দৃশ্যটা তরুণ অফিসারকে হয়তো বিচলিত করে তোলে। আন্দাজ করা যায়, খুব বেশিদিন চাকরিতে ঢোকেনি। এখনও নতুন। তাই ততটা কঠোর আর যান্ত্রিক হয়ে উঠতে পারেনি।
রামরতনদের ডাঁই-করা মালপত্র দেখিয়ে বিনু বলে, ওগুলো ওঁদের। সার্চ করে দেখতে পারেন।
নানা বয়সের চার শোকাতুরা নারীকে দেখতে দেখতে অফিসারটির মনে হয়, এই পরিস্থিতিতে তল্লাশি করাটা চরম নিষ্ঠুরতা। ভারী গলায় জানায়, না, থাউক। একটু থেমে বলে, যদি আইনে আটকায় অ্যামন কিছু ওনারা নিয়াও যান, বাধা দিমু না। নিজেগো জিনিসই তো নিয়া যাইতে আছেন। বলতে বলতে কামরা থেকে প্ল্যাটফর্মে নেমে যায়।
বিনুও তার সঙ্গে নেমে পড়েছিল। তরুণ অফিসারটির সহৃদয়তায় সে আপ্লুত। গম্ভীর গলায় বলল, আপনাকে কী বলে যে কৃতজ্ঞতা জানাব!
অফিসারটি বলল, কৃতজ্ঞতা আবার কিসের? ওনাগো এত বড় একটা সর্বনাশ হইয়া গেছে। তার উপুর ডিসটার্ব করুম, অ্যামন অমানুষ আমি না। আইচ্ছা, চলি–
বিনু আর এগুলো না, হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে রইল।
.
৩.১৫
তল্লাশি শেষ হতে আড়াই তিন ঘন্টা লেগে গেল। লটবহর নিয়ে যারা নেমে গিয়েছিল, প্রতিটি কামরায় তারা ফিরে এসেছে। যারা ট্রেনের মাথায় চড়ে গোয়ালন্দ থেকে রওনা হয়েছিল, তারা ফের ছাদে উঠে পড়েছে।
কিছুক্ষণের মধ্যে ট্রেন সীমান্ত পেরিয়ে ইন্ডিয়ায় পৌঁছে যাবে। দেশ-হারানো ছিন্নমূল মানুষগুলোর চোখমুখ থেকে প্রচণ্ড উৎকণ্ঠা অনেকটাই কেটে গেছে। তাদের আশা, পাকিস্তান বর্ডারে তল্লাশির পর নতুন করে আর কোনও হানাদারি হবে না। বাকি যাত্রাপথ বিঘ্নহীন এবং নিরাপদ।
বেশির ভাগ উদ্বাস্তুই সামান্য কথাকানি, কাপড়চোপড়, পুরনো বাসনকোসন ছাড়া পার্থিব অন্য কিছুই সঙ্গে আনতে পারেনি। যারা লুকিয়ে চুরিয়ে একটু আধটু সোনার গয়না বা জমির দলিল পরচা নিয়ে এসেছিল, সেগুলো ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। পাকিস্তানি অফিসারদের চোখে ধুলো ছিটিয়ে শেষরক্ষা করা যায়নি। এরা হতাশ হয়ে পড়লেও বড় রকমের একটা সান্ত্বনা তাদের আছে। সেই সঙ্গে স্বস্তিও। শেষ পর্যন্ত ইন্ডিয়ায় তারা পৌঁছতে পারবে।
বিনুদের কামরাটাও আগের মতোই ভিড়ে বোঝাই হয়ে গেছে। একটা সর্ষের দানা ফেলার মতো ফাঁকও নেই।
ওদিকে রামরতনের স্ত্রী আর মেয়েদের কান্নার বিরাম নেই। সবার চোখ টকটকে লাল, যেন রক্তজবা। চোখের জল গাল বেয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় অবিরল ঝরে যাচ্ছে।
কামরার মানুষগুলোর বহুদিনের পুঞ্জীভূত আতঙ্ক প্রায় কেটে গেলেও তারা খুবই ম্রিয়মাণ। রামরতনের মৃত্যু এবং তার পরিজনদের কান্না পরিবেশটাকে আচ্ছন্ন তুলেছে। কেউ একটা কথাও বলছে না। কামরাটা আশ্চর্য রকমের চুপচাপ, বিহ্বল, গাঢ় বিষাদে ডুবে আছে।
একসময় ট্রেন চলতে শুরু করল।
বেশিক্ষণ লাগল না। পাকিস্তানের সীমানা পার হয়ে গাড়ি ইন্ডিয়ায় ঢুকে পড়ে। পূর্ব বাংলার সঙ্গে চিরকালের মতো সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেল বিনুর। একধারে রামরতনের মৃতদেহ, তাকে ঘিরে শোককাতর চার মহিলা। সব মিলিয়ে বুকের ভেতর দুরন্ত ঘূর্ণির মতো কী যেন পাক খেতে লাগল তার।
ট্রেন ইন্ডিয়ায় ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে বিনুদের কম্পার্টমেন্টটা বাদ দিয়ে অন্য সব কামরা এবং ছাদের ওপর থেকে দেড় দু’হাজারের মতো মানুষ চিৎকার করে কী বলতে লাগল। ট্রেনের আওয়াজ ছাপিয়ে তার কিছুই বোধগম্য হচ্ছে না। তবে আন্দাজ করা যাচ্ছে, ইন্ডিয়ায় পৌঁছতে পেরে তারা ভীষণ উত্তেজিত। হইচই সেই কারণে।
বিনু ঝিনুকের দিকে একবার তাকাল। এখন পর্যন্ত তাকে মোটামুটি সুস্থ এবং স্বাভাবিক দেখাচ্ছে। কলকাতায় পৌঁছবার পর কী হবে, কে জানে। কিন্তু ঝিনুকের চিন্তা ছাপিয়ে রামরতনদের সমস্যা তাকে ক্রমশ অস্থির করে তুলতে থাকে।
কলকাতায় সপরিবারে রামরতনের যাওয়ার খবর তার ভাইপো বিমল পেয়েছে কিনা, নাসের আলি বা স্বয়ং রামরতন কেউ বলতে পারেননি। যদি না পেয়ে থাকে? শিয়ালদা স্টেশনে পৌঁছে যদি দেখা যায় বিমল ওঁদের নিতে আসেনি, তখন কী করবে বিনু? একটা মৃতদেহ, একজন বৃদ্ধা, একজন মাঝবয়সী বিধবা আর দুটি তরুণীকে বিশাল জনারণ্যে ফেলে রেখে সে কি চলে যাবে?
অবনীমোহন সুধা এবং সুনীতিকে সে অনেক আগেই চিঠি দিয়ে জানিয়েছিল, কলকাতায় যাচ্ছে। হেমনাথও লিখেছেন। ওরা যদি তাদের চিঠি না পেয়ে থাকে, স্টেশনে আসার প্রশ্নই নেই। তবু বিনুর খুব একটা অসুবিধা হবে না। ওদের সবার ঠিকানা তার জানা। আর কলকাতা শহরটা তার একেবারে অচেনাও নয়। খুঁজে খুঁজে কারোর না কারোর বাড়ি পৌঁছে যেতে পারবে। রামরতন যদি বেঁচে থাকতেন, ওঁদের সবাইকে নিয়ে অবনীমোহন বা দিদিদের কারোর বাড়িতে চলে যাওয়া যেত। কেউ আপত্তি করত না। ট্রেনের ধকল কাটাবার পর ধীরে সুস্থে বিমলের কাছে রামরতনদের পাঠিয়ে দেওয়া যেত। কিন্তু মৃতদেহ নিয়ে তো কারোর বাড়ি যাওয়া যায় না।
পাশ থেকে অধর ভুঁইমালীর ফিসফিসানি কানে এল, বাবুমশয়—
চমকে বাঁ পাশে তাকাতেই বিনুর চোখে পড়ল, অধর তার পুরু ফেট্টি বাঁধা পা তেরছা করে একটা রংচটা তোবড়ানো টিনের বাক্সের ওপর রেখে তার দিকে শরীরটা কাত করে দিয়েছে। চোখাচোখি হতে সে বলল, মাস্টারমশয় আতখা (হঠাৎ) মইরা গেল। ইন্ডিয়ায় আইল তেনার মরা শরীল। পথের আলাপ, তভু জবর কষ্ট হইতে আছে। একটু থেমে বলল, কিন্তু ক এইর মইদ্যে একখান কাণ্ড ঘটছে।
