ঝিনুক থামে না। চিৎকার করতে করতে গলা চিরে যায়। সেই সঙ্গে উতরোল কান্না। মুখ থেকে হাত সরিয়ে হঠাৎ সে ঝাঁপিয়ে পড়ল বিনুর ওপর। বিনুর গলাটা খামচে ধরে বুকে মুখ ঘষতে ঘষতে বলে যায়, আমি আর এক মুহূর্ত এখানে থাকব না।
রাজদিয়া থেকে তারপাশা, তারপাশা থেকে গোয়ালন্দ হয়ে কলকাতা। সারা পথে পদে পদে ছিল বিপদ, আতঙ্ক আর মৃত্যুভয়। ঝিনুককে বুকের ভেতর সাপটে নিয়ে সে সব পেরিয়ে আসার পর আজ আরেক মহা সংকট সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। বিপর্যস্ত, দিশেহারা বিনু বলে, এমন করে না। শান্ত হও ঝিনুক, শান্ত হও–
ঝিনুক কিছুই শুনতে পাচ্ছে না। একেবারে বধির। আমি এখানে থাকব না, থাকব না, থাকব না– গলার স্বর আরও উঁচুতে তুলে হিস্টিরিয়ার ঘোরে সে বলে যায়। একটানা, বিরতিহীন।
বিনু টের পায়, তার বুক ঝিনুকের চোখের জলে ভেসে যাচ্ছে, চামড়ায় নখ বসে যাওয়ায় গলার কাছটা জ্বালা জ্বালা করছে। আস্তে আস্তে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে সে বলে, এখানে তোমাকে থাকতে হবে না।
এবার কথাগুলো ঝিনুকের কানে প্রবেশ করে। কান্নার বেগ কমে আসে। জলে ভরা দুই চোখ বিনুর দিকে মেলে ধরে বলে, সত্যি বলছ?
হ্যাঁ হ্যাঁ, সত্যি।
এখানে থাকলে আমি মরে যাব।
হেমনলিনীর আচরণে ঝিনুক কতটা আঘাত পেয়েছে, কী নিদারুণ কষ্ট, অবিরাম তীক্ষ্ণ শূল বিধিয়ে বিধিয়ে তার বুকের ভেতরটা কতখানি রক্তাক্ত করে দিয়েছে, কালই টের পেয়েছিল বিনু। এ বাড়ির শুচিতা বজায় রাখতে যেভাবে তাকে এক কোণে ফেলে রাখা হয়েছে তাতে মেয়েটা বাঁচবে না, দম আটকে শেষ হয়ে যাবে। বা এমন কিছু করে বসবে যা খুবই মর্মান্তিক। আত্মহত্যার চিন্তাটা পলকের জন্য বিনুর মাথায় ঝিলিক দিয়ে যায়।
ভারী গলায় বিনু বলে, যাও, চানঘরে গিয়ে পরিষ্কার হয়ে এস। চোখের যা অবস্থা, ভাল করে। জল ছিটিয়ে ছিটিয়ে থোবে।
ঝিনুক বলল, আগে বল, কবে আমাকে এ বাড়ি থেকে নিয়ে যাচ্ছ?
আজই। এখন বাথরুমে যাও।
ঝিনুকের রাতজাগা শীর্ণ মলিন মুখ সামান্য উজ্জ্বল হল। তারপর বাধ্য মেয়ের মতো বিছানা থেকে নেমে স্নানঘরে ঢুকে যায়।
দরজার কাছে এখনও ঠায় দাঁড়িয়ে আছে সুনীতি। পাংশু মুখ।
খাটের কোণে বসতে বসতে বিনু সুনীতিকে বলে, বড়দি, তুই ঝিনুকের আর আমার খাবার এখানে দিয়ে যা। আনন্দদাকে বলবি খাওয়া চুকিয়ে যেন তৈরি হয়ে নেয়। ন’টা বাজতে চলল। জামাকাপড়ের
দোকানগুলো নিশ্চয়ই কিছুক্ষণের মধ্যে খুলে যাবে।
মাথাটা একটুখানি হেলিয়ে সুনীতি বলে, হ্যাঁ—
বিনু বলল, আমি যতক্ষণ না ফিরে আসি, তুই ঝিনুকের দিকে নজর রাখিস।
আরেক বার মাথা হেলায় সুনীতি। তারপর চলে যায়।
অনেকক্ষণ বাদে, প্রায় আধ ঘন্টা হবে, চানঘর থেকে বেরিয়ে আসে ঝিনুক। দুপুরের আগে কোনও দিনই স্নান করে না সে, কিন্তু আজ এর মধ্যেই সেটা সেরে ফেলেছে। শাড়ি পালটে চুলটুল আঁচড়েছে। চোখ আর আগের মতো টকটকে লাল নেই। স্বাভাবিক রং কিছুটা ফিরে এসেছে। জলের একটা জাদুস্পর্শ আছে। স্নান করার ফলে রাতজাগার ক্লান্তি, মলিনতা, চোখের তলার কালির ছোপ এখন অনেকটাই উধাও। খ্যাপা খ্যাপা, উদভ্রান্ত ভাবটা প্রায় কেটে এসেছে। ঝিনুককে বেশ স্নিগ্ধ আর তাজা লাগছে। এ বাড়িতে থাকতে হবে না, তাই কি এই পরিবর্তন?
সুনীতি এর ভেতর একবার এসে খাটের পাশের দুটো সাইড টেবলে প্রচুর লুচি, বেগুনভাজা, আলুর তরকারি আর মিষ্টি খুঞ্চিপোষে ঢাকা দিয়ে রেখে গিয়েছিল। কাঁচের প্লেট চাপা দিয়ে দু’গেলাস জলও। বলে গেছে, পরে চা নিয়ে আসবে।
ঝিনুক খাটের আরেক কোনায় বসল। জিজ্ঞেস করল, তখন থেকে বসে আছ?
বিনু বলল, হ্যাঁ, তোমার জন্যে। ঢের বেলা হয়েছে। খেয়ে নাও– ঢাকনা তুলে সাইড টেবল থেকে লুচির প্লেট তুলে ঝিনুকের হাতে দিয়ে নিজের জন্য অন্য প্লেটটা তুলে নিল।
ঝিনুক কপাল কুঁচকে বলল, এখানকার কিছু ছুঁতে ইচ্ছে করে না। আমি খাব না।
বিনু বলল, খুব বেশি হলে বিকেল পর্যন্ত আমরা থাকছি। তারপর তো চলেই যাব। না খেলে আরও দুর্বল হয়ে পড়বে। খাও- হিরণদের বাড়িতে অভ্যর্থনা কেমন হবে, জানা নেই। হয়তো ভালই হবে। নইলে ঝিনুককে নিয়ে অন্ধকারে ঝাঁপ দিতে হবে। পথ ছাড়া তখন গতি নেই। অবশ্য কাল সীমান্ত পেরিয়ে আসার সময় বর্ডার স্লিপ দিয়েছিল। তারা যে বোনাফাইড রিফিউজি’ অর্থাৎ খাঁটি শরণার্থী, তার নিশানা। সেটা সঙ্গেই আছে। হিরণরা ফিরিয়ে দিলে শেষ পর্যন্ত শিয়ালদা স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম তো আছেই। ওই পরিচয়পত্রের জোরে যতদিন অবনীমোহন ফিরে না আসছেন, হাজার হাজার ছিন্নমূল মানুষের পাশে কয়েক ফুট জায়গা নিশ্চয়ই তারা পেয়ে যাবে।
পেটে খিদে ছিল। ঝিনুক আর আপত্তি করল না। লুচির কোনা ছিঁড়ে মুখে পুরে চিবুতে লাগল। বিনুও খাচ্ছে। খেতে খেতে বলল, আমি আনন্দদার সঙ্গে একটু বেরুব।
ঝিনুকের কপালে ভাঁজ পড়ে, কখন ফিরবে?
সুধারা থাকে টালিগঞ্জে। আগে কখনও ওখানে যায় নি বিনু। সুধার বিয়ের পর যখন একবার কলকাতায় এসেছিল তখন ওরা অন্য একটা বাড়িতে থাকত।
সুধাদের নতুন বাড়ির ঠিকানা বিনু জানে। জামাকাপড় কেনাকাটার পর টালিগঞ্জে গিয়ে সুধাদের বাড়িটা খুঁজে বার করতে হবে। তারপর ওদের সঙ্গে কথাবার্তা সারতে কতক্ষণ লাগবে, কে জানে।
