বিনু বলল, কাল। ঢাকা মেলে—
একমাস ধরে রোজ অফিস ছুটির পর শিয়ালদা যাচ্ছি। রিফিউজি বোঝাই হয়ে যে ট্রেন আসে, সেটার প্রত্যেকটা কামরায় গিয়ে খোঁজ করি। রোজই ভাবি, তোমরা আসবে। পরশু রাতে হিম লেগে জ্বর হল। তাই কাল আর স্টেশনে যাওয়া হয় নি। গেলে দেখা হত। শ্বশুর মশাই তীর্থে গেছেন। ভবানীপুরের বাড়ি তালাবন্ধ। কাল রাতে কোথায় ছিলে?
হিরণ কথা বলছিল ঠিকই, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বিনুকে লক্ষও করছিল। উদ্বাস্তুদের তো রোজই দেখছে সে। পাকিস্তান থেকে রিফিউজি স্পেশালগুলো শিয়ালদা স্টেশনে ফি সন্ধ্যায় এসে যাদের নামিয়ে দিচ্ছে তাদের চোখেমুখে শুধুই আতঙ্ক, শুধুই উৎকণ্ঠা। একটা নিদারুণ হননপুরী যে তারা পেরিয়ে এসেছে, সর্বাঙ্গে তার ছাপ। তেলহীন রুক্ষ চুলে সাত পুরু ধুলো, ঘোলাটে চোখ এক কড় গর্তে ঢোকানো। ভাঙা গালে কাটার মতো খাড়া খাড়া দাড়ি। পরনে ময়লা চিটচিটে জামাকাপড়। শীর্ণ, সতত ত্রস্ত। সারাক্ষণ ওরা কুঁকড়ে আছে।
বিনু যে ঢাকা মেল থেকে নেমেই এখানে আসে নি, বলে না দিলেও চলে। চুল মোটামুটি আঁচড়ানো, পরিষ্কার কামানো মুখ। পরনে বেখাপ্পা হলেও ইস্তিরি-করা পাজামা পাঞ্জাবি। চোখের কোলে অবশ্য পুরু কালির পোঁচ। একটা রাত যে নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পেরেছে তা বোঝা যায়।
বিনু বলল, বড়দির বাড়ি।
হিরণ জিজ্ঞেস করে, হেমদাদু, দুই দিদা, ওঁরা কি ওখানেই আছেন?
না। দেশ থেকে কেউ আসেন নি। দাদু রাজদিয়া ছেড়ে আসবেন না। মরতে হলে ওখানেই মরবেন।
বুঝিয়ে সুঝিয়ে নিয়ে আসতে পারলে না?
ওঁর মতো মানুষকে বোঝানো যায়? একবার যেটা ঠিক করেছেন সেখানে থেকে এক চুলও নড়ানো যাবে না।
এ পাগলামির মানে হয়? ভীষণ উদ্বিগ্ন দেখায় হিরণকে, দেশ কি আগের মতো আছে? মানুষ উন্মাদ জন্তু হয়ে গেছে।
বিনু উত্তর দেয় না। হেমনাথ স্নেহলতা আর শিবানীকে ছাপিয়ে ঝিনুকের ভাবনাটাই তাকে ক্রমাগত উতলা করে তুলছে। হিরণ বাড়িতে থাকায় একরকম ভালই হয়েছে। ঝিনুককে এ বাড়িতে নিয়ে আসার বিষয়ে দু’জনের সঙ্গে কথা বলে নেওয়া যাবে। সুধার হয়তো আপত্তি হবে না, কিন্তু হিরণের মতামতই আসল। ঝিনুকের কথা কিভাবে বলবে, সব শোনার পর ওদের প্রতিক্রিয়া কী হবে, ভেবে তল পাওয়া যাচ্ছে না। বলতে গিয়েও বাধা আসছে নিজের ভেতর থেকে। বিনুর ভয়, সুনীতিদের বাড়িতে যা হয়েছে, এখানেও যদি তাই ঘটে? একই অপমানের পুনরাবৃত্তি?
হিরণ বলে যাচ্ছিল, খবরের কাগজ খুললেই ইস্ট পাকিস্তান জুড়ে শুধু খুন, আগুন, লুটপাট, মেয়েদের ওপর অকথ্য অত্যাচার। ট্রেন বোঝাই হয়ে হাজার হাজার মানুষ পালিয়ে আসছে, রোজ তার ছবি বেরোয়। রেডিওতেও একই খবর। সারাক্ষণ আতঙ্কে থেকেছি। অফিস ছুটি হলে দিনের পর দিন শিয়ালদায় গিয়ে খোঁজ নিয়েছি, তোমরা এলে কিনা। যদি রাজদিয়া কি তার চারপাশের গ্রামগঞ্জ থেকে কেউ এসে থাকে, চেনাজানা তাদেরও খুঁজে বার করার চেষ্টা করেছি। ওদের কাছ থেকে হয়তো তোমাদের খবর পাব। কদিন আগে স্টেশনের বাইরের চত্বরে পতিতপাবনকে দেখলাম। ফ্যামিলি নিয়ে কী কষ্টে যে আছে–
বিনু বলল, পতিতপাবনের সঙ্গে কাল আমারও দেখা হয়েছে।
সে বলল, রাজদিয়ার অবস্থা ভাল না। চারদিক গরম হয়ে আছে। দেশ ছেড়ে যখন আসে তখনও কিছু হয় নি, তবে যে কোনও সময় সাঙ্ঘাতিক কিছু ঘটে যাবে। তোমাদের কোনও খবর দিতে পারল না। আমাদের মানসিক অবস্থাটা বোঝে। রোজ শিয়ালদা যাই, আর দু’দিন চারদিন পর পর তোমাদের চিঠি লিখি, কিন্তু উত্তর নেই।
আমরাও তো আপনাকে, বাবাকে আর আনন্দদাকে কত চিঠি লিখেছি। নিশ্চয়ই পান নি?
না, একখানাও না।
পোস্টাল ডিপার্টমেন্ট কোনও কাজ করছে না।
একটু চুপচাপ।
তারপর গভীর উদ্বেগের সুরে সুধা বলল, শুনেছি, কলকাতায় আসার সময় নদীতে খুনীরা দল বেঁধে হামলা চালাচ্ছে। দাদু দিদারা তোকে একা একা আসতে দিল?
বিনু বলল, না এসে উপায় ছিল না। একাও আমি আসিনি। সঙ্গে ঝিনুক ছিল।
দু’পাশের দুই সোফায় বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো চমকে উঠল সুধা আর হিরণ। শ্বাস-আটকানো গলায় সুধা বলল, ঝিনুক, মানে ঢাকায় গিয়ে যার– কথাটা শেষ না করে থেমে যায়।
ধর্ষণের খবরটা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কারোর আর জানতে বাকি নেই। আস্তে মাথা নাড়ে বিনু, হ্যাঁ। ঢাকা থেকে উদ্ধার করে নিয়ে আসার পর উন্মাদ হয়ে গিয়েছিল ঝিনুক। ঘর থেকে বেরুত না, দরজা জানালা বন্ধ করে অন্ধকারে এক কোণে বসে দিনরাত কাঁদত। সারাক্ষণ ওর ভয়, এই বুঝি হানাদারেরা তাড়া করে আসছে। ফের তাকে জোর করে তুলে নিয়ে যাবে। পাকিস্তান ওর কাছে আতঙ্কপুরী। ওখানে থাকলে ঝিনুক বাঁচত না।
কিন্তু—
কী?
ওই বয়েসের একটা মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে এলি। পথে বিপদে পড়িস নি?
এক-আধবার? সব শুনলে বুঝতে পারবি।
রাজদিয়ায় হেমনাথদের পুকুরঘাটে রাজেকের নৌকোয় ওঠার পর থেকে বর্ডার পর্যন্ত যা যা ঘটে গেছে তার বর্ণনা দিয়ে গেল বিনু। খুঁটিনাটি কিছুই বাদ দিল না। কাল রাত্তিরেও হেমনলিনীদের কাছেও একই বিবরণ দিয়েছে। আরও কতজনকে দিতে হবে, কে জানে।
সীমান্ত পর্যন্ত দীর্ঘ পথে জলেস্থলে সর্বক্ষণ মরণভয়। কতবার মৃত্যু সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, হিসেব নেই। ঝিনুকের জন্য চরম ঝুঁকিটা বিনুকে নিতেই হয়েছিল।
