বিনু জিজ্ঞেস করল, কী কাণ্ড?
অধর বলল, উই শালারা তো আমারে চিনে না। অরা যায় ডাইলে ডাইলে, আমি যাই পাতায় পাতায়। দুই হাতের বুড়ো আঙুল নাচিয়ে নাচিয়ে বলতে লাগল, দিছি উই শালোগো এই আইঠা (বিচে) কলা চুষাইয়া।
উই শালাগো– বলতে কোন শালাদের বুড়ো আঙুল বা বিচে কলা চুষিয়েছে অধর ভুঁইমালী, বুঝতে পারল না বিনু। জানতে চাইল, কাদের কথা বলছ?
বিনুর কানে মুখটা প্রায় গুঁজে দিয়ে অধর বলল, উই পাকিস্থানী পুলিশ আর অগো (ওদের) অপসারগো।
ব্যাপারটা পরিষ্কার হল না। বিনুর চোখমুখ দেখে সেটা আঁচ করে নিয়ে অধর বলল, বোঝতে নি পারলেন বাবুমশয়?
না।
আমি আগেই শুনছিলাম, বারে (বর্ডারে) আইলে পাকিস্থানী পুলিশেরা মালপত্তর ঘাইটা দুইটা (ঘেঁটে) তল্লাশি তো করেই, মাইয়া মরদ কেওরে (কাউকে) বাদ দ্যায় না। শরীলে-হাত হান্দাইয়া বিচরায় (হাত ঢুকিয়ে খোঁজে)।
অধর ভুইমালী যা বলল, খানিক আগে দর্শনায় স্বচক্ষে তা দেখে এসেছে বিনু। নারীপুরুষ কেউ রেহাই পায়নি।
অধর বলতে লাগল, পুঙ্গির পুতেগো চৌখে ধূলা দিয়া আমি সাত ভরি সোনার গয়না আর জমিজমা বাড়িঘরের বেবাক দলিল লইয়া আইছি।
বলে কি লোকটা? খানিকক্ষণ হাঁ হয়ে থাকে বিনু। তারপর জিজ্ঞেস করে, তোমার জিনিসপত্র খুঁজে দেখে নি?
দ্যাখে আবার নাই? পিন্দনের (পরনের) কাপড়ের ভিতরে তরি হাত হান্দাইয়া খাবলাইয়া দেখছে। তভু উদ্দিশ পায় নাই।
দলিল টলিল রেখেছিলে কোথায়?
ইণ্ডিয়ায় ঢুইকা গ্যাছি। অহন আর ডরের কিছু নাই। পাকিস্থানের পুলিশ এইখানে আইসা আর তেড়িমড়ি করতে পারব না। বডারের এই পারে আইলে ইন্ডিয়া অগো ঘেটি থিকা মাথা নামাইয়া দিব। হ। পায়ের মোটা ফেট্টিটা দেখিয়ে বলল, আসল মালগুলা রাখছি এইর ভিতরে। ল্যাংড়াইয়া ল্যাংড়াইয়া হাটছি বইলা হুমুন্দির পুতেরা ট্যারই পায় নাই।
বিনুর তাক লেগে গেল। এই অক্ষরপরিচয়হীন পেঁয়ো লোকটা কী ধুরন্ধর, কতখানি কূট বুদ্ধি সে ধরে এবং কী বিপুল তার অভিনয় প্রতিভা, ভাবা যায় না। সেই তারপাশা স্টিমারঘাট থেকে যে প্রক্রিয়ায় নিখুঁতভাবে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে সে মারাত্মক ধরনের নিষ্ঠুর আর সজাগ পাকিস্তানি অফিসার আর পুলিশবাহিনীকে ধোঁকা দিয়েছে, নিজের চোখে দেখেও বিশ্বাস হচ্ছে না বিনুর। নিচ্ছিদ্র পাহারদারি করেও সোনাদানা দলিলপত্র নিয়ে সীমান্তের এপারে তার চলে আসা পাকিস্তানিরা আটকাতে পারেনি। যন্ত্রণায় ভীষণ কষ্ট পাচ্ছে, এমন মুখভঙ্গি করে প্রায় দুটো দিন কাটিয়ে দিয়েছে সে। বিনু ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি, তার পায়ের ব্যাণ্ডেজের ভাঁজে ভাঁজে কী লুকনো আছে। হঠাৎ ত্রৈলোক্য সেনের কথা মনে পড়ল। তিনিও হুবহু এই প্রক্রিয়ায় যুদ্ধের আমলে বর্মা থেকে অনেক টাকা নিয়ে এসেছিলেন।
বিনু বলল, তা হলে তোমার পায়ে চোট টোট কিছুই লাগে নি!
অধর বলল, না বাবুমশয়, না। একখান খোঁচা (খোঁচা) তরি না। আসল কথাখান কী জানেন?
কী?
দিনকাল আর আগের লাখান নাই। দাঙ্গা হইল, দ্যাশভাগ হইল, লাখ লাখ মানুষ ইণ্ডিয়ায় চইলা যাইতে আছে। অহন যদিন বুদ্ধি খাটাইয়া না চলেন, টিকতে পারবেন না। শ্যাষ হইয়া যাইবেন।
অধর ভুঁইমালীর মুখ দিয়ে যেন দৈববাণী বেরুচ্ছে। সার সত্যিটা সে বুঝে নিয়েছে। এই দুঃসময়ে পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে হলে কৌশল দরকার। বিনু নিশ্চিত, লোকটা যে ধরনের চতুর এবং ফন্দিবাজ, ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হয়ে গেলেও সে শেষ হয়ে যাবে না। নিজের বউ ছেলে মেয়ের জন্য ইন্ডিয়ায় কিছু একটা ব্যবস্থা নিশ্চয়ই করে ফেলবে।
অধর গলা আরও নামিয়ে দিল, বিশ্বাস কইরা আপনেরে কথাগুলান কইলাম বাবুমশয়। দেইখেন কেউ কেউ) য্যান ট্যার না পায়।
না না, আমি কাউকে জানাব না। তা ছাড়া, কলকাতায় পৌঁছবার পর আমরা কে কোথায় চলে যাব, হয়তো আর দেখাই হবে না।
একসময় ট্রেন বেনাপোল পৌঁছে যায়।
বর্ডারের ওধারের মতো এখানেও প্রচুর ইন্ডিয়ান পুলিশ এবং অফিসার রয়েছেন। আর আছে অনেকগুলো সরকারি আর বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের লোকজনেরা।
এখানে অবশ্য ট্রেনটাকে বেশিক্ষণ আটকানো হল না। সরকারি তরফ থেকে তো বটেই, স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানগুলোর লোজনেরাও উদ্বাস্তুদের শুকনো খাবার অর্থাৎ চিড়ে গুড় দরবেশ, ইত্যাদি খেতে দিল। ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত মানুষগুলো গোগ্রাসে খেতে লাগল।
এরই মধ্যে অফিসাররা উদ্বাস্তুদের কে কোত্থেকে এসেছে, তাদের নাম, পরিবারে কতজন মানুষ, ইন্ডিয়ায় তাদের আত্মীয়স্বজন কেউ আছে কিনা, থাকলে সেখানে আশ্রয় পাওয়ার কতখানি সম্ভাবনা, ইত্যাদি টুকে নিয়ে প্রত্যেককে বর্ডার স্লিপ লিখে দিতে লাগলেন। ইন্ডিয়ার সরকারি নথিপত্রে শরণার্থী হিসেবে তাদের নামগুলো পাকা জায়গা পেয়ে গেল।
গোয়ালন্দের মতো বেনাপোলেও একদল সিনেমার লোক মুভি ক্যামেরা নিয়ে উদ্বাস্তুদের ছবি তুলছিল। সবার বয়স তিরিশ থেকে পঁয়ত্রিশের মধ্যে। দলের কেউ কেউ ওপার থেকে আসা মানুষগুলোর সঙ্গে কথা বলে দেশছাড়ার কারণ রেকর্ড করে নিচ্ছে। গোয়ালন্দে সেভাবে মুখ খোলে। নি উদ্বাস্তুরা। কিন্তু এপারে এসে নির্ভয়ে জানিয়ে দিচ্ছে, পাকিস্তানে কী আতঙ্কের ভেতর তাদের দিন কেটেছে এবং ইন্ডিয়ায় না এসে কেন তাদের উপায় ছিল না, ইত্যাদি।
