কাল রাতে একদিকের জানালা বন্ধ করে দিয়েছিল বিনু। অন্যটার পাল্লা আটকাবার কথা খেয়াল ছিল না। খোলা জানালাটা দিয়ে হেমন্তের টলটলে মায়াবী রোদ এসে পড়েছে ঘরে। রাস্তায় এখন। প্রচুর লোকজন। হুস হাস ছুটে যাচ্ছে বাস, প্রাইভেট কার, খবরের কাগজের ভ্যান, ঘোড়ার গাড়ি। কর্পোরেশনের লোকেরা কখন এসে হোস পাইপ দিয়ে জল ছিটিয়ে রাস্তা ধুয়ে দিয়ে গেছে, কখন। নিবিয়েছে গ্যাসের আলো, জানতে পারে নি বিনু।
সুনীতি বলল, চানঘরে তোর আনন্দদার কাচানো পাজামা পাঞ্জাবি, তোয়ালে, দাঁতের মাজন, নতুন ব্লেড, সব রেখে এসেছি। তাড়াতাড়ি দাড়ি কামিয়ে, মুখ ধুয়ে আয়। বাসি জামাকাপড় ওখানেই একধারে রেখে দিস।
কাল রাতেও সুনীতি আনন্দর এক প্রস্থ পাজামা পাঞ্জাবি দিয়েছিল। সেগুলোই এখন বিনুর পরনে। পরশু রাতে আদিঅন্তহীন নদীর ওপর দিয়ে রাজেকের নৌকোয় আসার সময় হানাদারেরা তাদের সর্বস্ব লুট করে নিয়ে গিয়েছিল। এক জামাকাপড়ে তারা কলকাতায় চলে এসেছে। আনন্দ আর সুনীতির পাজামা শাড়ি টাড়ি দিয়ে আপাতত তাদের কাজ চালিয়ে নিতে হচ্ছে।
সুনীতি ফের বলল, তোর আনন্দদা আজ আর অফিসে যাবে না। বেলায় দোকান খুললে তোকে নিয়ে তোর আর ঝিনুকের শাড়ি ধুতিটুতি কিনতে বেরুবে।
আনন্দর বাবার অ্যাডভোকেট হিসেবে ছিল প্রচুর নামডাক, বিপুল পশার। তার ইচ্ছা ছিল, বেঁচে থাকতে থাকতে ছেলেকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে যাবেন। তার বড় বড় ক্লায়েন্টগুলো আনন্দ পাবে। কিন্তু ওকালতি করতে হলে যে পাচোয়া বুদ্ধি দরকার তা আনন্দর নেই। কালো কোট পরে বাবার পেছন পেছন কিছুদিন সে কোর্টে যাতায়াত করেছে। বাবার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে ওকালতির ইতি। কালো কোট খুলে রেখে একটা বিরাট ব্রিটিশ মার্কেন্টাইল ফার্মে ভাল চাকরি নিয়েছে। বিনুদের জন্য আজ তাকে অফিস কামাই করতে হবে।
মালপত্র খোয়া গেলেও বেশ কিছু টাকা এখনও বিনুর কাছে আছে। কাল শিয়ালদায় পাকিস্তানি নোটগুলো পালটে সে ভারতীয় টাকা করে নিয়েছিল। ক’টা জামাকাপড় সে অবশ্যই কিনে নিতে পারে, কিন্তু তা বললে আনন্দরা খুবই অসন্তুষ্ট হবে। বিনু আপত্তি করল না। নতুন পোশাক আশাকের ভাবনা নয়, তার মস্তিষ্কের গোপন কুঠুরি থেকে হঠাৎ ঝিনুকের চিন্তাটা লাফ দিয়ে বেরিয়ে এল। ঘুম ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে কেন যে তার কথা মনে পড়ে নি! সে নিজে তো গাঢ় ঘুমে কালকের রাতটা কাবার করে দিয়েছে, কিন্তু ঝিনুকের কেমন কেটেছে? কাল নিঃশব্দে বিছানায় ওঠার আগে যেভাবে সে তার দিকে তাকিয়েছিল তার মধ্যে ছিল যাবতীয় ক্ষোভ, দুঃখ আর অসম্মানের গ্লানি। বুকের ভেতরটা নতুন করে দুলে ওঠে বিনুর। একরাশ উদ্বেগ মাথায় নিয়ে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করে, ঝিনুক উঠেছে?
সুনীতি মাথা নাড়ে, হ্যাঁ।
ও এখন কোথায়?
নিচের সেই ঘরেই আছে। আর দেরি করিস না। যা– ভাইকে তাড়া দিয়ে ডান পাশের দেওয়ালে অ্যাটাচড বাথরুমের দরজা দেখিয়ে দেয় সুনীতি।
মিনিট পনের কুড়ি বাদে চানঘর থেকে বেরিয়ে বিনু দেখতে পেল, সুনীতি চলে যায় নি। বিছানা এখন ফিটফাট, মশারির চারধার ছত্রির মাথায় চাঁদোয়ার ওপর তুলে দেওয়া হয়েছে। মনে হল, কাজের লোকদের দিয়ে নয়, নিজের হাতেই সব গুছিয়ে গাছিয়ে তার জন্য অপেক্ষা করছে সুনীতি।
বিনু একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, তুই এখনও যাস নি?
এক পলক ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নেয় সুনীতি। ফের তাকায়। খুবই কুণ্ঠিত। কেমন একটা ইতস্তত ভাব। দ্বিধা কাটিয়ে, থেমে থেমে একসময় বলল, তোর সঙ্গে কথা আছে।
সুনীতির বলার ধরনে কিসের যেন অনুরণন। চাপা ভয়ের কী? নাকি দুশ্চিন্তার? সতর্ক হল বিনু, কী কথা?
হাত তুলে ইশারায় বিনুকে চুপ থাকতে বলে সুনীতি। চট করে ভোলা দরজা অব্দি গিয়ে মুখ বাড়িয়ে ভেতর দিকে ঢালা বারান্দার এপাশ ওপাশ খুঁটিয়ে দেখে ফিরে আসে। গলা নামিয়ে বলে, আমার শাশুড়ি কেমন মানুষ, কাল নিশ্চয়ই টের পেয়েছিস। নেহাত তোর সঙ্গে এসেছে, তাই ঝিনুককে বাড়িতে ঢুকতে দিয়েছিল। আজ সকালে ঘুম ভাঙার পর থেকে সমানে গজ গজ করে চলেছে।
বুকের ভেতরটা আচমকা হিম হয়ে যায় বিনুর। জিজ্ঞেস করে, কী বলছেন উনি?
সোজাসুজি ভাইয়ের চোখের দিকে তাকায় সুনীতি, বুঝতে পারছিস না?
না বোঝার কারণ নেই। বিনু বলে, উনিই তো কাল বললেন, যতদিন বাবা না ফিরে আসছে, আমরা যেন এ বাড়িতে থেকে যাই।
ওটা না বললে খারাপ দেখায় তাই বলেছে। আসলে মোটেও চাইছে না, ঝিনুক এখানে থাকুক। কত কষ্ট পেয়েছে মেয়েটা, ওর ওপর এতটুকু করুণা নেই।
কিন্তু—
কী?
বাবা না ফেরা পর্যন্ত ঝিনুককে নিয়ে আমি কোথায় যাব?
সেটা ভেবেছি। তোর আনন্দদার সঙ্গে এই নিয়ে কাল রাত্তিরে কথাও হয়েছে। আজই তুই সুধা আর হিরণের সঙ্গে দেখা করবি। হিরণ জন্ম থেকে ঝিনুককে দেখে আসছে। নিশ্চয়ই ওরা তোকে ফেরাবে না।
রাজদিয়ায় থাকতে হিরণকে দাদা বলত সুনীতি। সুধার সঙ্গে বিয়ের পর নাম ধরে ডাকে। সম্পর্কে সে বড় শালী, গুরুজন। নাম ধরে ডাকার অধিকার তার নিশ্চয়ই আছে। সেটা প্রতিষ্ঠাও সে করেছে। হিরণ নতমস্তকে তা মেনেও নিয়েছে।
বিনু বলল, শুনেছিলাম হিরণদা পাকিস্তান থেকে তার ঠাকুরদা আর জেঠিমাকে নিজেদের কাছে নিয়ে এসেছে। ছোটদির দাদাশ্বশুর দ্বারিক দত্ত আর জেঠি শাশুড়ি যদি তোর শাশুড়ির মতো করে?
