সমস্ত এলাকাটা নরককুণ্ড। যত্রযত্র গু মুত, দলা দলা কফ, ডাঁই-করা এঁটো শালপাতা। এখানকার বাতাসে থম-ধরা স্থায়ী দুর্গন্ধ। পেট একেবারে গুলিয়ে ওঠে।
দম-আটকানো আবহাওয়ার ভেতর দিয়ে পথ করে করে এগিয়ে যাচ্ছিল বিনু আর ঝিনুক। পশ্চিম দিকের শেষ মাথায় কাতার দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রিকশা আর ঘোড়ার গাড়ি। বিনু ঠিক করে ফেলেছে, একটা ঘোড়ার গাড়ি নিয়ে ভবানীপুরে অবনীমোহনের কাছে যাবে।
হঠাৎ দেখা গেল, খানিক দূরে তিন চারটে লোক এক নাগাড়ে চেঁচিয়ে যাচ্ছে, পাকিস্থানি টাকা পালটাবেন, পাকিস্থানি টাকা পালটাবেন–
বিনুর মনে পড়ল, তার কাছে ভারতীয় টাকা নেই। যা আছে তা হল শ’আটেক টাকার মতো পাকিস্তানি নোট আর কিছু খুচররা। এখানে সেগুলো অচল। রাজদিয়ায় থাকতেই সে শুনেছিল, শিয়ালদায় কিছু দালাল চড়া বাট্টা দিলে পাকিস্তানি টাকার বদলে ইন্ডিয়ান টাকা দেয়। ভাগ্য ভাল, দালালগুলোর চেঁচানি কানে এসেছিল। নইলে পরে ঘোড়ার গাড়ির ভাড়া মেটাতে মুশকিল হত।
আটশ’ টাকা বদলে সাড়ে ছ’শ ভারতীয় টাকা পাওয়া গেল। পাকিস্তানি টাকার দাম কম। কত কম, বিনুর ধারণা নেই। দালালটা যে ঠকাল, মোটামুটি টের পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু এখন আর কিছু করার নেই।
টাকা পকেটে পুরে ক’পা এগিয়েছে, কে যেন নাম ধরে ব্যগ্রভাবে ডেকে উঠল, বিনু—বিনু– এই যে, এই দিকে–
এই প্রায়-অচেনা শহরের রেল স্টেশনে কে তাকে ডাকতে পারে? চমকে এধারে ওধারে তাকাতে চোখে পড়ল, ইটের বাউন্ডারি দেওয়া চৌকো একটা খোপের ভেতর থেকে একজন হাত নাড়ছে।
দেখামাত্র চিনতে পারল বিনু। পতিতপাবন। ওদের বাড়ি ছিল রাজদিয়ার লাগোয়া গ্রাম। তাজহাটিতে। রাজদিয়া স্কুলে তার সঙ্গে পড়ত। বয়সে কম করে দশ বছরের বড়। একবারে সে কখনও প্রমোশন পায়নি। দু’তিন বছর ফেল করে তবে পরের ক্লাসে উঠত। স্কুলে পড়তে পড়তেই তার বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। মনে আছে, প্রথম যেদিন বিনু রাজদিয়া হাইস্কুলে ক্লাস করতে যায়, টিফিনের সময় পতিতপাবন বলেছিল, তাকে চালাক বানিয়ে দেবে। অর্থাৎ পাকিয়ে ছাড়বে। অবশ্য কড়া অ্যাসিস্টান্ট হেডমাস্টার আশু দত্তর জন্য তার মনস্কামনা পূর্ণ হয়নি।
সেই পতিতপাবনের সঙ্গে শিয়ালদায় দেখা হয়ে যাবে, কে ভাবতে পেরেছিল! বিনু পায়ে পায়ে এগিয়ে যায়। ততক্ষণে পতিতপাবনও উঠে দাঁড়িয়েছে। বিনু লক্ষ করল, তিনটে নানা বয়সের বাচ্চা, একটি সদ্য যুবতী আর আধ ঘোমটা দেওয়া একটি বউ বসে আছে। নিশ্চয়ই পতিতপাবনের স্ত্রী এবং ছেলেমেয়ে।
পতিতপাবন জিজ্ঞেস করল, আইজের ট্রেনে আইলা বুঝিন?
মাথা সামান্য কাত করে বিনু, হ্যাঁ। তোমরা কবে এসেছ?
মাস দুই।
সেই থেকে এখানেই আছ?
হ। আর কই যামু? এই দ্যাশের কিছুই তো চিনি না। মাঝে মইদ্যে অপিসাররা আইসা কয়, রিফুজি কেম্পে নিয়া যাইব।
কবে নেবে?
হেরাই (তারাই) জানে।
ষাট কানি দোফসলা সরেস ধানজমি ছিল পতিতপাবনদের। ছিল ঢেউ টিনের ছাউনি দেওয়া সাতাশের বন্দের বড় বড় ঘর, সাত আটটা দুধেল গাই, বাগবাগিচা, তিন চারটে দীঘির মতো পুকুর। অজস্র ধান, প্রচুর মাছ, অঢেল দুধ। তারা কিনা এই স্টেশন চত্বরে নরকের মধ্যে বসে আছে!
কথা বলতে বলতে দু’একবার ঝিনুকের দিকে তাকাচ্ছিল পতিতপাবন। কৌতূহল থাকলেও কোনও প্রশ্ন করল না।
পতিতপাবন বলল, আমাগো তাজহাটি ছাড়াও চাইর পাশের গেরামগুলা থিকা মেলা মানুষ এই পারে আইছে। তাগো অনেকেই শিয়ালদা ইস্টিশানে আছে।
বিনু বলল, তাই নাকি?
হ। টেরেনে হয়রান হইয়া আসছ। তোমারে আর আটকামু না। তোমার বাবায় আর বইনেরা তো কইলকাতায় থাকে। কার কাছে উঠবা?
রাজদিয়া এবং তার চারপাশের গ্রামগুলোর সবাই সবার নাড়িনক্ষত্রের খবর রাখত। পতিতপাবনও বিনুদের কথা জানে। দেশভাগের পর ওই অঞ্চলের মানুষজন ভিটেমাটি ফেলে শত দিকে ছিটকে পড়ছে। কেউ যাচ্ছে আগরতলায়, কেউ আসামে, বেশির ভাগই অবশ্য পশ্চিম বাংলায়। একজনের সঙ্গে অন্যজনের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। আর কিছুদিন বাদে কেউ কাউকে মনেও রাখবে না। যারা পাশাপাশি পুরুষানুক্রমে বাস করে এসেছে তাদের মুখগুলি বিস্মৃতির আঁধারে ক্রমশ লিীন, হয়ে যাবে।
বিনু বলল, বাবার কাছে উঠব।
পতিতপাবন বলে, তভু তো তোমার এইখানে একখান জাগা (জায়গা) আছে। পোলামাইয়া বউ লইয়া আমি এক্কেরে সমুন্দুরে পড়ছি। শিয়ালদার ইস্টিশানে কুত্তা বিলাইর (বেড়াল) লাখান বাকি জনম কাইটা যাইব কিনা, ক্যাঠা জানে। কুনো আশা-ভরসা দেখি না।
একই আক্ষেপ, একই রকম শঙ্কা ভুবন দাস আর হরিন্দর। ওদের দুজনেরই বা কেন, যারা পূর্ব পাকিস্তান থেকে সর্বস্ব খুইয়ে এপারে চলে এসেছে, ইন্ডিয়ায় যাদের আপনজন কেউ নেই, তাদের সবার একই সমস্যা।
পতিতপাবন ফের বলল, রাইত হইছে মেলা (অনেক)। যাও গা। বাবারে কইও যদিন আমার লেইগা কিছু কইরা দিতে পারেন। যাতে মাইনষের লাখান বাচতে পারি।
বিনু বলল, নিশ্চয়ই বলব। সে আর দাঁড়াল না। ঝিনুককে সঙ্গে করে যেখানে ঘোড়ার গাড়িগুলো দাঁড়িয়ে আছে সেখানে চলে এল। তারা যাবে ভবানীপুরে, পূর্ণ সিনেমার কাছে প্রিয়নাথ মল্লিক রোডে। একটা কোচোয়ানকে সে কথা জানাতে ভাড়া হাঁকল বিশ টাকা।
বিনু বুঝতে পারছে, লোকটা অনেক বেশি চাইছে। কিন্তু খিদেয়, তেষ্টায়, রাস্তার ধকলে জীবনীশক্তি ক্ষয়ে ক্ষয়ে শেষ হয়ে এসেছে। স্নায়ুগুলো যেন ছিঁড়ে পড়বে। মাথার ভেতর হাজার ঝিঁঝি ডাকছে। লক্ষ করল, ঝিনুকও দাঁড়ািয় থাকতে পারছে না। সব কিছুর ওপর রামরতনের মৃত্যু দু’জনকে প্রচণ্ড ঝকানি দিয়ে গেছে। একটি শ্রদ্ধেয় মানুষের জীবনের অবসান কী মর্মান্তিকভাবেই না ঘটল!
