সুধাদের সঙ্গে দেখা করার কথাটা এখনই জানাতে চায় না বিনু। হিরণদাদের মতিগতি বুঝে পরে বলবে। মোটামুটি কতটা সময় লাগতে পারে, আন্দাজ করে নিয়ে বলল, মনে হচ্ছে, দেড়টা দুটো বেজে যাবে।
রায়টের সময় ঢাকা থেকে ফেরার পর অনন্ত নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে ঝিনুক। এক লহমাও সে বিনুকে চোখের আড়াল করতে চায় না। বিশেষ করে রাজদিয়ায় রাজেকের নৌকোয় ওঠার পর থেকে। বিশ্বব্রহ্মান্ড জোড়া বিপুল এক আতঙ্ক সর্বক্ষণ তাকে যেন হা হা করে তাড়া করে চলেছে। বিনুই তার একমাত্র অবলম্বন। এখনও যে বেঁচে আছে, শ্বাসবায়ু সচল রয়েছে, সবই নুির জন্য। বিনু পাশে না থাকলে কবেই সে মরে ঝরে শেষ হয়ে যেত।
ঝিনুকের খাওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, এত দেরি হবে কেন?
কাপড়চোপড় কেনার কথা বলল বিনু।
ক’টা শাড়ি ধুতি কিনতে চার পাঁচ ঘন্টা লাগবে? সন্ধিগ্ধ সুরে জানতে চায় ঝিনুক।
বিনু বলল, তারপর এক জায়গায় যেতে হবে।
সুনীতি চায়ের সরঞ্জাম নিয়ে ঘরে ঢুকছিল। ঝিনুকদের কথা সে শুনতে পেয়েছে। বিনু কোথায় যেতে পারে, আঁচ করে নিয়ে কী বলতে যাচ্ছিল, চোখের ইশারায় তাকে থামিয়ে দিল বিনু।
ঝিনুক বিনুর দিক থেকে চোখ সরায় নি। বলল, কোথায় যাবে তুমি?
বিনু বলল, বেশি দূরে না। ফিরে এসে বলব। তোমার কিছু দরকার হলে বড়দিকে বলল।
বিনুর ভয় ছিল, সে কোথায় যাচ্ছে জানার জন্য জেদ ধরবে ঝিনুক, কিন্তু তেমন কিছুই করল না। বলল, আমার কিছু দরকার নেই। এই ঘর থেকে আমি বেরুবও না। শুধু
শুধু কী?
কাল রাত্তিরে যে মেয়েমানুষটা মেঝেতে শুয়েছিল সে যেন এ ঘরে না আসে।
দুলালীর কথা বলছে ঝিনুক। উদ্বেগের সুরে বিনু জিজ্ঞেস করল, কী করেছে সে?
অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে তীব্র গলায় ঝিনুক বলল, খুব পাজি। শয়তান– রাগে তার মুখ গন গন করতে থাকে।
বিনু চমকে ওঠে। এভাবে বলে, সে না হয় বুঝলাম। কিন্তু কী করেছে বলবে তো?
কিছুতেই মুখ খুলতে চায় না ঝিনুক। অনেক করে বলার পর সে জানায়, রায়টের সময় ঢাকায় যে সশস্ত্র হননকারীর দলটা তাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল, তারা কোথায় কতদিন তাকে আটকে রেখেছে, ওদের সঙ্গে ঝিনুকের সময় কিভাবে কেটেছে, সব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করছিল দুলালী। মেয়েমানুষটার মন ভীষণ নোংরা, জঘন্য রুচি।
ধর্ষণের খবরটা এ বাড়ির নিচের মহলেও কিভাবে যেন ছড়িয়ে পড়েছে। অন্তত দুলালী তা জেনে ফেলেছে। ঝিনুক স্পষ্ট করে বলল না, আভাসে বুঝিয়ে দিল, তার সম্ভ্রমহানির অর্থাৎ ধর্ষণের অনুপুঙ্খ বিবরণ শুনতে চাইছিল মেয়েমানুষটা। কোনও ঘটনা বাদ না দিয়ে, বিশদভাবে।
শুনতে শুনতে অসহ্য ক্রোধে কাঁপছিল সুনীতি। মুখ রক্তবর্ণ। দাঁতে দাঁত চেপে বলল, বজ্জাত মেয়েছেলে! এত বড় সাহস! মাকে বলে আজই এ বাড়ি থেকে ওকে তাড়াব।
সুনীতি দুলালীর ধড়মুভু আলাদা করার জন্য ছুটে বেরিয়ে যাচ্ছিল। তাকে থামিয়ে দিল বিনু। আজই তারা এখান থেকে চলে যাবে। কাজের মেয়ের সঙ্গে ঝিনুকের ব্যাপারটা নিয়ে নোংরা ঘাঁটাঘাঁটির পরিণতি ভাল হবে না। দুলালীকে তাড়িয়ে দিলে এখনও যা চাপাচুপি আছে তা আর থাকবে না। ঢাকে কাঠি দিয়ে মেয়েমানুষটা চারদিকে চাউর করে বেড়াবে।
বিনু বলল, মাথা গরম করিস না বড়দি। আমরা তো এখানে থাকছি না। অশান্তি করে লাভ নেই।
সুনীতি কী বুঝল, সে-ই জানে। চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
একসময় খাওয়া চুকিয়ে সুনীতির হাতে ঝিনুককে সঁপে দিয়ে আনন্দর সঙ্গে বেরিয়ে পড়ল বিনু।
৩.২১-২৫ সুনীতির শ্বশুরবাড়ি
৩.২১
সুনীতির শ্বশুরবাড়ি থেকে হাতিবাগান মার্কেট হাঁটা পথের দূরত্বে। মিনিট সাত আটেকের মধ্যে বিনুরা সেখানে পৌঁছে গেল।
মার্কেটটা বিশাল, অনেকখানি জায়গা জুড়ে। সামনে চওড়া ট্রাম রাস্তা। আনন্দ জানিয়ে দিল, রাস্তাটার নাম কর্নওয়ালিস স্ট্রিট। ট্রাম লাইন উত্তর দিকে সোজা চলে গেছে গ্যালিফ স্ট্রিটে। শ্যামবাজারে ওটার গা থেকে আরেকটা লাইন বেরিয়ে বেলগাছিয়ায়। দক্ষিণ দিকে লাইনটা গিয়ে থেমেছে ধর্মতলায়। বৌবাজার আর গ্রে স্ট্রিটের মুখে আরও দু’টো লাইন এর সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। খানিকটা ঘুরপথে ওই দুই রুট দিয়ে ডালহৌসি যাওয়া যায়।
খুব ছেলেবেলায় বাবার সঙ্গে দু’একবার উত্তর কলকাতার এই অঞ্চলে এসেছিল বিনু। তার খুব ঝাঁপসা স্মৃতি এখনও থেকে গেছে। পারা-ওঠা, ঘষা আয়নায় ছায়া পড়লে যেমন দেখায় অনেকটা সেইরকম।
আনন্দ ট্রাম লাইনের যে জটিল ভৌগোলিক বর্ণনা দিল তার সামান্যই মাথায় ঢুকল বিনুর। সে ভাবল, এখন কলকাতাই তার স্থায়ী ঠিকানা। ক্রমশ এই শহরের রাস্তাঘাট, ট্রামরুট, বাসরুট সম্পর্কে সড়গড় হয়ে উঠবে।
মার্কেটের নিচের তলায় রাস্তার দিকে সারিবদ্ধ দোকান। জামাকাপড়ের, বাসনকোসনের, রেডিমেড পোশাকের, গয়নার, মিষ্টির। বেশ ক’টা দোকান ঘুরে বিনুর জন্য চার প্রস্থ ধুতি শার্ট পাজামা আন্ডারওয়ার গেঞ্জি, ঝিনুকের জন্য খান পাঁচেক শাড়ি ব্লাউজ সায়া কিনল আনন্দ। অনেকগুলো ব্রাউন। পেপারের প্যাকেট হয়েছে। দুটো বড় চটের ব্যাগ কিনে প্যাকেটগুলো তার ভেতর পুরে নিল ওরা।
কেনাকাটা সারতে ঘন্টাখানেক লেগে গেল। রাস্তায় প্রচন্ড ভিড়। ট্রাম বাস রিকশা মোটর ঘোড়ার গাড়ি আর মানুষের দঙ্গল। যেদিকেই তাকানো যাক, তুমুল ব্যস্ততা। কেউ কোথাও দাঁড়িয়ে নেই। সবাই ছুটছে, ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটেই চলেছে।
