বিনু লক্ষ করল, সিনেমার এই কলাকুশলীরা গোয়ালন্দের সেই দলটার মতো সাত সমুদ্র তের নদী পেরিয়ে আসেনি। তারা এই উপমহাদেশেরই লোক। ওদের চেহারা দেখে, কথা শুনে মনে হয়, নিঃসন্দেহে বাঙালি। বিশ শতকের মাঝামাঝি লক্ষ লক্ষ মানুষের দেশত্যাগের মর্মান্তিক ইতিহাস তারা ছবিতে ধরে রাখছে।
অনেককে বর্ডার স্লিপ দেবার পর একজন অফিসার বিনুকে ডাকলেন। বাঁধা নিয়মে তার নাম টাম জেনে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, সঙ্গে আর কেউ আছে?
বিনু ঝিনুকের কথা বলল।
আপনার স্ত্রী? অফিসার জানতে চাইলেন।
বিব্রত বোধ করে বিনু। একটু ভেবে বলে, না। আমার আত্মীয়। দাঙ্গায় ওর মা-বাবা মারা গেছেন।
ঝিনুক সম্পর্কে আর কোনও প্রশ্ন না করে অফিসার বললেন, কলকাতায় আপনাদের কেউ আছেন?
আছেন। আমার দুই দিদি আর বাবা।
তা হলে আপনাদের রিলিফ কাম্পে ওঠার দরকার নেই।
রিলিফ ক্যাম্প?
অফিসার বিশদভাবে বুঝিয়ে দিলেন। যারা সর্বস্ব খুইয়ে সীমান্তের ওপার থেকে পশ্চিম বাংলায় চলে আসছে, তাদের আশ্রয় দেবার মতো আত্মীয়পরিজন যদি এখানে না থাকে, এই ধরনের মানুষজনকে কলকাতার আশেপাশে বা বিভিন্ন জেলায় ত্রাণ-শিবিরে পাঠানো হচ্ছে। যতদিন না সরকার পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করছে, বা এরা নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারছে, শিবিরেই তাদের থাকতে হবে। সরকারই এদের যাবতীয় দায়িত্ব পালন করবে।
অফিসার বললেন, আপনার তো সে সমস্যা নেই। বাবা আর দিদিরা যখন আছেন, তাদের কারোর কাছে উঠতে পারবেন। ক্যাম্পে যাবার দরকার হবে না।
আস্তে মাথা নাড়ে বিনু, না।
এই বর্ডার স্লিপ দু’টো রাখুন– বিনু আর ঝিনুকের নাম লিখে দু’টো ছাপানো কাগজ দিলেন অফিসার।
বিনু বলল, আমরা তো রিলিফ ক্যাম্পে উঠছি না। এ দুটো দিয়ে কী হবে?
আপনারা যে জেনুইন রিফিউজি, বর্ডারের ওপার থেকে ইন্ডিয়ায় এসেছেন, এই স্লিপ তার ডকুমেন্ট। একটা খবর কি আপনি জানেন?
কী?
সরকারি চাকরিবাকরির ব্যাপারে রিফিউজিদের অনেক প্রেফারেন্স দেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে সারভিস করতে চাইলে এ দু’টো কাজে লাগবে। যত্ন করে রাখবেন।
সীমান্তের ওধারে একজন সহৃদয় তরুণ বাঙালি অফিসারকে দেখে এসেছে বিনু। এ পারেও তেমন একজনকে পাওয়া গেল। সহানুভূতিশীল, শুভাকাঙ্ক্ষী। তবে এধারের অফিসারটি ওপারের অফিসারের মতো যুবক নন। মধ্যবয়সী।
বিনুর সঙ্গে কথা শেষ হয়ে গিয়েছিল। অফিসারটি অন্য একজন উদ্বাস্তুকে ডাকতে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ রামরতনদের কথা মনে পড়ে গেল তার। ব্যস্তভাবে বলল, স্যার, একটা ফ্যামিলি আমাদের সঙ্গে এসেছে। তাদের নাম গভর্নমেন্ট রেকর্ডে থাকা দরকার।
নিশ্চয়ই। তারা কোথায়?
ট্রেনের কম্পার্টমেন্টে রয়েছে।
ওদের তাড়াতাড়ি পাঠিয়ে দিন।
ওরা আসতে পারবে না।
কেন?
রামরতনদের তারপাশা স্টিমারঘাটে পরিচয় হবার পর একসঙ্গে গোয়ালন্দে আসা, তারপর ট্রেনে তার মৃত্যু, সংক্ষেপে সব জানিয়ে দিয়ে বিনু বলল, ওঁর স্ত্রী আর মেয়েরা ডেডবডি আগলে কান্নাকাটি করছে। কী করে নেমে আসবে?
অফিসার কিছুক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে থাকেন। তারপর বিষণ্ণ গলায় বলেন, না না, ওঁদের আসার দরকার নেই। আমি আপনার সঙ্গে একজনকে পাঠিয়ে দিচ্ছি। সে ওঁদের নাম টাম রেকর্ড করে বর্ডার স্লিপ দিয়ে আসবে। কিন্তু–
কী?
ডেডবডিটা নিয়ে তো ভীষণ সমস্যা হল।
হ্যাঁ। শিয়ালদায় গিয়ে যদি দেখি রামরতনবাবুর ভাইপো আসেননি, খুব বিপদে পড়ে যাব। ওঁদের ফেলেও চলে যেতে পারব না, অথচ কী করব বুঝে উঠতে পারছি না। স্যার, আপনি কি আমাকে এ ব্যাপারে সাহায্য করতে পারেন?
একটু চিন্তা করে অফিসার বললেন, ডেডবডি বেশিক্ষণ ফেলে রাখা যাবে না। পচন শুরু হয়ে যাবে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, বার্নিং ঘাটে নিয়ে যাওয়া দরকার। কিন্তু এখানে সেরকম কোনও ব্যবস্থা নেই। শিয়ালদায় আমাদের ডিপার্টমেন্টের একজন অফিসারকে চিঠি লিখে দিচ্ছি। যদি রামরতনবাবুর ভাইপো না আসেন, তাঁর সঙ্গে দেখা করবেন। ওঁর হেল্প নিশ্চয়ই পাবেন। দ্রুত চিঠি লিখে একটা খামে পুরে বিনুকে দিতে দিতে বললেন, খুব ভালমানুষ। ভেরি মাচ সিমপ্যাথেটিক টু দা রিফিউজিস। অনেক সময় নিজের এক্তিয়ারের বাইরে গিয়েও সাহায্য করেন।
খামের ওপর অফিসারের নাম লেখা আছে। অলোকপ্রসাদ সেন। বিনু জিজ্ঞেস করল, অলোকপ্রসাদবাবুকে যদি কোনও কারণে না পাওয়া যায়?
জোর দিয়ে অফিসারটি বললেন, নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে। আপনাদের ট্রেনটা যে যাচ্ছে, ওঁকে সে খবর পাঠানো হয়েছে। রিফিউজিদের রিসিভ করার জন্যে উনি শিয়ালদায় থাকবেন। তবে ধরুন হঠাৎ শরীর খারাপ হল, কি অন্য কোনও জরুরি কাজে অথরিটি ডেকে পাঠালেন, তা হলে ওঁর অ্যাসিস্টান্ট শুকদেব মালাকারের সঙ্গে দেখা করে আলোকপ্রসাদবাবুর চিঠিটা দেবেন, আমার কথাও বলবেন। আশা করি, কাজ হবে। অফিসার তার এক সহকারীকে বিনুর সঙ্গে পাঠিয়ে দিলেন। সে রামরতনের স্ত্রী এবং মেয়েদের নাম টাম লিখে, বর্ডার স্লিপ দিয়ে চলে গেল। আরও কিছুক্ষণ বাদে ট্রেন চলতে শুরু করল।
৩.১৬-২০ উদ্বাস্তুদের নিয়ে স্পেশাল ট্রেন
উদ্বাস্তুদের নিয়ে স্পেশাল ট্রেনটা একটানা ছুটতে পারছে না। মাঝে মাঝেই সিগনাল না পেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ছে। এইভাবে থেমে থেমে যখন শিয়ালদায় পৌঁছল, সন্ধে পার হয়ে গেছে।
