বিনুর শেষ কথাগুলো যেন শুনতে পাচ্ছিল না বিমল। আকস্মিক আঘাতে শিয়ালদা স্টেশনের অজস্র আলো, অসংখ্য মানুষের শোরগোল মুহূর্তে ঝাঁপসা হয়ে যায়। টলতে টলতে পড়েই যেত, বিনু তাকে ধরে ফেলল। বলল, বিমলবাবু, ভেঙে পড়বেন না। নিজেকে শক্ত রাখুন। আপনার জেঠাইমা আর বোনেরা ডেডবডি নিয়ে বসে আছে। আপনি বিচলিত হয়ে পড়লে ওদের কে সান্ত্বনা দেবে?
বিমল জবাব দিল না। বালকের মতো আকুল হয়ে কিছুক্ষণ কাদল। তারপর চোখ মুছে ধরা গলায় বলল, চলুন–
যে চারটি নারী নিপ্রাণ মূর্তি হয়ে বসে ছিল, বিমলকে দেখে তারা ফের উতরোল কান্নায় ভেঙে পড়ে। সবার চোখ থেকে অবিরল জল ঝরে যায়।
কেঁদে কেঁদে গলা ভেঙে গিয়েছিল রামরতনের স্ত্রীর। বিকৃত স্বরে বৃদ্ধা বলতে লাগলেন, সব শ্যাষ হইয়া গেল রে বিমল। তর জ্যাঠার শরীলটাই আইল, পরানটা রাইখা আইল উই পারে।
তিন বোন কেঁদেই চলেছে। দুর্বোধ্য, জড়ানো গলায় যা বলছে সেই হাহাকারের একটি বর্ণও বোঝা যাচ্ছে না।
বৃদ্ধাকে জড়িয়ে ধরে খানিকক্ষণ বসে থাকে বিমল। সমানে বলতে থাকে, তুমি যদি এত অস্থির হও, আমাদের কে দেখবে? শান্ত হও জেঠিমা, শান্ত হও–
এদিকে মাইকে মুহুর্মুহু ঘোষণা হচ্ছিল, যে ছিন্নমূল মানুষদের এপারে আত্মীয়পরিজন নেই তারা ধীরে ধীরে সুশৃঙ্খলভাবে যেন ট্রেন থেকে নেমে আসে।
অধর ভুইমালী আর হরিন্দ বিনুকে বলল, আমাগো ডাক আইছে ছুটোবাবু। এই জনমে আর বুঝিন আপনের লগে দেখা হইব না।
বিনু বলল, নিশ্চয়ই হবে। তোমরা তো এখন শিয়ালদা স্টেশনেই থাক। দু’চারদিন পর এসে তোমাদের দেখে যাব।
লটবহর এবং বউ-বাচ্চা নিয়ে লোকজন নেমে যেতে থাকে। ক্রমশ কামরা ফাঁকা হয়ে যায়।
হঠাৎ বিনুর খেয়াল হল, তাদের নিয়ে যাবার জন্য কেউ আসেনি। না সুধা, না সুনীতি, না অবনীমোহন। ওঁরা এলে নিশ্চয়ই কামরায় কামরায় হাঁক দিয়ে যেতেন। রাত বাড়ছে। এই বিশাল মহানগর বিনুর প্রায় অচেনা। সেই কতকাল আগে, ছেলেবেলার কয়েকটা বছর এখানে কাটিয়েছে সে। তারপর এই আসা। সেদিনের সেই শহর এতকাল বাদে কি আর তেমনটাই আছে? ঝিনুককে নিয়ে এই রাত্রিবেলা তাকে বাবা কি বোনেদের কারোর ঠিকানা খুঁজে বার করতে হবে।
বিমল স্টেশনে আসায় একটা বিরাট দুর্ভাবনা মাথা থেকে নেমে গেছে। রামরতনদের সব দায়িত্ব এখন বিমলের। এবার বিনুর মুক্তি। যা করার বিমলই করবে। তবু এই শোকাবিহূল মানুষগুলোকে ফেলে রেখে চট করে কামরা থেকে নেমে যাওয়া সম্ভব হল না।
বিনু বিমলের পিঠে হাত রাখল। সে ঘুরে তাকাতেই নিচু গলায় বলল, আমার সঙ্গে একটু আসুন। দরকার আছে। চোখের ইশারায় ঝিনুককে তারপাশায় কেনা নতুন চাদর দুটো নিয়ে উঠে আসতে বলল।
প্ল্যাটফর্মে নেমে বিমল বলল, বলুন কী দরকার?
বিনু জানায়, গত দু’তিনটে দিন চরম আতঙ্কের মধ্যে কেটে গেছে তাদের। স্নান নেই, ঘুম নেই, ভাল করে খাওয়া নেই। তার ওপর রামরতনদের দায়। শরীর ভেঙেচুরে আসছে। কলকাতায় পৌঁছেও তার উৎকণ্ঠা শেষ হয়নি। চিঠি দেওয়া সত্ত্বেও কেউ তাদের নিতে আসেনি। এই রাত্রিবেলা তাকে একটা আশ্রয় খুঁজে বার করতে হবে। কিন্তু রামরতনের মৃতদেহের ব্যবস্থা করা এখনই প্রয়োজন। চলে যাবার আগে অলোকপ্রসাদ সেনের সঙ্গে সে বিমলের পরিচয় করিয়ে দিতে চায়। অফিসারটি নিশ্চয়ই বিমলকে সাহায্য করবেন।
বিমল বলল, তা হলে তো খুব ভাল হয়। এই অবস্থায় কী করব, ভেবে পাচ্ছিলাম না।
সরকারি কর্মচারীদের জিজ্ঞেস করে করে অলোকপ্রসাদের খোঁজ পাওয়া গেল। তিনি প্ল্যাটফর্মেই ছিলেন। মাঝবয়সী, মাঝারি হাইট, সৌম্য চেহারা। বিনু সীমান্তের সেই অফিসারটির চিঠি তাকে দিয়ে নিজের এবং বিমলের পরিচয় দিল।
চিঠিটা পড়ার পর ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়লেন অলোকপ্রসাদ। জিজ্ঞেস করলেন, ডেডবডি কি এখনও কম্পার্টমেন্টে রয়েছে?
বিনু এবং বিমল জানায়, হ্যাঁ।
আমি এখনই সব অ্যারেঞ্জমেন্ট করছি।
বিনু কুণ্ঠিত মুখে বিমলকে বলল, এ সময় আপনার পাশে থাকতে পারলে ভাল হত। কিন্তু আমার সমস্যার কথা তো শুনেছেন।
বিমল আস্তে মাথা নাড়ে, হ্যাঁ। আপনাকে আর আটকে রাখব না।
আপনার ঠিকানা আমি জানি। জেঠাইমা আর বোনেদের বলবেন, পরে একদিন গিয়ে ওঁদের সঙ্গে দেখা করে আসব।
নিশ্চয়ই আসবেন। আমাদের যা উপকার আপনি করেছেন–
তাকে থামিয়ে দিয়ে বিনু বলল, একসঙ্গে দেশ ছেড়ে এসেছি। এটুকু তো করতেই হয়। আচ্ছা চলি। বলে আর দাঁড়াল না। ঝিনুক সঙ্গে এসেছিল। তাকে নিয়ে ভিড় ঠেলে ঠেলে সামনে এগিয়ে যেতে লাগল। অন্যমনস্কের মতো একবার ভাবল, রামরতনের মৃতদেহ দাহ করে কখন ওরা বাড়ি ফিরবে, কে জানে।
.
৩.১৭
প্ল্যাটফর্মের বাইরে আসতে দেখা গেল, একই দৃশ্য। বিশাল চত্বর জুড়ে থিকথিকে ভিড়। ইটের সীমানা ঘেরা আট-দশ ফুট জায়গায় এক একটা পরিবার। অগুনতি ফেস্টুন চারদিকে টাঙানো। সেগুলোতে নানা স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের নাম। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, শরণার্থীদের জন্য যে সরকারি ত্রাণব্যবস্থা করা হয়েছে তা যথেষ্ট নয়। বেসরকারি অর্গানাইজেশনগুলোকেও তাদের সঙ্গে হাত মেলাতে হয়েছে।
যেদিকে তাকানো যায়, শুধু মানুষ আর মানুষ। এত মানুষ ঠাসাঠাসি করে থাকলে যা হয়, তুমুল হট্টগোল, ঝগড়াঝাটি, কুৎসিত খিস্তিখেউড়।
