দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। বিনু কড়া নাড়তে পাল্লা খুলে একটা বছর তিরিশের কাজের লোক, যুবকই বলা যায়, কয়েক পলক অবাক তাকিয়ে থাকে। প্রায় মধ্যরাতের এই আগন্তুকদের
সে নিশ্চয়ই আশা করেনি। জিজ্ঞেস করে, কাকে চাইছেন বাবু?
বিনু বলল, আনন্দময়বাবু আর ওঁর স্ত্রী আছেন?
লোকটা ঘাড় কাত করে, আছেন।
অনেকখানি স্বস্তি। আনন্দদের না পাওয়া গেলে এত রাতে হয়তো টালিগঞ্জে সুধাদের বাড়ি ছুটতে হত। বিনু বলল, ওঁদের খবর দাও। বলবে, রাজদিয়া থেকে বিনুবাবুরা এসেছে।
লোকটা কী ভেবে বলল, আপনারা ভেতরে এসে বসুন–
পুরু গদিওলা ভারী ভারী, পুরনো ডিজাইনের সোফা দিয়ে সাজানো একটা বড় বসার ঘরে বিনুদের নিয়ে এল লোকটা। তাদের বসিয়ে ওধারের সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে গেল।
খানিক পরে সিঁড়িতে অনেকগুলো পায়ের আওয়াজ পাওয়া গেল। চোখের পলক পড়তে না পড়তেই ঘরে এসে ঢুকল সুনীতি, আনন্দ, আনন্দর ভাই দীপক, কমবয়সী একটা বউ এবং দুতিনটে বাচ্চা। বিনু জানে, আনন্দর দুই দাদা সরকারি অফিসার। তাদের একজন থাকেন দিল্লিতে, অন্যজন মিরাটে। বোনেদের বিয়ে হয়ে গেছে। তারা যে যার শশুরবাড়িতে।
দীপককে চেনে বিনু। সুনীতির বিয়ের সময় বরযাত্রী হয়ে আনন্দর সঙ্গে রাজদিয়া গিয়েছিল সে। এ বাড়িতে সুনীতির বউ-ভাতেও দেখা হয়েছে। তখনও তার বিয়ে হয়নি। পরে যখন হল, নেমন্তন্নের চিঠি পাঠানো হয়েছিল। হেমনাথ ঠিক করেছিলেন, বিনুকে নিয়ে কলকাতায় আসবেন। কিন্তু হঠাৎ স্নেহলতা ধুম জ্বরে শয্যাশায়ী হয়ে পড়লেন। অগত্যা কলকাতা যাত্রা বন্ধ করে দিতে হল। বউটিকে আগে না দেখলেও বিনু আন্দাজ করল, নিশ্চয়ই দীপকের স্ত্রী। সে জানে, সুনীতির একটাই ছেলে। তার জন্মের সঙ্গে সঙ্গে চিঠি লিখে রাজদিয়ায় সুখবরটা দিয়েছিল আনন্দ। বাকি বাচ্চা দুটো দীপকেরই হবে।
সবাই বিনু আর ঝিনুককে ঘিরে বসল। প্রত্যেকের চোখে মুখে অপার বিস্ময়। সুনীতি জিজ্ঞেস করল, এত রাত্তিরে তোরা কোত্থেকে এলি!
বিনু বলল, রাজদিয়া থেকে। আগে ভবনীপুরে গিয়েছিলাম। বাবা নেই। পাশের বাড়ির লোকেরা বলল, হরিদ্বার না কোথায় যেন গেছে।
বাবা আজকাল বছরের সাত আট মাস হয় হরিদ্বার, নইলে হৃষিকেশ, কি কনখল বা কন্যাকুমারী করে কাটাচ্ছে।
কেন রে?
কোনও এক গুরুর কাছে দীক্ষা নিয়েছে। কলকাতায় মন বসে না। শুধু তীর্থে তীর্থে ঘুরে বেড়ায়।
বিনু স্তম্ভিত। তার বাবা এক অদ্ভুত মানুষ। পৃথিবীর অন্য সবার থেকে আলাদা। তার স্বভাবে কোনও দিনই স্থিত হয়ে বসার লক্ষণ নেই। সারা জীবন শুধু ছুটছেনই। এটা ধরছেন, সেটা ছাড়ছেন। একসময় কলেজে পড়াতেন, হঠাৎ ছেড়ে দিয়ে স্টক মার্কেটে যাতায়াত শুরু করলেন। তারপর ঝোঁকের মাথায় চলে গেলেন রাজদিয়ায়। প্রচুর জমিজমা কিনে চাষবাসে মনপ্রাণ ঢেলে দিলেন। স্ত্রীর মৃত্যুর পর হঠাৎ কী খেয়াল হল, সব ফেলে কনট্রাক্টরি করতে ছুটলেন আসামে। তখন যুদ্ধের আমল। মিলিটারিদের জন্য ব্রিজ, সড়ক, হাসপাতাল বানিয়ে দেদার পয়সা করলেন। যুদ্ধ থামলে সোজা কলকাতায়।
সুধা সুনীতি দু’জনেই চিঠি লিখে বছরখানেক আগে জানিয়েছিল, অবনীমোহনের ধর্মের দিকে খুব ঝোঁক দেখা যাচ্ছে। তাই বলে তিনি দীক্ষা নেবেন, তীর্থে তীর্থে পর্যটন করে বেড়াবেন, এতটা ভাবা যায়নি।
আনন্দ বলল, তোমরা আসবে, আগে জানাওনি কেন?
বিনু বলল, আপনাকে, হিরণদাকে আর বাবাকে দু’টো করে চিঠি দিয়েছি। শিয়ালদায় আপনাদের কাউকে দেখতে না পেয়ে ভীষণ চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম।
আজকাল পাকিস্তানের চিঠি পেতে তিন চার সপ্তাহ লেগে যায়। অনেক সময় পাওয়াও যায় না।
বিনু কী উত্তর দিতে যাচ্ছিল, কোনও বয়স্ক মহিলার ভারী গলা শোনা গেল, কথাবার্তা পরে হবে। ওরা ক্লান্ত হয়ে এসেছে। আগে হাতমুখ ধুক, খেয়ে দেয়ে সুস্থ হোক
বিনু দেখতে পেল, দরজার কাছে হেমনলিনী দাঁড়িয়ে আছেন। আনন্দর মা। বিধবা মহিলাটির চেহারায়, কণ্ঠস্বরে ব্যক্তিত্ব এবং বনেদিআনার ছাপ। সুনীতির বিয়ের সময় আনন্দর বাবা বেঁচে ছিলেন। বিয়ের বছরখানেকের মধ্যে তিনি মারা যান।
হেমনলিনীকে আগে দু’বার দেখেছে বিনু। আনন্দর বিয়ের সময় তিনিও রাজদিয়া গিয়েছিলেন। পরে সুনীতির বউ-ভাতে কলকাতায়। সে উঠে দাঁড়াল। বললে, দুটো দিন স্নান হয়নি মাউইমা। সারা শরীর কাঠ হয়ে আছে। গায়ে মাথায় জল ঢালতে না পারলে ঘুমোতে পারব না। বলতে বলতে সে হেমনলিনীর দিকে এগিয়ে যায়। নিচু হয়ে তার পা ছুঁয়ে প্রণাম করে।
হেমনলিনী আশীর্বাদের ভঙ্গিতে হাত তুলে সস্নেহে বলেন, বেঁচে থাক বাবা, একশ’ বছর পরমায়ু হোক।
ঝিনুকও সোফা থেকে উঠে এসেছিল। রাজদিয়ায় সে হেমনলিনীকে দেখেছে। কলকাতায় সুনীতির বউভাতের সময়ও বিনুদের সঙ্গে এসেছিল। তাকে পরিষ্কার মনে আছে। তার পায়ের দিকে ঝিনুক ঝুঁকতে যাবে, হেমনলিনী দু’পা পিছিয়ে গেলেন। বললেন, থাক থাক, তুমি সোফায় গিয়ে বসো–
ঝিনুক ফ্যাল ফ্যাল তাকিয়ে থাকে। বিমূঢ়, বিহ্বল। ঘরের অন্য সবাই কম হতভম্ব হয়নি। বিনুর প্রণাম নিলেও ঝিনুকেরটা কেন নিলেন না, বরং দৃষ্টিকটুভাবে কেন পিছিয়ে গেলেন, বোঝা যাচ্ছে না।
মুখটা করুণ হয়ে গিয়েছিল ঝিনুকের। কয়েক পলক দাঁড়িয়ে থেকে নতচোখে ফিরে এসে বসে পড়ে।
