লাঞ্ছিত ঝিনুকের ধর্ষণের খবর তা হলে কলকাতাতেও পৌঁছে গেছে? হতচকিত বিনু গলার শিরা ছিঁড়ে চেঁচিয়ে উঠতে চাইল, কিন্তু কেউ যেন লোহার আঙুল দিয়ে তার কণ্ঠনালী টিপে ধরেছে। গোঙানির মতো একটা ক্ষীণ আওয়াজ বেরিয়ে এল শুধু।
বিনুর মাথার ভেতর হঠাৎ অবিরাম একটা আগুনের চাকা ঘুরে যেতে লাগল। কেন হেমনলিনী ঝিনুককে পা ছুঁতে দেননি, কেন তার নিচে থাকার ব্যবস্থা, এবার স্পষ্ট হয়ে গেছে। প্রতি মুহূর্তে নিদারুণ মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে কী আতঙ্কের মধ্যে ঝিনুককে সঙ্গে করে পূর্ব পাকিস্তান থেকে সীমান্তের এপারে এসেছে, শুধু সে-ই জানে। ভেবেছিল, সব উৎকণ্ঠা সব ত্রাসের অবসান ঘটে গেছে। ভেবেছিল, এখানে এলেই অফুরান সহানুভূতিতে ঝিনুককে সবাই কাছে টেনে নেবে, ভুলিয়ে দেবে তার জীবনের চরম দুর্ঘটনার স্মৃতি। কিন্তু কলকাতায় পা দেবার সঙ্গে সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিজনের কাছ থেকে মর্মান্তিক আঘাতটা এল। হয়তো অবনীমোহনও ঝিনুককে গ্রহণ করবেন না, সুধারাও মুখ ফিরিয়ে থাকবে। অন্য আত্মীয়স্বজনেরাও ধারে কাছে ঘেঁষবে না। কিন্তু কে কী করল, কে কী করবে, তা নিয়ে ভাববে বিনু। শত হাতে ঝিনুককে আগলে রাখবে। আজ থেকেই তার অন্য এক মহাযুদ্ধের প্রস্তুতি।
কখন হেমনলিনী ঘর ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, খেয়াল করেনি বিনু। সে দেখল, ডান পাশের বড় সোফায় নতমুখে বসে আছে সুনীতি আর আনন্দ। ছাইবর্ণ মুখ। বিনুর চোখ বাঁ দিকে ঘুরে গেল। সেখানে প্রিয় নারীটি অঝোরে কেঁদে চলেছে।
ঝিনুককে দেখতে দেখতে বুকের ভেতরটা উথলপিথল হয়ে যায়। বড় মায়ায় বিনু তার কাঁধে একটা হাত রাখে।
.
৩.১৯
হেমনলিনী যে অত্যন্ত কড়া ধাতের মহিলা, প্রবল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, সুনীতিদের সংসারের লাগামটি শক্ত মুঠোয় ধরে আছেন, তা আগেই টের পাওয়া গিয়েছিল। তার কথাই এ বাড়িতে শেষ কথা। তার মুখের ওপর টু শব্দটি করার দুঃসাহস এই প্রাচীন, বনেদি পরিবারের কারোর নেই। তিনি যে সিদ্ধান্ত নেন, মুখ বুজে সবাইকে তা মেনে নিতে হয়।
হেমনলিনী বলেছেন, বিনু রাতে দোতলায় শোবে, কিন্তু ঝিনুক থাকবে একতলার এক কোণে, যতটা সম্ভব এখানকার সমস্ত কিছুর স্পর্শ বাঁচিয়ে। বিনু পুরুষমানুষ, তার ওপর ঘনিষ্ঠ কুটুম। তার কথা আলাদা। কিন্তু অনাত্মীয়, ধর্ষিতা একটি তরুণীকে কোনওভাবেই দোতলায় নিয়ে যাওয়া যায় না, কেননা সেখানে রয়েছে ঠাকুর ঘর। ঝিনুক গেলে ওখানকার পবিত্রতা নষ্ট হবে, এই বংশের মুখে চুনকালি লাগবে।
হেমনলিনীর হুকুমমতো যতীনকে দিয়ে বিছানা পাতিয়ে মাধুরী বাইরের ঘরে এল। নিচু, বিষাদমাখা গলায় বলল, অনেক রাত হল। মা সবাইকে শুয়ে পড়তে বলেছেন। বলতে বলতে তার চোখ ঝিনুকের দিকে চলে যাচ্ছিল। মেয়েটাকে অচ্ছুতদের মতো আলাদা করে দুরে সরিয়ে রাখা হচ্ছে। সে জন্য ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল মাধুরীর।
অনেকক্ষণ অঝোরে কান্নার পর চুপ করে গিয়েছিল ঝিনুক। বসে আছে নতচোখে। অসাড় এবং নিস্পন্দ। রক্তিম দুই চোখ টস টস করছে। শুধু গাল বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা জল ঝরে যাচ্ছে অবিরল।
সুনীতি বিনু আর আনন্দ, সকলেই স্তব্ধ হয়ে বসে ছিল। বিনুর একটা হাত আলগাভাবে ঝিনুকের কাঁধের ওপর পড়ে আছে। তার ছোঁয়ায় ঝিনুক কতটা ভরসা পেয়েছে, পেয়েছে নতুন করে নিদারুণ আঘাত সইবার মতো কতখানি শক্তি, সে জানে না। এ বাড়িতে আদর যত্নের তিলমাত্র ত্রুটি হয় নি। হেমনলিনী কাছে বসে কোমল সুরে কথা বলতে বলতে ঝিনুককে খাইয়েছেন। তার কণ্ঠস্বর ছিল অপার সহানুভূতিতে আর্দ্র। কিন্তু স্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়েছেন, ঝিনুকের মতো মেয়েদের জন্য দুঃখ বা সমবেদনা প্রকাশ করা যায়, কিন্তু সবই দূর থেকে। হেমনলিনী তার আর এ বাড়ির মাঝখানে তুলে দিয়েছেন অদৃশ্য একটা দেওয়াল–অনেক উঁচু, প্রায় আকাশস্পর্শী। সেটা ভেদ করে আনন্দ সুনীতি বা অন্য কেউ গভীর মমতায় ঝিনুককে কাছে টেনে নেবে, সাধ্য কী। নেহাত কুটুমের সঙ্গে মেয়েটা চলে এসেছে, তাই খাতির করা হচ্ছে, নইলে ঝিনুক এখানে সম্পূর্ণ অবাঞ্ছিত।
আস্তে আস্তে, ক্লান্তভাবে সোফা থেকে নিজেদের টেনে তোলে আনন্দরা। খানিক আগে যা ঘটে গেছে, যেভাবে চাঁছাছোলা ভাষায় হেমনলিনী ঝিনুককে এখানে থাকার মূল শর্তগুলো জানিয়ে দিয়েছেন, তাতে লজ্জায় সবার মাথা কাটা যাচ্ছিল। আনন্দর মনে হয়েছে, ওভাবে দুঃখী মেয়েটাকে আঘাত দেওয়া চরম নিষ্ঠুরতা।
সুনীতি ভয়ে ভয়ে মাধুরীকে জিজ্ঞেস করে, নতুন জায়গা। ঝিনুক কি একা শোবে? মা কী বললেন?
অর্থাৎ এ বাড়িতে কে কী করবে, কে কিভাবে চলবে, সব ঠিক করে দেবেন হেমনলিনী। পরিবারের সকলের জন্য তিনি যে কঠোর নিয়ম শৃঙ্খলার বেড়াজাল তৈরি করে দিয়েছেন, তার বাইরে পা বাড়াবার কথা কেউ ভাবতে পারে না। রাতে ঝিনুকের কাছে কেউ থাকবে কিনা, সেটাও তার বিবেচনার ওপর নির্ভর করছে।
মাধুরী বলল, একা থাকবে কেন? মা দুলালীকে ঝিনুকের ঘরে থাকতে বলেছেন।
হেমনলিনীর সব দিকে নজর। ঝিনুক যখন এসেই পড়েছে, তার যাতে এতটুকু অযত্ন না হয়, কেউ যেন মনে না করে তাকে হেলাফেলা করে একধারে ফেলে রাখা হয়েছে, সে সম্পর্কে তিনি খুবই সচেতন। ঝিনুক যাতে অচেনা জায়গায় একা একা শুতে ভয় পায়, তাই একজনকে তার কাছে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।
