আনন্দ বলল, চল–
বাইরের ঘর থেকে বেরিয়ে একতলার কোণের দিকের ঘরটিতে ঝিনুককে নিয়ে চলে এল সবাই। দু’টো বিছানা পাতা রয়েছে এখানে। একটা মেহগনি কাঠের মকরমুখি খাটে, অন্যটা মেঝেতে। খাটের বিছানাটা ধবধবে, নিভাজ। ছত্রিতে নেটের নীলচে মশারি খাঁটিয়ে বিছানার চারধারে পরিপাটি করে গুঁজে দেওয়া রয়েছে। শিয়রের কাছে নিচু সাইড টেবলে ঢাকা-দেওয়া কাঁচের গেলাসভর্তি জল।
নিচের সাদামাঠা বিছানায় একটি মেয়েমানুষ বসে ছিল। চল্লিশের কাছাকাছি বয়স। শক্তপোক্ত, নিরেট চেহারা। পরনে লাল তাঁতের খাপী ডুরে শাড়ি আর ক্যাটকেটে নীল ব্লাউজ। নাকে সবুজ পাথর বসানো নাকফুল আর হাতে রুপোর মোটা রুলি, গলায় রুপোরই বিছে হার। বোঝা যায়, সে দুলালী এবং এ বাড়ির কাজের মেয়ে।
আনন্দদের দেখে শশব্যস্ত হয়ে উঠে দাঁড়ায় দুলালী। ঝিনুককে দেখিয়ে সুনীতি তাকে বলে, এই দিদি রইল। মড়ার মতো ঘুমিয়ে থেকো না। ওর কখন কী দরকার হয়, একটু খেয়াল রেখো।
রাখব বৌদিদি। মা আমারে সমস্ত বলে দেছে। দুলালী বলতে লাগল, আপনি নিশ্চিন্তি থাকুন।
এ বাড়ির কাজের লোকেরা হেমনলিনীকে মা’ বলে। সুনীতি দুলালীকে আর কিছু বলল না। ঝিনুকের একটা হাত ধরে বিছানার কাছে নিয়ে এসে, মশারির সামনের দিকটা একটুখানি তুলে বলল, ওঠ–
ঝিনুক উত্তর দেয় না। একদৃষ্টে কয়েক পলক বিনুর দিকে তাকিয়ে থাকে। তার দু’চোখে কী যে কষ্ট, কত যে যাতনা, লজ্জা আর সুতীব্র অভিমান! বুকের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে সেসব যেন উঠে এসেছে।
ঝিনুকের চোখের দিকে তাকাতে পারছিল না বিনু। বোনের শ্বশুর বাড়িতে এসে মেয়েটার যে চূড়ান্ত অসম্মান আর লাঞ্ছনা হল তার সবটুকু দায় যেন বিনুর। কিন্তু সে ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারে নি, আদরযত্নের আড়ালে এ বাড়িতে ঝিনুকের জন্য অপেক্ষা করছে কী নিদারুণ নির্যাতন। অসহ্য এবং বেদনাময়। কত প্রত্যাশা আর ব্যাকুলতা নিয়ে এখানে ছুটে এসেছিল! তার বিশ্বাস ছিল, ঘনিষ্ঠ পরিজনেরা দু’হাত বাড়িয়ে ঝিনুককে বুকে জড়িয়ে নেবে, জীবনের দগদগে ক্ষতে স্নিগ্ধ প্রলেপ লাগিয়ে জুড়িয়ে দেবে যাবতীয় যন্ত্রণা, ভুলিয়ে দেবে এই সেদিনের যত মর্মান্তিক স্মৃতি। কিন্তু কী ভেবেছিল বিনু আর কী ঘটে গেল! কলকাতায় পা দিয়ে অভ্যর্থনাটা ভালই হল ঝিনুকের। এর জন্য শতভাগের একভাগও দায়ী নয় বিনু, তবু সীমাহীন অপরাধবোধ তার সর্বাঙ্গে অবিরত শেল বিঁধিয়ে চলেছে।
সুনীতি মশারি তুলে ধরায় যে ফোকরটুকু হয়েছিল, তার ভেতর দিয়ে নিঃশব্দে বিছানায় ঢুকে ওপাশ ফিরে শুয়ে পড়ে ঝিনুক। এদিক থেকে তার মুখ আর দেখা যায় না।
মশারিটা ফের সযত্নে তোষকের তলায় গুঁজে দিয়ে, দুলালীকে ঝিনুক সম্পর্কে আরও একবার সতর্ক করে সুনীতি ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। সঙ্গে মাধুরী বিনু আর আনন্দ।
টানা বারান্দার শেষ মাথায় এসে সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় উঠে এল সবাই। এখানেও নিচের তলার মতোই লম্বা বারান্দা, উত্তর থেকে দক্ষিণে চলে গেছে। সেটার একপাশে পর পর শোবার ঘর। মোট ছ’খানা। আরেক দিকে কোমর-সমান উঁচু নকশা করা লোহার রেলিং, যার মাথায় পাঁচ ইঞ্চি পুরু বর্মা টিকের ছাউনি। ব্রহ্মদেশের এই দামী কাঠ এতই চকচকে যেন আলো ঠিকরে পড়ছে।
এ বাড়ির লোকজনদের শোবার ঘরগুলো দোতলাতেই। মাধুরীকে তার ঘরে পাঠিয়ে আনন্দ এবং বিনুকে নিয়ে দক্ষিণ দিকের শেষ বেডরুমটায় এল সুনীতি।
দেওয়ালে ল্যাম্প শেডের ভেতর আলো জ্বলছিল। স্নিগ্ধ ছটা ছড়িয়ে পড়েছে বিশাল ঘরখানায়। শ্বেত পাথরের ধবধবে মেঝে। দুই দেওয়ালে বিরাট জোড়া জানালায় খড়খড়ি আর রনি কাঁচ বসানো পাল্লা।
ঘরের মাঝখানে কারুকাজ করা প্রকান্ড খাটে বিছানা পেতে মশারি খটিয়ে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে সেকেলে দামী দামী আসবাব। আলমারি, দেরাজওলা চেয়ার টেবল, কুশন, ড্রেসিং টেবল। একধারে উঁচু স্ট্যান্ডের মাথায় জি ই সি কোম্পানির মস্ত রেডিও।
আনন্দ ভারী গলায় ডাকল, বিনু–
বিনু অন্যমনস্ক ছিল। ঝিনুকের মুখটা বার বার তার চোখের সামনে ফুটে উঠছে। এ বাড়িতেই মাত্র কয়েক ফুট নিচে সে আছে। তবু মনে হয়, ধরাছোঁয়ার বাইরে সহস্র যোজন দূরে তাকে নির্বাসনে পাঠিয়েছেন হেমনলিনী।
আনন্দর ডাকে চমকে উঠে বিনু সাড়া দিল, কিছু বলবেন?
পৃথিবীর সব অপরাধের গুরুভার নিজের মাথায় চাপিয়ে কুণ্ঠিতভাবে আনন্দ বলে, মায়ের ওপর রাগ করে থেকো না। সেকেলে মানুষ–
বিনু চুপ করে রইল।
আনন্দ কুণ্ঠিতভাবে এবার বলে, ঝিনুকের ওপর ভীষণ অন্যায় হল। কিন্তু মাকে–কথা অসমাপ্ত রেখে থেমে গেল সে।
হঠাৎ মাথায় আগুন ধরে যায় বিনুর। বিষবাষ্পে-ভরা এক নিদারুণ ভুখন্ড পেরিয়ে কী নিদারুণ আতঙ্কে আর উৎকণ্ঠায় ঝিনুককে আগলে আগলে সীমান্তের এপারে নিয়ে এসেছে, শুধু সে-ই জানে। সবই বলেছে বিনু, কিছুই গোপন করে নি। সেই মর্মান্তিক বিবরণ শোনার পরও হেমনলিনী যা করলেন তার বিরুদ্ধে কেউ একটা আঙুল পর্যন্ত তুলল না। বিনুর যাবায় ক্ষোভ আনন্দর ওপর। পুতুলের মতো সে বসে রইল। একবারও বলল না, মা, তুমি যা করছ সেটা ঠিক নয়। একেবারে মেরুদন্ডহীন। ভীরু। কাপুরুষ।
অসহ্য রাগ শিরাস্নায়ু চুরমার করে ফেটে পড়তে চাইছিল। সেকেলে মানুষ’ বলে মার সম্বন্ধে সাফাই গাইছে আনন্দ। ছিঃ! মনে মনে হাজার বার আনন্দকে ধিক্কার দিয়ে, অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে রাখল বিনু। চোয়াল শক্ত হয়ে গিয়েছিল তার। ঠাণ্ডা গলায় শুধু বলল, ঠিক আছে।
