ভাড়া কমানোর জন্য দর কষাকষি করল না বিনু। ঝিনুককে আগে গাড়িতে তুলে দিয়ে নিজে উঠতে উঠতে কোচোয়ানকে বলল, চালাও। যত তাড়াতাড়ি পার পৌঁছে দেবে।
অবাঙালি মুসলমান কোচোয়ান বলল, জি, সাব– বলেই চাবুক হাঁকিয়ে গাড়ি ছোটাল।
মুহূর্তে স্টেশন চত্বর পেরিয়ে বাইরের ট্রাম রাস্তায় এল বিনুরা। ঘোড়া দুরন্ত গতিতে দৌড়চ্ছে। শক্ত পিচের রাস্তা থেকে উঠে আসছে অশ্বক্ষুরের একটানা ধ্বনি।
রাস্তার দু’ধারে উঁচু উঁচু সব বাড়ি। সারি সারি দোকানপাট। আলোয় ঝলমল করছে শহর। মাঝে মাঝে গ্যাসবাতিও চোখে পড়ছে।
এই হেমন্তে কলকাতাতেও হিম পড়ছে। নামছে কুয়াশাও। তবে পূর্ব বাংলার মতো অত ঘন হয়ে নয়। পাতলা ধবধবে রেশমের মতো। রাস্তার আলোগুলো ঘিরে ঝাঁকে ঝাঁকে শামাপোকা পাক খাচ্ছে। বৃত্তাকারে। ঠাণ্ডাটাও এখানে অনেক কম। সামান্য শীত শীত লাগছে।
দূরে একটা বড় টাওয়ার ক্লকে আটটা বেজে চল্লিশ। এত রাতেও রাস্তায় জনারণ্য। গাড়ির স্রোত। নানারকম শব্দ। ধাবমান ট্রাম বাসের, রিকশার, ঘোড়ার গাড়ির, প্রাইভেট কারের। তা ছাড়া রয়েছে। মানুষের কোলাহল। সব মিলিয়ে অদ্ভুত এক চালচিত্র।
জানালার বাইরে অন্যমনস্কর মতো তাকিয়ে ছিল বিনু। তাদের ঘোড়াটা জোর কদমে ছুটছে। গাড়ির মাথায় বসে কোচোয়ানটা মাঝে মাঝে টাকরায় জিভ ঠেকিয়ে টর-র-র-র, টর-র-র-র আওয়াজ করে হাওয়ায় সাঁই সাঁই চাবুক চালিয়ে ঘোড়াটাকে হুঁশিয়ার করে দিচ্ছে। দৌড়টা একই তালে চালিয়ে যেতে হবে। গতি কমালেই চাবুক।
হঠাৎ কান্নার সরু শব্দ কানে আসে বিনুর। চকিতে বাইরে থেকে মুখ ফেরাতেই সে দেখতে পায়, জানালায় মাথা রেখে ঝিনুক কাঁদছে। কান্নার হেতুটা বুঝতে না পেরে প্রথমটা হতভম্ব হয়ে যায় সে। তারপর ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়ে। উলটো দিকে মুখোমুখি বসে ছিল, দ্রুত উঠে এসে পাশে বসল। ঝিনুকের পিঠে হাত রেখে জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে? কাঁদছ কেন?
ঝিনুক ধীরে ধীরে মাথা তুলে সোজা হয়ে বসে। শিথিল গলায় বলে, আমার খুব ভয় করছে।
কিসের ভয়?
ঝিনুক উত্তর দেয় না।
বিনু নরম গলায় বলে, কোনও ভয় নেই। আমরা তো কলকাতায় চলে এসেছি। সে জানাতে চায়, নিরাপদ দূরত্বে আসার পর ভীতি বা শঙ্কার কোনও কারণই থাকতে পারে না।
অনেকক্ষণ বোঝানোর পর কান্না থামে ঝিনুকের। কিন্তু ভয়টা কেটেছে কিনা, বোঝা যায় না। উদাস মুখে, নীরবে বসে থাকে সে।
.
ট্রাম রাস্তা থেকে ডাইনে বাঁয়ে নানা অলিগলি, ফের অন্য একটা ট্রাম রাস্তা, এইভাবে পাক খেতে খেতে ঘোড়ার গাড়ি একসময় প্রিয়নাথ মল্লিক রোডে পৌঁছে গেল।
খুব ছেলেবেলার কটা বছর এখানেই কেটেছে বিনুর। রাস্তায় গ্যাসের বাতি জ্বলছে। দু’ধারে বাড়িগুলোতেও প্রচুর আলো। পাড়াটা যতখানি চেনা লাগছে, তার চেয়ে ঢের বেশি অচেনা। মনে পড়ছে, অনেক ফাঁকা জায়গা ছিল এখানে। এখন শুধুই বাড়ি। পাঁচ ফুট খোলা জায়গাও কোথাও পড়ে নেই।
জাতিস্মরের মতো খুঁজে খুঁজে তাদের তেতলা বাড়িটা বার করে ফেলল বিনু। সঙ্গে সঙ্গে বুকের ভেতরটা ছাঁত করে উঠল।
পুরো বাড়িটা অন্ধকার, ভূতের মতো দাঁড়িয়ে আছে। কোথাও এক ফোঁটা আলো নেই। দরজা জানালা বন্ধ। সদর দরজায় তিনটে প্রকাণ্ড তালা ঝুলছে। অর্থাৎ আজ এ বাড়ির অধিবাসীটির সঙ্গে দেখা হওয়ার আদৌ কোনও সম্ভাবনা নেই।
হতশ্রান্ত বিনুর মাথা ঝিমঝিম করছিল। তবু শরীরের অবশিষ্ট শক্তিটুকু জড়ো করে পাশের বাড়িতে জিজ্ঞেস করে জানতে পারল, অবনীমোহন সপ্তাহ তিনেক আগে হরিদ্বার না উত্তরকাশী কোথায় যেন গেছেন। ফিরবেন তিন চার সপ্তাহ পর।
সুধারা থাকে টালিগঞ্জে। সুনীতিরা বিডন স্ট্রিটে। টালিগঞ্জে আগে কখনও যায় নি বিনু। অচেনা জায়গা। তুলনায় বিডন স্ট্রিট পরিচিত। একবার সেখানে গেছে। এলাকাটা তার মোটামুটি মনে আছে।
বিধ্বস্ত বিনু কোচোয়ানকে বিডন স্ট্রিট যাবার কথা বলতে সে জানালো, শিয়ালদা থেকে এতটা রাস্তা দৌড়ে এসে ঘোড়াটা বহুত থকে গেছে। তাকে খানিকক্ষণ জিরোতে দিতে হবে। তারপর দানাপানি খেয়ে চাঙ্গা হলে ফের সওয়ারি নিয়ে ছুটবার মতো তাকত পাবে। এত রাতে নিরীহ জানোয়ারটাকে কষ্ট দেবার ইচ্ছা ছিল না তার। নেহাত বাবুসাহেব আর বিবিজি মুশকিলে পড়েছেন, তাই তখলিফ হলেও নিয়ে যাবে। তবে এবার কেরায়া দিতে হবে তিরিশ টাকা। অর্থাৎ বিশ আর তিরিশ মিলিয়ে পঞ্চাশটা টাকা কোচোয়ানকে গুনে দিতে হবে।
না দিয়ে উপায়ই বা কী। আধ ঘন্টা বিশ্রামের পর ঘোড়াকে শুকনো ছোলা, ভেলিগুড় আর প্রচুর জল খাইয়ে আবার দৌড় শুরু হল।
.
বিডন স্ট্রিটে বিনুরা যখন সুনীতিদের বাড়ি পৌঁছল, এগারটা বেজে গেছে।
গাড়ি-বারান্দাওলা বেশ বড় বাড়ি সুনীতিদের। সামনে পেছনে বাগান। রাস্তার দিকে নিচু লোহার গেট। ঘরে ঘরে আলো দেখা যাচ্ছে। বাইরেও জোরালো আলো জ্বলছে। নিশ্চিন্ত হওয়া গেল, রাত হলেও এখনও সবাই জেগে আছে, ঘুমিয়ে পড়লে ডেকে তুলতে হত।
এ বাড়িতে আগে একবারই এসেছে বিনু। বিয়ের পর হেমনাথ আর অবনীমোহনের সঙ্গে এসে সুনীতিদের এখানে পৌঁছে দিয়ে গিয়েছিল। কয়েকদিন থেকেও গেছে।
ভাড়া মিটিয়ে ঝিনুককে নিয়ে গেট খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ল বিনু। বাগানের পাশ দিয়ে সুরকির রাস্তা ধরে গাড়িবারান্দার তলায় চলে এল। এখানে শ্বেত পাথরের সাতটা সিঁড়ি। ওপরে উঠলে থামওলা চৌকোমতো বিরাট চত্বর। সেটার ডান পাশে কারুকাজ করা মস্ত দরজা।
