বিনু অফিসারটির কাছাকাছি চলে এসেছিল। তার সামনে আর মাত্র চার পাঁচটি লোক। তারপর। এই দুর্ভোগ শেষ হবে।
হঠাৎ একটা বিশ্রী ব্যাপার ঘটে গেল। বিনুদের বাঁ পাশের লাইনে আরও অনেকের সঙ্গে ছিল একটি রোগা, ক্ষয়টে চেহারার চাষাভুষো ধরনের প্রৌঢ়, তার স্ত্রী, একটি তরুণী এবং অল্প বয়সের দু’টি ছেলে। ওই লাইনের শেষ মাথায় যে অফিসারটি বসে আছে তার বয়স চল্লিশ বেয়াল্লিশ। লম্বা চওড়া মজবুত চেহারা, চৌকো মুখ, পাকানো গোঁফ। ভাঙা ভাঙা বাংলার সঙ্গে উর্দু মিশিয়ে কথা বলছিল। বাঙালি যে নয়, পরিষ্কার বোঝা যায়। অবশ্যই পশ্চিম পাকিস্তানের লোক।
বিনু অনেকক্ষণ ধরে লক্ষ করছিল, এই অবাঙালি অফিসারটি সবচেয়ে বেশি উৎপাত করে চলেছে। সে ওই প্রৌঢ়টির লটবহর খুলে আতিপাতি করে তো খুঁজলই, তারপর প্রৌঢ়, তার স্ত্রী এবং কম বয়সের ছেলে দুটোর শরীর হাতড়ে তল্লাশি চালাল। সবার শেষে এল যুবতী মেয়েটির পালা। সার্চের নামে তার গায়ে যেখানে সেখানে হাত চালিয়ে দিচ্ছে। মেয়েটি লজ্জায় উৎকণ্ঠায় আতঙ্কে এমনই। দিশেহারা যে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিল না। এত টলছিল যে জ্ঞান হারিয়ে যে কোনও মুহূর্তে লুটিয়ে পড়বে। তার বাপ হাতজোড় করে আর্ত, করুণ স্বরে সমানে বলে যাচ্ছিল, দয়া করেন ছার (স্যার), দয়া করেন। মাইয়াটারে ছাইড়া দ্যান তার স্ত্রী এবং দুই ছেলে আকুল হয়ে একটানা কেঁদে চলেছে।
অবাঙালি অফিসারটি তার কথায় কর্ণপাত করছিল না।
অসহ্য ক্রোধে মাথার ভেতরটা যেন ফেটে যাবে বিনুর। মনে হল, জন্তুটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, কিন্তু নিরুপায় কাপুরুষের মতো হাত কামড়ানো ছাড়া উপায়ই বা কী।
বিনু পারেনি, কিন্তু তার সামনের তরুণ বাঙালি অফিসারটি বসে থাকতে পারল না। সহ্যশক্তির শেষ সীমায় সে পৌঁছে গিয়েছিল। অবাঙালি অফিসারটির সার্চের নামে নোংরা ক্রিয়াকলাপ তাকে ক্ষিপ্ত করে তুলেছে। হঠাৎ হিতাহিত জ্ঞানশূন্যের মতো লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বাংলা, উর্দু এবং ইংরেজি মিশিয়ে চিৎকার করে ওঠে, স্টপ ইট, স্টপ ইট। ছাড়েন–ছাড়েন, ছোড়িয়ে উনকো–
অবাঙালি অফিসারটিও ততক্ষণে উঠে পড়েছে। বাধা দেওয়ায় তার মুখচোখ যেন রাগে ফেটে পড়বে। শরীরের সব রক্ত মাথায় চড়ে গেছে। গলার শির ছিঁড়ে সে চেঁচিয়ে ওঠে, কিপ ইওর ব্লাডি মাউথ শাট। নিজের চরকায় তেল দাও। সিট ডাউন–
অবাঙালি অফিসারটি খুব সম্ভব বাঙালি তরুণটির সিনিয়র। তরুণটি কিন্তু তার রক্তবর্ণ চোখ। এবং দাবড়ানি গ্রাহ্য করে না। সে এতটাই ক্রুদ্ধ আর উত্তেজিত যে গলার স্বর আরও কয়েক পর্দা চড়িয়ে যা বলল তা এইরকম। সিনিয়র অফিসারটির ইতরামো, অসভ্যতা কোনও মতেই বরদাস্ত করা যায় না। উদ্বাস্তু যুবতীরা তাদের মতো লোকের কাছে যে ব্যবহার পাচ্ছে, ওপারে গিয়ে যখন জানাবে, তার মারাত্মক প্রতিক্রিয়া হবে। সবসময় মনে রাখা দরকার, সীমান্তের ওধারেও মাইনোরিটি কমিউনিটির লক্ষ লক্ষ মানুষ রয়েছে। তাদের ওপর জনরোষ গিয়ে পড়লে অবস্থাটা কেমন দাঁড়াবে?
তরুণ অফিসারের দু’চারজন বাঙালি সহকর্মী তার সঙ্গে গলা মিলিয়ে অবাঙালিটির আচরণের প্রতিবাদ জানাতে থাকে।
অনেকক্ষণ তুমুল বচসার পর গজ গজ করতে করতে বসে বড়ে অবাঙালি অফিসারটি। তবে নতুন করে বাড়াবাড়ি করতে তার সাহস হয় না। সে ভেবে পায় না, কাফের মেয়েদের গায়ে হাত দেওয়ায় বাঙালি ছোরারা এত খেপে গেল কেন?
অবাক চোখে তরুণটির দিকে তাকিয়ে আছে বিনু। তাকে যত দেখছে ততই শ্রদ্ধা বেড়ে যাচ্ছে। আফজল হোসেনকে আগেই দেখেছে সে, নাসের আলিকে দেখেছে, এখন এই যুবক অফিসারটিকে দেখল। এদের সংখ্যাটা যদি আরেকটু বেশি হত!
লাইনের সামনে যে ক’জন ছিল, তাদের তল্লাশি হয়ে গেছে। বিনু এখন তরুণ অফিসারটির মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে।
অফিসারটি জিজ্ঞেস করল, আপনের মালপত্র?
বিনু বলল, দুখানা চাদর ছাড়া আর কিছু নেই। সে দুটো রেলের কামরায় রেখে এসেছি।
ঠিক আছে।
অবশ্য—
কী?
আমার সঙ্গে কিছু টাকা আছে।
কত?
টাকা বার করে দেখায় বিনু। রাস্তায় খরচখরচা বাদ দিয়ে আট শ’ পাঁচ টাকা বার আনা।
অফিসারটি বলল, টাকাটা নিজের কাছে রাইখা দ্যান।
টাকা রেখে বিনু দু’হাত মাথার ওপর তুলে বলল, আমাকে সার্চ করে দেখতে পারেন।
দরকার নাই। কে সত্য কয় আর কে মিছা, মুখ দেখলে বুঝা যায়। আপনে যাইতে পারেন।
আমার আরও কিছু বলার আছে।
অফিসার উৎসুক চোখে তাকায়।
গলা নামিয়ে বিনু জানায়, তার সঙ্গে কয়েকজন রয়েছে। তাদের পক্ষে কামরা থেকে নেমে এসে তল্লাশির জন্য লাইনে দাঁড়ানো সম্ভব হয়নি।
অফিসারের কপাল কুঁচকে যায়, ক্যান সম্ভব হয় নাই?
রামরতনদের সঙ্গে কোথায় তার আলাপ, কিভাবে ঘুমন্ত অবস্থায় তার মৃত্যু ঘটেছে, সব জানিয়ে বিনু বলে, সবাই ওঁর বডি ঘিরে বসে আছে। এই অবস্থায় তো ওঁদের নামিয়ে আনা যায় না।
ঠিকই।
বিনু ফের বলে, আপনি কি কষ্ট করে আমাদের কম্পার্টমেন্টে যাবেন?
কী ভেবে অফিসারটি বলে, আইচ্ছা চলেন– অন্য এক বাঙালি অফিসারকে তার জায়গায় বসিয়ে বিনুর সঙ্গে ওদের কামরায় যায় সে।
রামরতনকে ঘিরে বসে তার স্ত্রী এবং মেয়েরা কেঁদেই চলেছে। চিৎকার করে নয়, একটানা চাপা, করুণ সুরে। তাদের পাশে বসে আছে ঝিনুক। নীরব, বিষণ্ণ। কামরার অন্য যাত্রীরা তল্লাশির জন্য নেমে গিয়েছিল। তারা এখনও ফিরে আসেনি।
