যত শুনছে, চোখের তারা স্থির হয়ে যাচ্ছে সুধার। পলক পড়ে না। বুকের ভেতর বাতাস আটকে যায়। চাপা আতঙ্কে শিউরে শিউরে ওঠে সে। জোরে শ্বাস ফেলে একসময় বলে, এভাবে ঝিনুককে তোর সঙ্গে পাঠানো উচিত হয় নি দাদুর। সাঙ্ঘাতিক কিছু যদি ঘটে যেত? উঃ, আমি ভাবতেই পারছি না।
সুধা চিরকালের ভীতু। অতি তুচ্ছ কারণেও তার ভয়। কিন্তু পাকিস্তান থেকে আসার পথে আজকাল যা ঘটছে তা শুনলে পৃথিবীর সবচেয়ে সাহসী মানুষেরও হ্রাসে বুকের ভেতর হিম হয়ে যাবে।
বিনু মলিন হাসে। বলে, কিছুই তো হয় নি। শেষ পর্যন্ত প্রাণ নিয়ে ইণ্ডিয়ায় চলে আসতে পেরেছি।
হিরণ জিজ্ঞেস করে, ঝিনুক কি আনন্দদাদের ওখানে রয়েছে?
মাথাটা সামান্য হেলিয়ে দেয় বিনু, হ্যাঁ। কিছুক্ষণ ভেবে হঠাৎ ব্যাকুলভাবে বলে ওঠে, হিরণদা, কলকাতায় এসে আমি ভীষণ বিপদে পড়ে গেছি। সবে কালই এসেছি। দু’চার দিন পরে আপনাদের সঙ্গে দেখা করতাম। কিন্তু আজই ছুটে আসতে হল।
উৎকণ্ঠিত সুধা বিনুর দিকে অনেকখানি ঝুঁকে জিজ্ঞেস করে, কী হয়েছে রে?
হিরণ নিষ্পলক তাকিয়ে ছিল। চকিতে কিছু আঁচ করে নিয়ে জিজ্ঞেস করে, বিপদটা কি ঝিনুককে নিয়ে?
হ্যাঁ। বিনু বলল, সবটা বলছি, শুনুন–
হঠাৎ হিরণের খেয়াল হয়, মৃত্যুযাতনা ভোগ করতে করতে কলকাতায় পা দিয়েই আজ এখানে চলে এসেছে বিনু। আর সেই থেকেই কথা বলে চলেছে। বিরামহীন। নিশ্চয়ই ভীষণ ক্লান্ত। ওর বিশ্রাম দরকার। সারা মাথায় আতঙ্ক নিয়ে পাকিস্তানের ভেতর দিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেবার কাহিনী শুনতে শুনতে তারা এতটাই বিহ্বল হয়ে পড়েছিল যে অন্য কোনও দিকে নজর ছিল না।
হিরণ বলল, পরে শুনব। বলে সুধার দিকে ফিরল, ওকে নিয়ে বাথরুম দেখিয়ে দাও। চান খাওয়া সেরে দুপুরটা ঘুমোক। বিকেলে সব শোনা যাবে।
ভাইটার সঙ্গে এত বছর বাদে দেখা। তাকে জলটুকু পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। ক্রমাগত প্রশ্ন করে করে বকিয়ে মেরেছে। অপরাধী মুখ করে দ্রুত উঠে পড়ে সুধা। বলে, আয় বিনু।
বিনু কিন্তু বসেই থাকে। বলে, বড়দির বাড়িতে চান করে সকালের খাবার খেয়ে এসেছি। এখন আর কিছু খাব না। বেশিক্ষণ থাকতেও পারব না। তোদের সঙ্গে দরকারী কথাটা সেরেই ফিরে যাব। তুই বোস ছোটদি–
তবু হাত ধরে টানাটানি করতে থাকে সুধা। বলে, এখনই যাবার এত তাড়া কিসের? তুই এখানে এসেছিস, দিদি কি আনন্দদা জানে না?
জানে।
তা হলে আর কী। ওরা নিশ্চয়ই বুঝবে, আমরা তোকে যেতে দিই নি।
বিনু বলল, আমি ওদের কথা ভাবছি না। ঝিনুকের জন্যেই ফিরে যেতে হবে।
সুধা বলল, ও বাড়িতে দিদি আছে, আনন্দদা আছে, মাউইমা আছেন। গন্ডা গন্ডা কাজের লোক। ঝিনুকের আদর যত্নের ত্রুটি হবে না।
বিনু বলে, তোদের বললাম তো, যে ঝিনুককে দেখে এসেছিস, ঢাকা থেকে ফেরার পর সে আর তা নেই। কী কষ্ট করে ওকে আমরা খানিকটা সুস্থ করে তুলেছি, চিন্তা করতে পারবি না। এখানে দাদু নেই, দিদারা নেই, আমাকে বেশিক্ষণ না দেখলে খাবে না, চান করবে না, এমন পাগলামো শুরু করবে যে আর কারোর পক্ষে সামলানো মুশকিল। আমাকে আটকে রাখিস না ছোটদি।
অভিমানের সুরে সুধা কী বলতে যাচ্ছিল, ইশারায় তাকে থামিয়ে সোফা দেখিয়ে দিল হিরণ। সুধা ধীরে ধীরে ফের বসে পড়ে।
হিরণ বিনুর চোখের দিকে তাকায়, ঠিক আছে, ফিরেই যেও। এখন তোমার দরকারী কথাটা বল–
কাল শিয়ালদা স্টেশনে নেমে ঘোড়ার গাড়িতে ভবানীপুর গিয়ে অবনীমোহনকে না পেয়ে আনন্দদের বাড়ি যেতে হয়েছিল। রাতটা সেখানে কাটিয়েছে। সুধাদের মাত্র এটুকুই বলেছিল বিনু। কিন্তু দিদির শ্বশুর বাড়িতে ক’টা দিন থাকতে গিয়ে কী জুটল? অপমান। গ্লানি। চরম মানসিক নির্যাতন। ঝিনুকের সঙ্গে হেমনলিনী কী নিষ্ঠুর আচরণ করেছেন আর বাড়ির প্রতিটি মানুষ নীরবে, বিনা প্রতিবাদে তা সয়ে গেছে, সবিস্তারে জানাল বিনু। একটুও রাখঢাক না করে। ঝিনুকের অপরাধ, সে ধর্ষিত। তাই সে অচ্ছুৎ। কৃমিকীটের মতো নোংরা। তার নিশ্বাসে পৃথিবী অশুচি হয়ে যায়।
বলতে বলতে রাগে, আক্রোশে, তীব্র কষ্টে বিনুর মুখ রক্তবর্ণ হয়ে ওঠে। চোখ দুটো ফেটে পড়বে। আনন্দদের বাড়িতে মাথা নুইয়ে চুপ করে ছিল। নিরুদ্ধ ক্রোধ আগুনের হলকা হয়ে এখন। বেরিয়ে আসছে।
বিনু বলতে লাগল, আগে যদি জানতাম, ওদের বাড়ি কিছুতেই যেতাম না। শিয়ালদা স্টেশনে রিফিউজিদের ভেতর পড়ে থাকতাম।
হিরণ বিনুর পিঠে নরম করে একখানা হাত রাখে। বলে, ভবানীপুর পর্যন্ত এসেছিলে। সেখান থেকে আমাদের বাড়ি তো খুব দূরে নয়। চলে এলে না কেন?
বিনু বলল, ঠিকানাটা জানি। কিন্তু এদিকে আগে কখনও আসি নি। তার ওপর অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল। খিদেয় তেষ্টায় ধকলে আমরা তখন ধুকছি। আনন্দদাদের বাড়িতে আগে গেছি। আবছাভাবে মনেও ছিল। তাই ওখানে চলে গিয়েছিলাম। তখন কি জানতাম
বিষণ্ণ হিরণ আস্তে মাথা নাড়ে। বিনুর ক্ষোভের দুঃখের অভিযোগের সহস্র কারণ রয়েছে। হেমনলিনী অতটা কঠোর না হলেই পারতেন। সেই ছেলেবেলা থেকে ঝিনুককে চেনে সে। মেয়েটার জন্য বুকের ভেতর চিনচিনে একটা ব্যথা গোপন স্রোতের মতো ছড়িয়ে পড়ে।
যে ফুটন্ত উত্তেজনা বিনুর মাথায় টগবগ করছিল, হঠাৎ সেটা জুড়িয়ে যায়। হিরণের একটা হাত আঁকড়ে ধরে সে। ব্যাকুলভাবে বলে, এক মুহূর্তও আর আনন্দদাদের বাড়ি থাকতে চাইছে।
