আনন্দরা রাস্তায় নেমে এসেছিল। বিনুর হাতে জামাকাপড়ের ব্যাগ ছিল। আনন্দকে সেটা দিয়ে সে বলল, আপনি বাড়ি চলে যান। আমি হিরণদা আর ছোটদির সঙ্গে দেখা করে আসি। কিভাবে ওদের বাড়ি যেতে হবে বলে দিন।
আনন্দ অস্বস্তি বোধ করল। সুধাদের কাছে বিনুর যাওয়ার কারণ তার অজানা নয়। তাদের বাড়ির যা পরিবেশ সেখানে আর এক লহমাও থাকা বিনুদের, বিশেষ করে ঝিনুকের পক্ষে আদৌ সম্মানজনক নয়। কী নিদারুণ কষ্টভোগ করে ওরা পাকিস্তান থেকে একটু আশ্রয়ের খোঁজে কাল মধ্যরাতে তাদের বাড়ি ছুটে এসেছিল, কিন্তু কিছুই করা গেল না। নিজের অক্ষমতা আনন্দকে ভীষণ ক্লেশ দিচ্ছে। ভেতরে ভেতরে পীড়নটা চলছে কাল রাত থেকে। বিব্রত মুখে সে বলল, তুমি তো কলকাতার কিছুই চেনো না। একা কি যেতে পারবে? বলেই থমকে গেল। বিনু তাকে পৌঁছে দিতে বললে, সুধাদের বাড়ি গিয়ে চূড়ান্ত অপ্রস্তুত হতে হবে। আনন্দ জানে, সুধারা কোনও প্রশ্ন করবে না, জানতে চাইবে না কেন ঝিনুককে ঘাড় থেকে নামিয়ে তাদের কাছে গছাতে এসেছে। কিন্তু ওদের জানতে না চাওয়ার মধ্যে অনেক নীরব প্রশ্ন মাথা উঁচিয়ে থাকবে। সুধাদের চোখের দিকে তাকানো যাবে। লজ্জার একশেষ। মরমে একেবারে মরে যেতে হবে।
বিনু বলল, ঠিকানা যখন জানি, ঠিক চলে যেতে পারব। কাল রাত্তিরেও কারোর সাহায্য ছাড়াই তো ঝিনুককে নিয়ে আপনাদের বাড়ি এসেছিলাম।
যাক, ছেলেটা তাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। সঙ্গে যাবার জন্য জোর করে নি। অস্বাচ্ছন্দ্য অনেকটাই কেটে গেল আনন্দর। ধীরে সুস্থে বিশদভাবে টালিগঞ্জ যাবার রুটটা জলের মতো বিনুকে বুঝিয়ে দিল সে। হাতিবাগান থেকে ট্রামে এসপ্ল্যানেডের কার্জন পার্ক। সেখান থেকে ফের ট্রাম ধরে টালিগঞ্জ রেল ব্রিজের পর সেকেন্ড স্টপেজ। কন্ডাক্টরকে আগে বলে রাখলে ঠিকমতো নামিয়ে দেবে। তারপর রাস্তা পেরিয়ে বাঁ দিকে খানিকটা ঢুকলেই জাফর শা রোডে সুধাদের বাড়ি।
আনন্দ বলতে লাগল, যদি মনে হয় রাস্তা গুলিয়ে যাচ্ছে, লোকজনকে জিজ্ঞেস করে নিও।
বিনু আস্তে মাথা হেলিয়ে দেয়, আচ্ছা–
এসপ্ল্যানেড রুটের একটা ট্রামের ফার্স্ট ক্লাসে বিনুকে তুলে দিল আনন্দ। অফিস টাইমের ঠাসাঠাসি ভিড় এখন নেই। তবু ট্রামে প্রচুর প্যাসেঞ্জার। তার মধ্যে এক কোণে দাঁড়াবার একটু জায়গা পেয়ে গেল বিনু। চার পাঁচটা স্টপেজ পেরুবার পর জানালার পাশে একটা সিটও।
বাইরে রাস্তার দু’ধারে লাইন দিয়ে উঁচু উঁচু বাড়ি, মানুষজন, সিনেমা হল, পার্ক, ধাবমান গাড়ি ঘোড়া।
সেই কোন ছেলেবেলায় এখান থেকে রাজদিয়ায় চলে গিয়েছিল বিনু। কলকাতা ক্রমশ ঝাঁপসা হতে হতে তার কাছে হয়ে উঠেছিল ধূসর স্মৃতির শহর। এত কাল বাদে ফিরে এসে সতত চঞ্চল এই মহানগরের বিশালতা আর চোখ ধাঁধানো জলুসে তার রোমাঞ্চিত হবার কথা। কিন্তু চারপাশের দৃশ্যাবলী, হইচই এবং যানবাহনের পাঁচমিশালি চড়া আওয়াজ তার মাথায় কোনও ছাপই ফেলছে না। সব কিছু ছাপিয়ে বার বার তারপাশা গোয়ালন্দ আর শিয়ালদা স্টেশনের চিত্র চোখের সামনে ফুটে উঠছে। সর্বস্ব খুইয়ে আতঙ্কতাড়িত মানুষ উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটে আসছে। হাজারে হাজারে। সীমাসংখ্যাহীন। এ শহরে তাদের কেউ নেই। কিন্তু বিনুর অনেকেই আছে। আছে তার ঘনিষ্ঠ পরিজনেরা। তবু লক্ষ লক্ষ উৎখাত শরণার্থীর মতো তাকেও শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়তে হচ্ছে। একই উদ্দেশ্যে। প্রয়োজন সামান্য একটু আশ্রয়, যেখানে ঝিনুক আর সে সহজভাবে নিশ্বাস ফেলতে পারবে।
কার্জন পার্কে এসে টালিগঞ্জের ট্রাম ধরল বিনু। এদিকের ট্রামে ভিড় নেই। অল্প ক’টি যাত্রী কামরার এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছে।
একসময় ট্রাম ছাড়ল। বাঁয়ে চকচকে, মসৃণ চৌরঙ্গি। তার ওধারে পর পর মেট্রো সিনেমা, হোয়াইটওয়ে লেডলোর বিশাল বিল্ডিং, নিউ মার্কেট, মিউজিয়াম ইত্যাদি পেরিয়ে এগিয়ে চলল কিনুরা। পার্ক স্ট্রিট পর্যন্ত ঢিলেঢালা মেজাজে চলার পর হঠাৎ গতি বেড়ে গেল ট্রামটার। রাস্তার ওপাশে। এখনও বাড়ির পর বাড়ি। আর্মি অ্যান্ড নেভি বিল্ডিং, দ্বারভাঙ্গা মহারাজের ম্যানসন যার উঁচু মিনারে বিশাল ঘড়ি আটকানো, বিশপস হাউস, ইত্যাদি। আরেক পাশে যতদূর চোখ যায়, নিবিড় ঘাসে ঢাকা গড়ের মাঠ। দুপুরের রোদে সারা ময়দান জুড়ে তীব্র সবুজ আলোর ঝলক। অনেক দূরে মাঠ চিরে যে রাস্তাটা উত্তর-দক্ষিণে কোনাকুনি চলে গেছে সেটার ওপর দিয়ে অগুনতি প্রাইভেট কারের ছোটাছুটি। ট্রামের জানালা দিয়ে মনে হয়, ছোট ছোট খেলনা-গাড়ি। আরও দূরে রেসকোর্সের গ্যালারিগুলো দিগন্তের তলায় সাদা রেখা হয়ে আছে। মাঠের দক্ষিণ দিকে রাজকীয় মহিমায় ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, সেটার চুড়োয় পরী নেচে চলেছে। ক্লান্তিহীন। এই দুপুরবেলায় আগের রাতের কুয়াশার লেশটুকুও নেই, নেই ছিটেফোঁটা লঘু মেঘও। মাথার ওপর অফুরান নীলাকাশ। হালকা মেজাজে ফুরফুরে হাওয়া বয়ে যাচ্ছ।
চৌরঙ্গির বড় বড় ম্যানসন, গড়ের মাঠ, কোনও কিছুই অচেনা নয়। স্মৃতির ঝাঁপি খুলে সব বেরিয়ে এসে চোখের সামনে সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু কণামাত্র আগ্রহ বোধ করছে না বিনু। ট্রাম টালিগঞ্জের দিকে যত এগুচ্ছে, ঝিনুকের চিন্তাটা চারদিক থেকে আরও বেশি করে তাকে সাপটে ধরছে।
