রাজদিয়ার মোটামুটি একটা রূপরেখা পাওয়া গেল। হেমনাথ আরও কী বলতে যাচ্ছিলেন, বিনু আস্তে করে ডাকল, দাদু–
হেমনাথ ফিরে তাকালেন কী বলছ দাদাভাই?
বলবে কি বলবে না, খানিক ভেবে নিল বিনু। তারপর দ্বিধান্বিত সুরে জিজ্ঞেস করল, ঝিনুকদের বাড়ি কোথায়?
খানিকটা দূরে। ওই ওদিকে– সামনে আঙুল বাড়িয়ে দিলেন হেমনাথ।
বিনু চুপ করে রইল।
হেমনাথ আবার বললেন, ভাল কথা মনে করিয়ে দিয়েছ দাদাভাই। কাছাকাছি যখন এসেই পড়েছি, চল ওদের একটু খোঁজ নিয়ে যাই।
বিনুর খুব ইচ্ছা হচ্ছিল ঝিনুকদের বাড়ি যায়। ঝিনুক মাছের ভাগ নিয়ে, রসগোল্লার ভাগ নিয়ে, দাদু-দিদার আদরের ভাগ নিয়ে তার সঙ্গে হিংসে করেছিল–সে কথা মনে করে রাখে নি বিনু। তার যা মনে পড়ছিল সেটা হল ঝিনুকের দুঃখ।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঝিনুকদের বাড়ি যাওয়া হল না। কয়েক পা যাবার পর হঠাৎ কে যেন চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে ডাকতে লাগল, হেমদাদা—হেমদাদা–
হেমনাথ থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন, দেখাদেখি বিনুরাও থামল।
একটু দুরে ঝাউগাছের ফাঁকে হলুদ রঙের দোতলা বাড়ি। সামনের দিকে চমৎকার ফুলের বাগান, বাঁশের বেড়া দিয়ে বাগানখানি ঘেরা। যাতায়াতের জন্য কাঠের ছোট একটি গেট।
গেটের কাছে হেমনাথের সমবয়সী কি দু’চার বছরের ছোট একটি বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে ছিলেন। হেমনাথের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই তিনি হাতছানি দিলেন।
পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলেন হেমনাথ, বিনুও সঙ্গে সঙ্গে গেল। অবনীমোহনরা অবশ্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে রইলেন।
কাছে আসতেই উচ্ছ্বসিত খুশির গলায় বৃদ্ধ বললেন, শিশিররা এসেছে।
বৃদ্ধের উচ্ছ্বাস এবং আনন্দ হেমনাথের স্বরেও যেন উছলে পড়ল। বললেন, তাই নাকি? কবে?
পরশুর স্টিমারে।
কেমন আছে সব?
ভাল। বলতে বলতে সচেতন হলেন যেন বৃদ্ধ। বিনুর দিকে তাকিয়ে শুধোলেন, এটি কে হেমদাদা?
হেমনাথ বললেন, নাতি।
নাতি! বৃদ্ধ একটু যেন অবাকই হলেন।
হেমনাথ বললেন, হ্যাঁ, আমার ভাগনীর ছেলে। অবনীমোহনদের দেখিয়ে বললেন, ওই যে জামাই আর দুই নাতনী।
বৃদ্ধ এবার ব্যস্ত হয়ে পড়লেন, ওদের ডাকো হেমদাদা। তুমি ডাকবে কেন, আমিই ডেকে আনছি। তিনি পা বাড়িয়ে দিলেন।
হেমনাথ বললেন, এখন থাক রামকেশব–
বৃদ্ধের নাম তা হলে রামকেশব। তিনি বললেন, তাই কখনও হয়, নাতি-নাতিনী-জামাই নিয়ে ঘরের দরজা পর্যন্ত আসবে, ভেতরে ঢুকবে না, প্রাণ থাকতে আমি তা হতে দেব না।
রামকেশব ছুটে গিয়ে অবনীমোহনদের সঙ্গে করে নিয়ে এলেন। তারপর সাদরে সবাইকে বাড়ির ভেতরে নিয়ে গেলেন।
সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠতে উঠতে রামকেশব হইচই বাধিয়ে দিলেন, কই গো, কোথায় গেলে সব–শিশির, বৌমা–দেখ দেখ, কাদের নিয়ে এসেছি।
একজন সধবা প্রৌঢ়া-কপালে ডগডগে সিঁদুরের টিপ, পিঠময় কাঁচাপাকা চুলের স্তূপ, পরনে খয়েরি-পাড় শাড়ি, স্নেহলতার সমবয়সীই হবেন–ডান পাশের একখানা ঘর থেকে বেরিয়ে রামকেশবের সঙ্গে নতুন মানুষ দেখে খানিক অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন।
রামকেশব বললেন, হেমদাদার ভাগনীজামাই আর নাতি-নাতনী
তাড়াতাড়ি কপাল পর্যন্ত ঘোমটা টেনে সস্নেহে, মৃদু স্বরে প্রৌঢ়া ডাকলেন, এস দাদা দিদিরা–
রামকেশব শুধোলেন, শিশির, বৌমা–ওরা সব কোথায়?
দক্ষিণের ঘরে।
একটু ভেবে রামকেশব বললেন, আমরা বরং দক্ষিণের ঘরেই যাই। তুমি এদের জন্যে– বলতে বলতে তিনি থেমে গেলেন।
ইঙ্গিতটা বুঝতে পারলেন প্রৌঢ়া। অতিথিদের আপ্যায়নের কথা বলেছেন রামকেশব। তিনি বললেন, ঠিক আছে।
রামকেশবের সঙ্গে দক্ষিণের ঘরে এসে দেখা গেল, একটি সাতাশ আটাশ বছরের সুপুরুষ তরুণকে ঘিরে আসর বসেছে। লোকজন বেশি নেই, আধ-প্রৌঢ় একজন ভদ্রলোক, বছর বার’র একটি মেয়ে, সতের আঠার বছরের একটি তরুণী আর পঁয়ত্রিশ ছত্রিশ বছরের এক মহিলা-সব মিলিয়ে পাঁচজন। মহিলা তরুণী এবং ছোট মেয়েটি এমন সাজগোজ আরা প্রসাধন করে বসে আছে যা চোখে বেঁধে। তাদের জামাকাপড় থেকে সেন্টের গন্ধ চারদিকে ভেসে বেড়াচ্ছে।
তরুণটি হাত-পা-মাথা নেড়ে রোমাঞ্চকর কিছু বলছে, আর মুগ্ধ বিস্ময়ে সবাই শুনছে। রামকেশবরা ঘরে ঢুকতেই গল্প থেমে গেল।
আধা প্রৌঢ় সেই ভদ্রলোকটি তাড়াতাড়ি উঠে এসে হেমনাথকে প্রণাম করলেন।
হেমনাথ বললেন, কেমন আছিস শিশির?
ভাল। শিশির বললেন, আপনি ভাল আছেন তো? জ্যাঠাইমা কেমন আছেন?
আমরা গাঁইয়া মানুষ, কখনও খারাপ থাকি না। তোমরা শহরের লোক, পিপল অফ দি মেট্রোপলিস। তোমাদের আজ পেট ভুটভাট, কাল কান কটকট, পরশু বুক ধড়ফড়। আমাদের ওসব বালাই নেই। সে যাক, রামকেশবের কাছে শুনলাম, পরশু তোরা এসেছিস। কাল সারাটা দিন গেছে মাঝখানে, একবার আমাদের ওখানে যেতে পার নি?
অপরাধীর মতো মুখ করে শিশির বললেন, আজ যাব ভেবেছিলাম।
শিশিরের পর সেই মহিলাটি এসে প্রণাম করলেন। হেমনাথ বললেন, বেঁচে থাকো স্মৃতিরেখা। বলতে নেই, তোমার স্বাস্থ্য গেল বারের চাইতে অনেক ভাল হয়েছে। শিশিরটা তো চিরকালের খ্যাপা বাউল, সংসারের কোনও দিকে ওর খেয়াল নেই। যাক, তোমার দিকে ও এবার নজর দিয়েছে দেখছি।
জানা গেল, মহিলার নাম স্মৃতিরেখা এবং তিনি শিশিরের স্ত্রী।
স্মৃতিরেখার পর কম বয়সের মেয়েটি আর তরুণীটি এসে প্রণাম করল। দু’জনকে পায়ের কাছ থেকে তুলে হেমনাথ বললেন, আমার রুমাদিদি ঝুমাদিদি না?
