে নিয়ে আসুক।
কত কাল পর কী ভাল যে লাগছে বিনুর! হালকা। ভারমুক্ত। কিন্তু কতক্ষণ? পুরনো সেই দুশ্চিন্তাটা ফের ডালপালা মেলে তার মাথায় চেপে বসে। ভয়ে ভয়ে বলে, কিন্তু হিরণদা–
বিনুর দিক থেকে চোখ সরায় নি হিরণ। জিজ্ঞেস করল, কী বলছ?
বড়দিরা বলছিল, আপনার ঠাকুরদা আর জেঠিমা দেশ থেকে এসে এখানেই থাকেন। এখন পাটনায় বেড়াতে গেছেন। হঠাৎ যদি ওঁরা ফিরে আসেন–
ইঙ্গিতটা স্পষ্ট। হিরণের মুখে চকিতে ছায়া পড়ে। ঝিনুকের লাঞ্ছনার অনুপুঙ্খ বর্ণনা শুনতে শুনতে সে এতটাই অভিভূত হয়ে গিয়েছিল যে ঠাকুরদা আর জেঠিমার কথা মনে পড়ে নি। ক’বছরে কত কী ঘটল–মহাযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, দাঙ্গা, গণহত্যা, হাজায় হাজার নারী ধর্ষণ, সীমান্তের ওপার থেকে শরণার্থীর ঢল। বিশ্বসংসার তোলপাড় হয়ে গেল, পুরনো জীবনযাত্রা ছিন্নভিন্ন। কিছুই আগের মতো এক জায়গায় দাঁড়িয়ে নেই। সময় কত পালটে গেছে, কিন্তু এতটুকু বদলাননি ঠাকুরদা আর জেঠিমা। হেমনলিনীর মতো ওঁরাও একই ছাঁচে ফেলা। দুই বুড়োবুড়ি কি ঝিনুককে সহজভাবে মেনে নেবেন? মনে হয় না। কিন্তু বিনুকে কথা দেওয়া হয়ে গেছে। এখন আর ফেরানো যাবে না। দ্বিধা কাটিয়ে সপ্রতিভ হওয়ার চেষ্টা করল হিরণ, মাসখানেকের ভেতর ওঁদের আসার সম্ভাবনা নেই। এলে দেখা যাবে।
বিনু বলল, আরেকটা অনুরোধ হিরণদা—
বল।
কেউ ঝিনুকের সামনে ঢাকার কথা, পাকিস্তানের কথা তুলবেন না। ওর পুরনো স্মৃতি একেবারে ভুলিয়ে দিতে হবে।
.
৩.২২
যে কারণে ঊর্ধ্বশ্বাসে টালিগঞ্জে ছুটে আসা, সেটা চুকে যাবার পরও খুব সহজ বেরুনো গেল না। ভাই এতকাল বাদে এসেছে। প্রথম দিন সে কিছুই মুখে না দিয়ে চলে যাবে, সুধা কি তাই যেতে দিতে পারে? শেষ মুহূর্তে কেঁদে কেটে বিনুকে জোর করে হিরণের কাছে বসিয়ে রান্নাঘরে চল গিয়েছিল। ঘরে ভাল মিষ্টি আছে। অল্পবয়সী কাজের মেয়েটিকে সঙ্গে নিয়ে ক্ষিপ্র হাতে লুচি ভেজে থালা বোঝাই করে নিয়ে এল।
এই ভরদুপুরে এত লুচিমিষ্টি খাওয়া যায়? কিন্তু সুধা যা জেদী আর অভিমানী, কোনও কথাই শুনবে না। আপত্তি করলে সময় নষ্ট।
সামনের দেওয়াল ঘড়িতে একটা বেজে সাতাশ। এখান থেকে সুনীতিদের বাড়ি ফিরে যেতে যেতে আড়াইটা বেজে যাবে। এতক্ষণ তাকে না দেখে ঝিনুক কী কান্ড বাধিয়ে বসে আছে, কে জানে। গোগ্রাসে খেতে লাগল বিনু।
খাওয়া যখন প্রায় শেষ, বাইরের বাগানের দিক থেকে কেউ চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে ডাকতে লাগল, ছুটোদিদি, ছুটোদিদি, আমি আইসা গ্যাছি। তলে দুয়ার বন্ধ রইছে।
একটু দাঁড়াও– কণ্ঠস্বর উঁচুতে তুলল সুধা। তাদের বাড়ির কাজের মেয়েটির নাম উমা। তাকে ডেকে, একতলায় গিয়ে সদর দরজা খুলে দিতে বলল।
নিচে থেকে যে ডাকছিল তার গলা চেনা চেনা লাগছিল বিনুর। জিজ্ঞেস করল, লোকটা কে রে ছোটদি?
সুধা জবাব দেবার আগেই হিরণ বলে উঠল, তোমার খুব জানাশোনা। এলেই দেখতে পাবে। একটু অপেক্ষা কর। তার মুখে মৃদু হাসি। হাসিটা হালকা রহস্যের আবরণে মোড়া।
