রুমা ঝুমা দুজনেই মাথা নাড়ল। বোঝা যাচ্ছে, এ বাড়ির সবাইকেই চেনেন হেমনাথ। বললেন, তোমরা দু’জন। সুধা সুনীতিকে দেখিয়ে বললেন, আর ওরা দু’জন। এত বেগম নিয়ে কী যে করি! ভাবছি বাদশাদের মতো একটা হারেম খুলব।
সবাই মুখ টিপে হাসতে লাগল।
আবার কী বলতে যাচ্ছিলেন হেমনাথ, হঠাৎ তার নজর গিয়ে পড়ল সেই যুবকটির ওপর। বললেন, একে তো চিনতে পারলাম না রামকেশব।
রামকেশব বললেন, ও আনন্দ-শিশিরের শালা। কলকাতাতেই থাকে। গেল বছর ল’ পাস করেছে। ওর বাবার সঙ্গে কোর্টে যাচ্ছে। এখন ছুটি। তাই বৌমার সঙ্গে পুজোয় বেড়াতে এসেছে।
হেমনাথ বললেন, খুব ভাল।
এই সময় আনন্দ উঠে এসে হেমনাথকে প্রণাম করল। রামকেশব আনন্দর উদ্দেশে বললেন, ইনি শ্ৰীহেমনাথ মিত্র, গোটা রাজদিয়ার অভিভাবক বলতে পার।
আনন্দ চুপ করে থাকল।
রামকেশব এবার হেমনাথকে বললেন, জানো হেমদাদা, আমাদের আনন্দ বাবাজির খুব শিকারের শখ। অনেক বাঘ টাঘ মেরেছে।
তাই নাকি?
বিনু এর আগে শিকারি দেখে নি। চোখ বড় করে আনন্দর দিকে তাকিয়ে রইল। লক্ষ করল, সুনীতিও অবাক বিস্ময়ে আনন্দকে দেখছে। সুধা ওদিকটায় অবনীমোহনের আড়ালে বসে ছিল। সে আনন্দকে দেখছে কিনা, বুঝতে পারা গেল না।
হেমনাথ অবনীমোহনদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। আলাপ টালাপ হলে বললেন, অনেক বেলা হল, এবার আমরা উঠি।
রামকেশব বললেন, তাই কখনও হয়! জামাই নিয়ে প্রথম দিন এলে, একটু মিষ্টিমুখ না করিয়ে ছাড়তে পারি? শিশিরের মা তা হলে আমার গর্দান নিয়ে নেবে।
তবে আর কী করা, বসেই যাই।
একটু নীরবতা। তারপর স্মৃতিরেখার চোখে চোখ রেখে হেমনাথ বললেন, আমরা এসে তোমাদের জমাটি আসরটি নষ্ট করে দিলাম।
স্মৃতিরেখা বললেন, ও মা, সে কি কথা!
হেমনাথ বললেন, আনন্দ হাত-পা নেড়ে কী যেন বলছিল, তোমরা খুব মন দিয়ে শুনছিলে। আমার আসতেই বেচারি থেমে গেল। কী বলছিল আনন্দ?
সেই তরুণীটি, যার নাম রুমা, বলল, মামা সেবার সুন্দরবনে বাঘ মারতে গিয়েছিল। সেই গল্প করছিল।
হেমনাথ উৎসাহিত হলেন। আনন্দকে বললেন, আপত্তি না থাকে, আরেক বার বল না। আমরা একটু শুনি।
লাজুক হেসে আনন্দ বলল, আপনাদের কি ভাল লাগবে?
লাগবে, নিশ্চয়ই লাগবে। আমাদের খুব বেরসিক ভাবছ নাকি?
বাঘ শিকারের রোমাঞ্চকর গল্প আরম্ভ হল।
বিনু চোখ বড় করে তাকিয়ে রইল। মাঝে মাঝে লক্ষ করতে লাগল, সুনীতিও অপার বিস্ময় নিয়ে আনন্দর দিকে তাকিয়ে আছে।
গল্প শুনতে শুনতে হঠাৎ বিনুর মনে হল, কে যেন ফিসফিস করে ডাকছে, এই–এই
চোখ ফিরিয়ে বিনু দেখতে পেল, সেই ছোট মেয়েটা–যার নাম ঝুমা। গায়ের রংখানি শ্যামলা। নাক-মুখ-চোখ সেই ক্ষতিটুকু যোল আনার জায়গায় আঠার আনা পূরণ করে দিয়েছে। এমন নিখুঁত ধারাল গড়ন কদাচিৎ দেখা যায়। গায়ের হলুদ রঙের ফ্রক, মাথার গোলাপি রিবন কিংবা চোখে কাজলের টান ভারি চমৎকার মানিয়েছে।
বিনুর ধ্যানজ্ঞান এখন বাঘ শিকারের দিকে। অন্যমনস্কের মতো বলল, কী বলছ?
তুমি লুডো খেলতে পার?
পারি।
ক্যারম?
তাচ্ছিল্যের সুরে বিনু বলল, নিশ্চয়ই।
ঝুমা বলল, এয়ার গান চালিয়ে পাখি মারতে পার?
এবার বিনুকে একটু থতিয়ে যেতে হল।
ঝুমা বলল, তুমি পার না, আমি কিন্তু পারি।
যার মামা বাঘ মারতে পারে সে পাখি মারবে তাতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। থতিয়ে যাওয়া। ভাবটা মুহূর্তে কাটিয়ে নিয়ে বিনু বলল, চেষ্টা করলে আমিও পারব।
তা তো জানিই। এমনভাবে ঝুমা বলল, যেন বিনুর কোনও কথা জানতে তার বাকি নেই। এইমাত্র যে তার সঙ্গে পরিচয় হয়েছে, সে কথা কে বলবে।
বিনু এবার কিছু বলল না।
ঝুমা ফের বলল, আমার একটা ক্যামেরা আছে, জানো। খুব ভাল ছবি ওঠে।
বিনুর কেন জানি এবার মনে হল, ঝুমাকে আর অবহেলা করা যায় না। আধখানা মন বাঘ শিকারের দিকে রেখে বাকি আধখানা মন দিয়ে ঝুমার কথা শুনছিল সে। এবার পুরোপুরি মনোযোগটা এদিকে সঁপে দিতে হল।
ঝুমা বলল, আমার সঙ্গে যাবে?
কোথায়?
ও ঘরে। পাশের ঘরের দিকে আঙুল বাড়িয়ে দিল ঝুমা।
সেখানে কী?
লুডো ক্যারম এয়ার গান ক্যামেরা–সব আছে।
বাঘ শিকারের কাহিনী যত চমকপ্রদই হোক, বিনুকে ধরে রাখা আর সম্ভব হল না। ঝুমার সঙ্গে সে পাশের ঘরেই চলে যেত, কিন্তু বাধা পড়ল। সেই বর্ষীয়সী সধবা মহিলাটি খাবারের থালা সাজিয়ে ঘরে ঢুকলেন। অগত্যা রসগোল্লা সন্দেশেই মনোনিবেশ করতে হল।
খাওয়া হলে হেমনাথরা উঠে পড়লেন।
ঝুমা ফিসফিসিয়ে বলল, ক্যারম ট্যারম খেলা হল না। আমার এয়ার গান আর ক্যামেরাটা তোমায় দেখাতে পারলাম না। আরেক দিন আসবে কিন্তু–
ঝুমার দুর্লভ সম্পত্তিগুলো দেখা হল না বলে মন খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল। বিরস গলায় বিনু বলল, আচ্ছা।
রামকেশবরা হেমনাথকে বললেন, আবার ওদের নিয়ে এস হেমদাদা, ভাগনীকেও এনো৷
আচ্ছা। হেমনাথ বললেন, তোরাও যাস, সবাইকে নিয়ে যাবি।
.
আবার রাস্তা।
হেমনাথ এবং অবনীমোহন আগে আগে হাঁটছিলেন। সুধা সুনীতি আর বিনু একটু পেছনে। চলতে চলতে সুনীতি বললেন, আনন্দবাবু চমৎকার গল্প বলতে পারেন।
চোখ ঠোঁট কুঁচকে কেমন করে যেন হাসল সুধা, হুঁ।
আমার মনে হচ্ছিল, সত্যি সত্যি সুন্দরবনে গিয়ে বাঘ দেখছি।
তাই নাকি!
কেন, তোর মনে হয় নি?
আমি তো গল্প শুনছিলাম না, তোর দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
