বিনুর একটা হাত ধরে বিমর্ষ মুখে সুনীতি বলে, ভেবেছিলাম, রাত্তিরে ঝিনুকের কাছে শোব। কিন্তু–
সুনীতি যা বলল না তা খুবই স্পষ্ট। হেমনলিনীর জন্য স্বাধীনভাবে, নিজের বিবেকের নির্দেশে তার পক্ষে কিছু করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে এ বাড়িতে। একটি ধর্ষিতা মেয়ের পাশে এক বিছানায় বনেদি পরিবারের কুলবধু রাত কাটাবে, হেমনলিনী প্রাণ থাকতে তা হতে দেবেন না।
দিদির ওপরও কম রাগ হচ্ছিল না বিনুর। পরক্ষণে খেয়াল হল, ছেলেই যেখানে মায়ের সামনে কুঁকড়ে থাকে, পুত্রবধু কতটুকু আর কী করতে পারে? দিদির কথার সে উত্তর ছিল না।
সুনীতি বলল, নে, এবার শুয়ে পড়—
বিনু বলল, তোরা যা, আমি একটু পরে শুচ্ছি–
ক’দিন রাস্তায় খুব ধকল গেছে। বেশি রাত পর্যন্ত জেগে থাকিস না। সুনীতিরা ঘরের দরজা বাইরে থেকে টেনে দিয়ে চলে গেল।
কপালের দু’পাশের রগগুলো সমানে দপ দপ করছে। ঝিনুকের কথা যত ভাবছিল, পা থেকে মাথা পর্যন্ত সমস্ত শরীরে তীব্র অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ছিল।
একটুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে বিনু। তারপর পায়ে পায়ে দক্ষিণ দিকের জোড়া জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। খড়খড়ি এবং কাঁচের পাল্লা, দুটোই খোলা রয়েছে।
এখন প্রায় মাঝরাত। চারদিক নিঝুম হয়ে গেছে। রাস্তায় লোক চোখে পড়ে না বললেই হয়। কচিৎ দু’একটা রিকশা ঠন ঠন আওয়াজ তুলে ঢিমে চালে চলে যাচ্ছে। সিটে সাওয়ারিরা হেলে, ত্রিভঙ্গ হয়ে বসে আছে। ওরা সবাই নেশায় চুর। তাদের জড়ানো কণ্ঠস্বর থেকে অস্পষ্ট প্রলাপ, কিংবা দু’চার কলি অশ্লীল গান ভেসে আসছে। তিনটে ঘোড়ার গাড়িও পিচের রাস্তায় খট খট আওয়াজ তুলে চলে গেল। এই তিন যানের আরোহীরাও কেউ স্বাভাবিক নয়। কলকাতা যে মধ্যরাতে মাতালদের দখলে চলে যায়, বিনু জানত না।
রাস্তায় অনেকখানি দূরে দূরে গ্যাসের বাতিগুলো এক পায়ে দাঁড়িয়ে ম্যাড়মেড়ে, ঘোলাটে আলো বিতরণ করে চলেছে। সেগুলোকে ঘিরে কঁক বেঁধে ঘুরছে শামা পোকারা। চক্রাকারে, ক্লান্তিহীন।
কাল পরশু, দু’দিন পারাপারহীন নদীতে ভাসতে ভাসতে মাথার ওপর দিগদিগন্ত জুড়ে যে বিশাল আকাশ ব্যাপ্ত হয়ে ছিল, কলকাতার এক প্রাচীন বাড়ির জানালা দিয়ে সেটা এখন কত ছোট দেখাচ্ছে। ছোট এবং চৌকো। ওপার বাংলায় গভীর কুয়াশা মহাবিশ্বকে মুড়ে রেখেছিল। এখানেও কুয়াশা আছে, কিন্তু অত গাঢ় নয়। ফলে আবছাভাবে কৃষ্ণপক্ষের ক্ষীণ চাঁদটিকে দেখা যাচ্ছে। আকাশময় ছড়িয়ে আছে নিষ্প্রভ তারার মেলা।
চোখের সামনে এত কিছু-চওড়া রাস্তা, চারদিকের বাগানঘেরা বড় বড় বাড়ি, সেগুলোর জমকালো স্থাপত্য, আকাশ, চাঁদ, গ্যাসলাইটের রহস্যময় আলো, কিন্তু সমস্ত আড়াল করে বিশ্বব্রহ্মান্ড জুড়ে একটি করুণ, কাতর মুখ স্থির হয়ে আছে। ঝিনুক।
হেমনলিনী যখন খাওয়াদাওয়ার পর ঝিনুকের ব্যাপারে হুকুমনামা জারি করলেন, মনে মনে বিনু প্রতিজ্ঞা করেছিল, ঝিনুককে দু’হাতে আগলে রাখবে। যতক্ষণ শ্বাসবায়ু বইছে, চিরদুঃখী এই মেয়েটার জন্য যুদ্ধ চালিয়ে যাবে। কিন্তু হেমন্তের এই বিজন মধ্যরাতে, চারদিক যখন অপার নৈঃশব্দে ছেয়ে আছে, তার শপথের ভিত ক্রমশ টলে যেতে থাকে।
দিদির শ্বশুরবাড়িতে, দম-আটকানো আবহাওয়ায় বিনুর আর একটি মুহূর্তও থাকতে ইচ্ছা করছে না। সে নিশ্চিত, ঝিনুকও এত অসম্মান আর গ্লানি মাথায় নিয়ে এখানে থাকতে চাইবে না। কিন্তু কোথায় নিয়ে যাবে তাকে? অবনীমোহন কলকাতায় থাকলেও না হয় কথা ছিল। ঝিনুককে দেখলে তিনি কী করতেন, কী বলতেন, অসীম মমতায় তাকে কাছে টেনে নিতেন, নাকি তীব্র ঘৃণায় আবর্জনার মতো দূরে ছুঁড়ে ফেলতেন, কিছুই অনুমান করতে পারে না বিনু। তবে তার ধারণা, হেমনলিনীর মতো এতটা নির্দয় তিনি কোনওভাবেই হতেন না।
রাজদিয়ায় থাকার সময় ক’টা বছর অবনীমোহন ঝিনুককে খুব কাছে থেকে দেখেছেন। তিনি জানেন, জন্মের পর থেকেই জগৎ সংসারের শত কোটি দুঃখ এই মেয়েটার পায়ে পায়ে ঘুরছে। অসহায় ঝিনুকের প্রতি তার আর সুরমার ছিল কত যে মায়া!
অবনীমোহন কলকাতায় থাকলে ঝিনুকের ব্যাপারে হয়তো কিছু একটা ব্যবস্থা হয়ে যেত। কিন্তু তীর্থস্থানে গুরুর সান্নিধ্যে আরও কতদিন থাকবেন তার ঠিক নেই। কবে ফিরবেন, কে জানে।
বিনু আর ভাবতে পারছিল না। নিবিড় হতাশা চারপাশ থেকে তাকে গ্রাস করে ফেলছিল।
জানালা দিয়ে হেমন্তের হিমবাতাস ঘরে ঢুকছিল হু হু করে। দুশ্চিন্তায় এতটাই মগ্ন ছিল বিনু, টের পায় নি। আসলে শরীরের অনুভূতিগুলো কেমন অসাড় হয়ে গিয়েছিল। এখন মনে হল, ঠান্ডায় গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। জানালার পাল্লা টেনে দিয়ে বিছানায় এসে শুয়ে পড়ল সে। সঙ্গে সঙ্গে চোখ বুজে এল। গাঢ় ঘুম অঝোরে তার শিরায় স্নায়ুতে ঝরে পড়তে লাগল।
.
৩.২০
অনেকক্ষণ ধরে আবছাভাবে রিকশার ঠুন ঠুন এবং অন্যান্য গাড়িঘোড়ার ছোটাছুটির আওয়াজ কানে আসছিল। তারই ভেতর কে যেন তার নাম ধরে ডেকে যাচ্ছে, বিনু-বিনুবিনু’
ঘুমঘোরে প্রথমটা বুঝতে পারছিল না বিনু। পরে কণ্ঠস্বরটি আরেকটু স্পষ্ট হলে ধড়মড় করে উঠে বসল। চোখে পড়ল, খাটের পাশে দাঁড়িয়ে আছে সুনীতি।
মশারি তুলে বাইরে বেরিয়ে এল বিনু। সুনীতি বলল, অনেক বেলা হয়ে গেছে। মুখ টুখ ধুয়ে নে–
