গোটা স্টেশন জুড়ে প্রচুর আলো জ্বলছে। রয়েছে বন্দুক হাতে বিরাট এক পুলিশ বাহিনী। প্যান্ট শার্ট পরা কিছু লোকজনও রয়েছে। তাদের ব্যস্ততা দেখে আন্দাজ করা যাচ্ছে, ওঁরা সরকারি কর্মচারী। দু’চারজন নিশ্চয়ই অফিসার, বাদবাকি তাদের সহকারী।
মাইকে ঘোষণা করা হচ্ছিল, যে সব উদ্বাস্তু এই ট্রেনে এসেছে, তাদের আশ্রয় দেবার মতো কোনও আত্মীয়স্বজন যদি কলকাতায় বা পশ্চিমবঙ্গে না থাকে, তারা যেন আপাতত শিয়ালদা স্টেশনেই থেকে যায়। গভর্নমেন্ট থেকে পরে তাদের ব্যবস্থা করা হবে।
ট্রেনের জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল বিনু। যাতায়াতের জন্য প্ল্যাটফর্মের সিকিভাগ ছেড়ে বাকি অংশটায় কত যে মানুষ বসে আছে তার লেখাজোখা নেই। সাত আট ফুটের মতো জায়গা ইট পেতে সীমানা ঠিক করে নিয়েছে এক একটা ফ্যামিলি। তার ভেতর গাদাগাদি করে আছে বাচ্চাকাচ্চা, স্বামী-স্ত্রী এবং ডাই-করা লটবহর। এইরকম অসংখ্য খোপ, অগুনতি পরিবার। দেখামাত্র টের পাওয়া যায়, ওরাও ভিটেমাটি খুইয়ে বিনুদের আগেই এখানে চলে এসেছে। শিয়ালদা স্টেশনের প্ল্যাটফর্মই এখন তাদের ঠিকানা।
বিনুর চকিতে মনে হল, আজ যারা তার সঙ্গে এই ট্রেনে এসেছে তাদের নিরানব্বই ভাগই এই স্টেশনে থেকে যাবে। কালও ট্রেন বোঝাই হয়ে আসবে, আসবে পরশুও। আসতে থাকবে দিনের পর দিন। হাজারে হাজারে। এই স্টেশনের চত্বরে কত মানুষের জায়গা হবে?
কিন্তু এসব ভাবনা ছাপিয়ে যে প্রশ্নগুলো মাথার ওপর পাষাণভারের মতো চেপে আছে তা হল, অবনীমোহন আর সুধা সুনীতিরা কি তাকে নিয়ে যাবার জন্য স্টেশনে এসেছে? তার চেয়েও দুশ্চিন্তার ব্যাপার, রামরতনের ভাইপো বিমল এসেছে কিনা।
মাইকে অনবরত একই ঘোষণা চলছিল। এই ট্রেনে যে উদ্বাস্তুরা এসেছে, তাদের যদি
পাশ থেকে হরিন্দ উদ্বেগের সুরে বলল, ছুটোবাবু, শুনলেন নি, কী কইতে আছে? আপনের দুই বইন আর বাবায় কইলকাতায় আছে। আপনের চিন্তা নাই। আমাগো এই ইস্টিশান পইড়া থাকতে হইব।
ভুবন দাসও এই কামরায় ছিল। সে বলল, কপালে কী যে আছে! তার অটুট বিশ্বাস ছিল, ইন্ডিয়ায় সবাই তাদের জন্য হাত বাড়িয়ে রেখেছে। সেখানে জমিজমা, ডোল-ভরা ধান, বাড়িঘর, ফলবাগিচা, সমস্ত সাজানো রয়েছে। তারা ভারতে এলে তাদের হাতে সেসব তুলে দেওয়া হবে। কিন্তু শিয়ালদা স্টেশনে ট্রেন থেকে নামার আগেই স্বপ্নভঙ্গ ঘটে গেল। চরম হতাশাগ্রস্ত ভুবন দাস জোরে জোরে মাথা নাড়তে থাকে।
এখন হা-হুতাশ শোনার সময় নেই। আগে যা দরকার তা হল বিমলের খোঁজ নেওয়া, নইলে অলোকপ্রসাদ সেনের সঙ্গে দেখা করা। একবার বাঁ দিকে তাকাল বিনু। রামরতনের মৃতদেহ ঘিরে একইভাবে বসে আছেন তার স্ত্রী এবং মেয়েরা। কেউ আর কাঁদছে না। যেন চার পাথরপ্রতিমা। তাদের পাশে ঠায় বসে আছে ঝিনুক। নীরব, বিহ্বল।
বিনু উঠে দাঁড়ায়। রামরতনের স্ত্রীকে বলে, বিমলবাবু এলেন কিনা, খোঁজখবর নিয়ে আসি। আপনারা একটু অপেক্ষা করুন।
বৃদ্ধা উত্তর দিলেন না। আচ্ছন্নের মতো স্বামীর মৃতদেহের দিকে তাকিয়ে বসে রইলেন।
বিনু কম্পার্টমেন্ট থেকে নেমে পড়ে। চারদিকে তুমুল শোরগোল চলছে। আগে যে উদ্বাস্তুরা এসে প্ল্যাটফর্ম জুড়ে বসে ছিল তারা হইচই বাধিয়ে দিয়েছে। যারা নতুন এল, তাদের কেউ ট্রেন থেকে নামেনি। কী করবে বুঝতে না পেরে অধীর হয়ে উঠেছে। প্ল্যাটফর্মে যাকেই দেখছে, পুলিশ কনস্টেবল থেকে অফিসার এবং সাধারণ স্তরের সরকারি কর্মচারী, সবাইকে ডেকে ডেকে জিজ্ঞেস করছে, বাবুরা, অহন আমরা কী করুম? আর কতক্ষণ গাড়ির ভিতরে বইসা থাকুম? শরীলে আর দিতে আছে না।
অফিসাররা যেখানে রয়েছেন সেদিকে যেতে যেতে হঠাৎ চোখে পড়ল, একটি লোক, চল্লিশ বেয়াল্লিশের মতো বয়স, পরনে ধুতি শার্ট, প্রতিটি কামরার জানালায় মুখ বাড়িয়ে ডাকাডাকি করতে করতে আসছে।
প্রথমটা বোঝা যাচ্ছিল না, কাছাকাছি আসতে পরিষ্কার শোনা গেল, জেঠু জেঠু, বাসন্তীদিদি, মায়া–ছায়া।
বাসন্তী রামরতনের বিধবা মেয়ে। তার নাম বিনু আগেই জেনেছে। নিঃসন্দেহে এই লোকটা বিমল। রামরতনের চিঠি পেয়ে সে তাদের নিতে এসেছে।
বিনু একরকম দৌড়েই লোকটার কাছে চলে আসে। যদিও সংশয় নেই, তবু পুরোপুরি নিশ্চিত হবার জন্য জিজ্ঞেস করে, আপনি কি বিমলবাবু?
লোকটা অবাক দৃষ্টিতে কয়েক পলক তাকিয়ে থাকে। তারপর বলে, শ্যা। কিন্তু আপনাকে তো চিনতে পারলাম না।
চেনার কথা নয়। আমি ইস্ট পাকিস্তান থেকে এই ট্রেনটায় এসেছি। রামরতন গাঙ্গুলি নিশ্চয়ই আপনার জেঠামশাই?
আপনি জানলেন কী করে?
কিভাবে রামরতনের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে এবং তাঁর মুখেই বিমলের কথা শুনেছে, ইত্যাদি জানিয়ে বিনু বলল, আপনাকে একটা খবর দেবার আছে, কিন্তু কেমন করে দেব বুঝতে পারছি না।
বিমল অধীরভাবে বলল, পরে আপনার খবর শোনা যাবে। জেঠামশাইরা যে কম্পার্টমেন্টে আছেন, আমাকে সেখানে নিয়ে চলুন।
না।
মানে?
আগে আমার খরবটা আপনার শোনা দরকার।
বিমূঢ়র মতো অচেনা যুবকটির দিকে তাকিয়ে থাকে বিমল।
বিনু বিমলের চোখের দিকে তাকাতে পারছিল না। নতমুখে বলল, খুব দুঃসংবাদ। ট্রেনে আসতে আসতে আপনার জেঠামশাইয়ের মৃত্যু হয়েছে। ডেডবডি কম্পার্টমেন্টে রয়েছে। আপনি ওঁদের নিতে আসতে পারেন, তাই ট্রেন থেকে নেমে আপনার খোঁজ করছিলাম। বাসন্তীদেবীর নাম করে ডাকতেই বুঝতে পারলাম, আপনি বিমলবাবু।
