কন্ডাক্টরটির দায়িত্ববোধ আছে। রেল ব্রিজ পেরুবার পর সঠিক স্টপেজেই বিনুকে নামিয়ে দিল।
শহরের এদিকটা আনন্দদের এলাকার মতো জমকালো নয়। ইটের দেওয়াল আর টিন বা অ্যাসবেস্টসের ছাউনিওলা বাড়িই বেশি। ফাঁকে ফাঁকে দু’চারটে দোতলা তেতলা। উলটো দিকে চাপ বাঁধা বস্তি। সেগুলোর মাথায় খাপরার চাল। সব মিলিয়ে দীন, মলিন।
ট্রাম রাস্তা পেরিয়ে অন্য একটা রাস্তায় ঢুকে খানিক এগুতেই ডান পাশে জাফর শা নোড। বড় রাস্তার তুলনায় এদিকটা ঢের বেশি জমজমাট। পুরনো বাড়ির পাশাপাশি নতুন নতুন বহু বাড়ি উঠেছে। অনেকগুলোর কাজ চলছে। তবে চারদিকে প্রচুর ফাঁকা জায়গা। ডোবা, পানাপুকুর, বাঁশঝাড়, তালগাছ। বেশ কিছু ফাঁকা মাঠও চোখে পড়ছে।
একটা চায়ের দোকানে খোঁজ করতেই দোকানদার হিরণদের বাড়িটা দেখিয়ে দিল। ছিমছাম দোতলা। নিচু বাউন্ডারি ওয়াল দিয়ে ঘেরা। সামনের দিকে কাঠের গেট, এক ফালি ফুলের বাগান। গেট খুলে বাগানের ভেতর দিয়ে ক’পা গেলেই সিমেন্টের তিনটে উঁচু ধাপ। ওপরে উঠে বন্ধ দরজার কড়া নাড়ল বিনু। মায়ের পেটের বোনের কাছে এসেছে। তবু বুকের ভেতরটা ভীষণ কাঁপছে। থরথর।
কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে গেল। সামনে সুধা। অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল সে। পলক পড়ছে না। স্বচক্ষে বিনুকে দেখেও যেন তার বিশ্বাস হচ্ছিল না।
বিস্ময়টা থিতোতে কয়েক লহমা লাগল। তারপরই খুশিতে চেঁচিয়ে উঠল, ও মা, তুই! এ আমি ভাবতেও পারি নি। আয় আয়– বিনুর দু’হাত ধরে টানতে টানতে দোতলার একটা ঘরে নিয়ে এল সে। নিশ্চয়ই বসার ঘর। ছিমছাম, সাজানো গোছানো। একটা বেতের সোফায় ভাইকে বসিয়ে গা ঘেঁষে বসল। বিনুর হাতটা তার নরম মুঠিতে ধরা রয়েছে।
ভাইয়ের দিক থেকে পলকের জন্য চোখ ফেরায় নি সুধা। গম্ভীর গলায় বলল, কত বছর পর দেখা হল! কত বড় হয়ে গেছিস বিনু!
যুদ্ধ শেষ হবার মুখে মুখে রাজদিয়ায় সুধা সুনীতির বিয়ে হয়েছিল একই দিনে। একই লগ্নে। সুধার বউ-ভাত হয়েছিল রাজদিয়াতেই, কেননা হিরণের ঠাকুরদা আর জেঠিমা তখনও পূর্ব বাংলার ওই শহরেই থাকতেন। সুনীতির বউ-ভাত হয়েছিল বেশ কয়েকদিন পরে, কলকাতায়।
সুধার বউভাতের পর সুনীতি আনন্দ সুধা হিরণ হেমনাথ অবনীমোহন ঝিনুক স্নেহলতা বিনু, সবাই একসঙ্গে কলকাতায় এসে হইহই করে ক’দিন কাটিয়ে গিয়েছিল।
বেয়াল্লিশের শেষাশেষি মহাযুদ্ধ যখন পুরোদমে চলছে, ডিফেন্সে চাকরি নিয়ে কলকাতায় চলে এসেছিল হিরণ। তখন সে থাকত মির্জাপুরের এক মেসে। বিয়ের পর পার্ক সার্কাসের এক পাঁচমিশালি পাড়ায় বাড়িভাড়া নিয়েছিল।
সুনীতির বউ-ভাতে এসে সেই বাড়িতে গেছে বিনুরা। সুধা আর হিরণের সঙ্গে তার সেটাই শেষ দেখা।
যুদ্ধের পর একটা বছর কাটতে না কাটতেই সারা ভারতবর্ষ উথলপাথল হয়ে গেল। রাজদিয়ায় খবর পৌঁছেছিল, ছেচল্লিশের ষোলই আগস্ট জিন্নার ডাইরেক্ট অ্যাকশনের ডাকে সারা কলকাতা। বধ্যভূমি হয়ে উঠেছে। চারদিকে শুধু আগুন, নির্বিচার হত্যা আর ধর্ষণ। নরকের লক্ষ দরজা হাট করে খুলে দেওয়া হয়েছে। পৃথিবীতে আলো নেই, বাতাস নেই। সারা কলকাতা সেদিন হননপুরী।
সেই সময় পার্ক সার্কাসের বাড়িতে ভয়ে আতঙ্কে বুকের ভেতরটা হিম হয়ে যাচ্ছিল সুধাদের। উন্মাদ হত্যাকারীর দঙ্গল বাড়ি বাড়ি হানা দিয়ে শিকার খুঁজে বেড়াচ্ছে। মৃত্যু যখন প্রায় অবধারিত, হঠাৎ দৈবপ্রেরিতের মতো মিলিটারি পুলিশ এসে তাদের উদ্ধার করে ভবানীপুরের এক গুরদোয়ারার রিলিফ ক্যাম্পে পৌঁছে দেয়। সেখানে মাসখানেক কাটিয়ে, দাঙ্গার তান্ডব কমে এলে টালিগঞ্জের এই নিরাপদ এলাকায় বাড়ি ভাড়া করে চলে আসে ওরা। রাজদিয়ায় চিঠি লিখে হিরণ এ বাড়ির ঠিকানা জানিয়ে দিয়েছিল।
অনেকদিন বাদে সুধাকে দেখল বিনু। নিরবধি কালের মাপে মাঝখানের কটা বছর কী আর এমন! নেহাতই বিন্দুবৎ। তবু মহাযুদ্ধ, দাঙ্গা, দেশভাগ, লক্ষ লক্ষ শরণার্থীর সীমান্তের এপারে চলে আসা সব মিলিয়ে মনে হয় হাজার আলোকবর্ষ পার হয়ে গেছে।
সুধাকে দেখে কম খুশি হয় নি বিনু। দুই বোনের মধ্যে ছোটদিই তার বেশি প্রিয়। তারা পিঠোপিঠি, বয়সের তফাতও কম। সুধার বিয়ের আগে পর্যন্ত পরস্পর ছায়ার মতো লেপটে থেকেছে। সারাক্ষণ হিহি হাসি, নইলে মারদাঙ্গা। অতি তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে অবিরাম খুনসুটি। এই উদ্দাম ভাব। পরক্ষণে তুলকালাম ঝগড়া। মহাসংগ্রামের পর মহাশান্তি। কেউ কাউকে এক লহমা ছেড়ে থাকতে পারত না। একজন দূরে কোথাও গেলে আরেকজন গন্ধ শুকে শুকে ঠিক হাজির হয়ে যেত।
এত বছর পর সুধা তার পাশে বসে আছে। বুকের ভেতর আবেগের বলক ওঠার কথা। কিন্তু সেই চিন্তাটা অবিরল দংশন করে চলেছে মস্তিষ্কে–ঝিনুক।
সুধার প্রথম দিকের উচ্ছ্বাস থিতিয়ে এসেছিল। ভারী গলায় বলল, তোকে ফের দেখতে পাব, ভাবতে পারি নি। কী দুশ্চিন্তায় যে দিন কাটছিল! হঠাৎ উঠে দাঁড়াল সে, তুই একটু বোস, আমি আসছি– বলেই ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। পরক্ষণেই ফিরে আসে, সঙ্গে হিরণ।
হিরণের গায়ে চাদর জড়ানো। চোখমুখ টস টস করছে। মনে হয় অসুস্থ। সুধার মতো অপার বিস্ময়ে বিনুকে দেখতে দেখতে তার কাছে বসে পড়ে। ব্যগ্র সুরে জিজ্ঞেস করে, রাজদিয়া থেকে। কবে এলে বিনু?
