একটু খতিয়ে গেল সুনীতি। তারপর বলল, সবাই কি একরকম হয়? তা ছাড়া, এঁরা এখন কলকাতায় নেই। কদিন আগে সুধা আর হিরণ এসেছিল। তারা বলল, হিরণের এক দূর সম্পর্কের কাকা পাটনা থেকে এসে দুই বুড়োবুড়িকে নিয়ে গেছেন। মাসখানেক ওঁরা তাঁর কাছে থাকবেন।
সবাই এক ধাঁচের হয় না বলেও খানিক সংশয় থেকেই গেছে সুনীতির। বেশির ভাগ বয়স্ক মানুষের উদারতা কম। সেকেলে হাজারটা পচা-গলা সংস্কারের ঘেরাটোপে তারা নিজেদের গুটিয়ে রাখে। সে সব ভেঙেচুরে বেরিয়ে আসতে পারে না, এমনই অদৃশ্য শেকলে তারা আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা। হিরণের ঠাকুরদা আর জেঠিমা নেই, সুনীতির কাছে সেটা বড় রকমের স্বস্তি। ওঁরা থাকলে হয়তো এমন কান্ড বাধিয়ে বসতেন যাতে নতুন করে ঝিনুকের লাঞ্ছনার সীমা-পরিসীমা থাকত না। সুনীতির বিশ্বাস, অন্তত একটা মাস মেয়েটাকে তার এই শ্বশুরবাড়ির মতো কুঁকড়ে এক কোণে পড়ে থাকতে হবে না। অনেক সহজভাবে সে শ্বাস নিতে পারবে।
সুনীতি এবার বলে, যে ক’দিন বুড়োবুড়ি পাটনা থেকে ফিরে না আসছে তোরা সুধাদের কাছে। গিয়ে থাক। তার ভেতর বাবা নিশ্চয়ই চলে আসবে।
মাত্রাছাড়া রাগে ব্রহ্মর জ্বলে যায় বিনুর। হঠাৎ তার মনে হয়, হেমনলিনী শুধু একাই নন, সুনীতি আর আনন্দও হয়তো চায়, ঘাড় থেকে তারা নেমে যাক, আর এক মুহূর্তও এখানে না থাক। ওপরে সহানুভূতির ভান, তলে তলে সুনীতিরা কৌশলে তাদের সুধা আর হিরণের কাছে পাঠাবার ফন্দি এঁটেছে।
আগে থেকে না জানিয়ে (যদিও বিনু রাজদিয়া থেকে চিঠি লিখেছিল) হুট করে চলে আসায় এখানে উটকো সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। বিনুদের বিদায় করতে পারলে এ বাড়ির সবাই ভাল করে নিশ্বাস ফেলতে পারবে। তখন পরিপূর্ণ মুক্তি।
রাগ হলে মানুষ স্বাভাবিক থাকে না। তার বোধবুদ্ধি লোপ পেয়ে যায়। তপ্ত মস্তিষ্ক একটু ঠাণ্ডা হলে পরিতাপে নিজের গালে চড় কষাতে ইচ্ছা হল বিনুর। কী আবোল তাবোল ভাবছে সে? নিমেষে পুরনো চিন্তা ফিরে এল মাথায়। কী করতে পারে সুনীতি আর আনন্দ? এ বাড়িতে হেমনলিনী যতদিন মাথার ওপর অধিষ্ঠান করছেন, কারোর কিছু করার নেই।
বিনু বলল, বুঝেছি। বাবা যতদিন না ফিরছে, এর বাড়ি ওর বাড়ি ঝিনুককে নিয়ে চোরের মতো থাকতে হবে।
ক্রোধ না থাকলেও ক্ষোভ এবং অভিমান যথেষ্টই থেকে গেছে। তার বলার ভঙ্গিতে যে শ্লেষ রয়েছে তা যথাস্থানেই বিধল। মুখটা সঙ্গে সঙ্গে চুন হয়ে গেল সুনীতির। ভাইয়ের একটা হাত আঁকড়ে ধরে সে বলে, আমাকে ভুল বুঝিস না। আমার কি ইচ্ছে তোদের তাড়িয়ে দিই? একটু থেমে হাঁফ-ধরা গলায় বলল, আমার ইচ্ছের কোনও দামই এখানে নেই।
বিনু চোখ তুলে সুনীতিকে দেখে। ম্লান মুখচ্ছবি। দিদির ওপর হঠাৎ বড় মায়া হয় তার। ধীরে ধীরে হাত ছাড়িয়ে নিতে নিতে নরম গলায় বলে, চল, নিচে যাই–
একতলায় আসতে চোখে পড়ল, কোণের দিকের ঘরটার খোলা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন হেমনলিনী। পাশে আনন্দ। ওরা ছাড়া বাড়ির অন্য কাউকে দেখা গেল না।
পায়ের আওয়াজে হেমনলিনী মুখ ফিরিয়ে তাকালেন। বললেন, তোমরা এসে গেছ? ওই দেখ ঝিনুক এখনও বিছানা থেকে নামে নি। এত করে বলছি, মুখ ধুচ্ছে না, বাসি কাপড়ে বসে আছে। কত বেলা হয়ে গেল
দরজার কাছে চলে এল বিনুরা। ঘরের ভেতর শুধু ঝিনুক আর দুলালী। মশারির চারপাশ ছত্রির ওপর তোলা। উলটো দিকে মুখ করে খাটের মাঝখানে বসে রয়েছে ঝিনুক। নিশ্চল। দুলালী ঝুঁকে নিচু গলায় তাকে কী বোঝাচ্ছে। ঝিনুক চুপ। দুলালীর কোনও কথার উত্তর দিচ্ছে না।
হেমনলিনী বললেন, বুঝিয়ে সুঝিয়ে তোমরা ওকে বাথরুমে পাঠাও। ওদিকে লুচি জুড়িয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে।
বিনু বলল, মাউইমা, আপনারা যান। আমি ওর সঙ্গে কথা বলি। ঘরে ঢুকে দুলালীকেও যেতে বলল।
সবাই চলে যায়, কিন্তু সুনীতি দরজার মুখে দাঁড়িয়ে থাকে।
খাটের পাশ দিয়ে ঘুরে ঝিনুকের সামনে গিয়ে দাঁড়ায় বিনু। ঝিনুকের তেলহীন রুখু চুল উড়ে উড়ে পড়ছে সারা মুখে। চোখ দুটো রক্তের ডেলা, চোখের তলায় পুরু কালির পোঁচ। গাল বসে গেছে। ঠেলে-ওঠা কন্ঠার হাড় বড় বেশি প্রকট। সর্বাঙ্গে রাত জাগার অবসাদ।
কোমল স্বরে বিনু বলে, কাল রাতে ঘুম হয় নি? সব বুঝেও প্রশ্নটা করল।
এক পলক বিনুকে দেখে চোখ সরিয়ে নেয় ঝিনুক।
বিনু ফের বলে, চেহারার কী হাল হয়েছে! একবার গিয়ে আয়নায় দেখ—
ঝিনুক বোবা হয়ে বসে থাকে।
বিনু বলে, রাতের পর রাত না ঘুমোলে শক্ত অসুখে পড়ে যাবে।
ঝিনুক জবাব দেয় না। একদৃষ্টে দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকে।
বিনু থামে নি, এভাবে নিজেকে শেষ করতে নেই। বাথরুমে যাও—
দরজার ওধার থেকে সুনীতি বলল, কাল দুলালীকে ঝিনুকের জন্যে পাট ভাঙা শাড়ি আর ব্লাউজ দিয়েছিলাম। ও চানঘরে রেখে দিয়েছে।
ঝিনুক সুনীতির দিকে ফিরেও তাকায় না। আচমকা দু’হাতে মুখ ঢেকে প্রবল বেগে মাথা ঝাঁকাতে থাকে। গলার শিরা ছিঁড়ে, চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলে, না না না, চানঘরে যাব না। কিছুতেই না। কেন। তুমি আমাকে এ বাড়িতে নিয়ে এসেছিলে? কেন-কেন-কেন?
রায়টের সময় ঢাকা থেকে উদ্ধার করে যেদিন ঝিনুককে আনা হল, তখন সে প্রায় বদ্ধ পাগল। স্নেহলতা আর শিবানী সারাক্ষণ ঘিরে থেকে অনেক যত্নে, দিবারাত্রি শুশ্রূষায় তাকে অনেকখানি সুস্থ করে তুলেছিলেন। মেয়েটা সেই সেদিনের মতো ফের উথলপিথল হয়ে যাচ্ছে। তেমনই অস্থির, তেমনই উন্মত্ত। বিনু ভয় পেয়ে গেল। ঝিনুকের মাথায় হাত রেখে, মিনতির সুরে বলতে লাগল, এমন করে না ঝিনুক। থামো–থামো—
