এদিকে হেমনলিনী গলা উঁচুতে তুলে ডাকতে লাগলেন, অনাথ, যতীন–শিগগির বাইরের ঘরে আয়।
একজন চল্লিশ বেয়াল্লিশ বছরের বেঁটেখাটো, গোলগাল প্রৌঢ় এবং একটি লম্বা, পাতলা চেহারার যুবক বাড়ির ভেতর দিক থেকে প্রায় ছুটতে ছুটতে চলে এল। হেমনলিনী মাঝবয়সীকে বললেন, অনাথ, পাকিস্তান থেকে বড় বৌমার ভাই আর ওদের ওই আত্মীয় মেয়েটি এসেছে। উনুন আর কেরাসিনের স্টোভ জ্বেলে দুটোতেই রান্না চড়িয়ে দে। এক ঘন্টার ভেতর যেন সব হয়ে যায়। তাড়াতাড়ি খেয়ে ওরা শুয়ে পড়বে। দই মিষ্টি আছে?
প্রৌঢ়টি অর্থাৎ অনাথ বলল, আছে মা—
যা–
অনাথকে আগে না দেখলেও যতীনকে দেখেছে বিনুরা। সদর দরজা সেই খুলে দিয়েছিল।
অনাথ চলে গেলে হেমনলিনী যুবকটিকে বললেন, যতীন, ওরা চান করবে। কিন্তু কার্তিক মাসের হিম পড়তে শুরু করেছে। ঠাণ্ডা জল রাত্তিরে মাথায় ঢাললে অসুখ করবে। রান্না চাপাবার আগে অনাথকে দিয়ে দু’বালতি গরম জল করিয়ে নিচের চান-ঘর দুটোয় দিবি।
আচ্ছা মা– যতীন আর দাঁড়াল না।
বিনু টের পাচ্ছে, এ বাড়ির বল্গা শক্ত মুঠোয় ধরে রেখেছেন হেমনলিনী, এবং প্রবল প্রতাপে সংসারটিকে তিনি চালিয়ে থাকেন। নিমেষে সুচারুভাবে তাদের জন্য সব ব্যবস্থা তিনি করে দিলেন। তবু মাথার ভেতরে কোথায় যেন একটা কাঁটা ফুটছে বিনুর। ঝিনুকের প্রণাম কেন নিলেন না তিনি? অসুস্থ, রোগা মেয়েটাকে কেন ওভাবে কষ্ট দিলেন? কিন্তু এখন এত সব ভাবাভাবির মতো মনের অবস্থা নয়। স্নায়ু ছিঁড়ে পড়ছে। স্নান খাওয়া সেরে শুয়ে পড়তে পারলে তারা বেঁচে যায়।
বিনুর হঠাৎ খেয়াল হল, একেবারে খালি হাত-পায়ে তারা চলে এসেছে। পরনের জামাকাপড় এবং তারপাশায় কেনা সেই চাদর দু’টো ছাড়া আর কিছুই নেই। সুনীতিকে বলল, বড়দি, আসার সময় পথে আমাদের সব লুট হয়ে গেছে। গায়ে তিনদিনের বাসি নোংরা জামাকাপড়। সারা শরীর ঘিনঘিন করছে। ঝিনুকের জন্যে শাড়িটাড়ি আর আমার জন্যে আনন্দদার ধুতি কি পাজামা নিয়ে আয়। স্নান করার পর পরব।
এক্ষুনি নিয়ে আসছি– সুনীতি উঠে পড়ল।
.
৩.১৮
সুনীতির শ্বশুরবাড়িতে ডাইনিং টেবল নেই। খাওয়াদাওয়া পুরোপুরি সাবেক চালে, সুতোর নকশা করা বড় বড় আসন পেতে, কাঁসার থালায়।
বসার ঘরের লাগোয়া একটা ঘরে বিনু আর ঝিনুককে খেতে বসানো হয়েছিল। পরিবেশন করছিল সুনীতি আর দীপকের বউ মাধুরী। একটা মোড়ায় বসে তদারক করেছিলেন হেমনলিনী। আনন্দ আর দীপক কাছাকাছি মেঝেতে বসে আছে। বাচ্চাগুলো অবশ্য নেই, তাদের শুতে পাঠানো হয়েছে।
সবারই পূর্ব পাকিস্তান সম্পর্কে অনেক প্রশ্ন, তীব্র কৌতূহল এবং প্রবল উৎকণ্ঠা। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সেখানকার হালচাল জেনে নিচ্ছিল আনন্দরা। তাদের প্রশ্নেরই শুধু জবাব দিল না বিনু, ঝিনুককে নিয়ে কোন পরিস্থিতিতে তাকে রাজদিয়া থেকে চলে আসতে হয়েছে, পথে দু’আড়াই দিন কী কী মারাত্মক ঘটনা ঘটেছে, হাজার হাজার মানুষ ভিটেমাটি ছেড়ে ইন্ডিয়ায় চলে আসার জন্য স্টিমারঘাটগুলোয় আর গোয়ালন্দে স্টিমার কি ট্রেনের আশায় কিভাবে অসীম আতঙ্ক নিয়ে পড়ে আছে, তার যাবতীয় বিবরণও দিতে লাগল।
শুনতে শুনতে কখনও শিউরে উঠছে আনন্দরা, কখনও তাদের চোখেমুখে গভীর শঙ্কা ফুটে বেরুচ্ছে, কখনও বা গলার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে অস্ফুট, কাতর শব্দ।
আনন্দ বিষাদের সুরে বলল, পার্টিশান সমস্ত কিছু শেষ করে দিল। মনে হচ্ছে, ওপার থেকে উদ্বাস্তু আসা থামবে না, দিনকে দিন বেড়েই যাবে।
বিনু বলল, আমার সেই রকমই ধারণা। যা দেখে এলাম, অল্প দিনের মধ্যে ইস্ট পাকিস্তান ফাঁকা হয়ে যাবে।
হেমনলিনী জিজ্ঞেস করলেন, ওখানকার অবস্থা যখন এইরকম, হেমনাথবাবু থেকে গেলেন কেন?
বিনু বলল, অনেক বুঝিয়েছি। কিন্তু কোনও কথাই শোনেননি। বলেছেন, জন্মভূমি ছেড়ে তিনি ইন্ডিয়ায় আসবেন না। এতে যা হবার তোক।
খাওয়া হয়ে গেলে বিনু আর ঝিনুককে নিয়ে ফের বসার ঘরে এলেন হেমনলিনী। আনন্দরাও সঙ্গে সঙ্গে এসেছিল।
হেমনলিনী দীপক আর মাধুরীকে বললেন, দীপু, ছোট বৌমা, তোমরা যতীনকে দিয়ে একতলার পুব দিকের ঘরে ঝিনুকের জন্যে বিছানা করে দেবে। আর বিনুর বিছানা হবে দোতলার দক্ষিণ দিকের ঘরে। নতুন চাদর পেতে দিতে বলবে। কার্তিক মাস পড়তেই মশা আসতে শুরু করেছে। মশারি যেন টাঙানো হয়। বিনুদের সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে। তোমরা এখন আর এখানে এস না।
মাধুরী আর দীপক চলে যায়।
বিনু হেমনলিনীর দিকে তাকিয়ে আছে। পলকহীন। মহিলার আদর আপ্যায়ন এবং যত্নে কোনও রকম ত্রুটি নেই। কিন্তু ঝিনুকের ব্যাপারে কোথায় যেন খিচ থেকে যাচ্ছে। এত বড় বাড়িতে দোতলায় নিশ্চয়ই ঘরের অভাব নেই। তবু ঝিনুকের বিছানা নিচে করা হবে কেন?
হেমনলিনী বিনুকে বললেন, অবনীমোহনবাবু যতদিন তীর্থ সেরে ফিরে না আসছেন, তোমরা আমাদের এখানেই থাকো। তবে–
বিনু জিজ্ঞেস করল, তবে কী?
তার প্রশ্নটা যেন শুনতেই পাননি হেমনলিনী। ঝিনুকের দিকে তাকিয়ে বললেন, দেখ মা, তোমাকে আমি এমন একটা কথা বলব যাতে দুঃখ পাবে, কিন্তু না বলেও পারছি না। শুনেছি ঢাকায় গিয়ে তুমি রায়টের মধ্যে পড়েছিলে, গুণ্ডারা কদিন তোমাকে আটকে রেখেছিল। খবরটা শোনার পর খুব কষ্ট হয়েছিল। জানি তোমার কোনও অপরাধ নেই, তুমি নির্দোষ। কিন্তু আমি পুরনো দিনের মানুষ। নানা সংস্কারে আটকে আছি। এই বয়েসে সে সব কাটানো সম্ভব নয়। একটু থেমে বললেন, যে কদিন আছ, একতলাতেই থাকবে। দোতলায় আমাদের ঠাকুর ঘর। তুমি ওপরে না উঠলেই ভাল হয়।
