এই বৃদ্ধের সঙ্গে পরশু তারপাশার স্টিমারঘাটে প্রথম আলাপ। রক্তের কোনও সম্পর্ক নেই। তবু বুকের অতল স্তর থেকে কুণ্ডলী পাকিয়ে পাকিয়ে উঠে এসে গলার কাছে কী যেন আটকে যাচ্ছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে বিনুর।
ভয়তাড়িত রামরতন দেশ ছাড়ার জন্য বেরিয়ে পড়েছিলেন, কিন্তু ভারতে আর পৌঁছনো হল না। কাল রাতে ঘুমের ঘোরে যাবতীয় দুর্ভাবনা এবং ত্রাস এই ভূমণ্ডলে ফেলে রেখে তিনি চলে গেছেন।
কান্নাটা সাময়িক থেমে গিয়েছিল। রামরতনের স্ত্রী আর মেয়েরা আগেই জেনে গিয়েছিল। তবু অসম্ভব বুঝেও ক্ষীণ একটু আশা জাগিয়ে তুলে রুদ্ধশ্বাসে বিনুর দিকে তাকিয়ে আছে।
রামরতনের স্ত্রী ঝাঁপসা গলায় জিজ্ঞেস করলেন, কী বুঝলা বাবা?
দুঃসংবাদটা বিনুর পক্ষে নতুন করে জানানোনা সম্ভব নয়। বিব্রতভাবে সে বলে, এখন উনি যেমন আছেন তেমনি শুয়ে থাকুন। ডাকাডাকি করার দরকার নেই। কলকাতায় পৌঁছবার পর ডাক্তার দেখানো যাবে।
বিনু কী বলতে চায়, না বোঝার কারণ নেই। সরটি নানা বয়সের মহিলা ফের কান্নায় ভেঙে পড়ে।
.
হেমন্তের সূর্য মাথার ওপর উঠে আসার অনেক আগেই ট্রেন দর্শনা পৌঁছে যায়।
পাকিস্তানের বর্ডার পুলিশ আর কাস্টমসের লোকজনে স্টেশনটা থিকথিক করছে। ট্রেন থামতেই তারা আঁপিয়ে পড়ল। প্রতিটি কামরার জানালায় জানালায় মুখ বাড়িয়ে আমর্ড কনস্টেবল আর কাস্টমসের অফিসাররা কড়া গলায় হুকুম দিতে লাগল, মালপত্র লইয়া সগলে নাইমা আসো। সার্চ হইব–
বর্ডারে তল্লাশির কথা আগেই শুনেছিল বিনু। পূর্ব পাকিস্তান থেকে মূল্যবান কোনও জিনিস– সোনাদানা, গয়নাগাটি, বাসনকোসন, প্রচুর নগদ টাকা–নিয়ে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। সার্চ করে যদি দেখা যায় তেমন কিছু কেউ লুকিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তক্ষুনি কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।
হুকুম জারি হবার সঙ্গে সঙ্গে বিনুদেরই শুধু নয়, সবগুলো কামরা খালি করে ভয়ার্ত উদ্বাস্তুর দল হুড়মুড় করে লটবহর নিয়ে প্ল্যাটফর্মে নেমে পড়ে।
রামরতনের স্ত্রী বিহ্বলের মতো বিনুকে বললেন, আমাগোও তো নামতে হইব। স্বামীকে দেখিয়ে বললেন, কিন্তু এই মানুষটারে ফেলাইয়া–
বিনু বলল, আপনাদের এখন নামতে হবে না। আমি গিয়ে ওদের বুঝিয়ে বলব। তারপরও যদি না শুনতে চায় তখন দেখা যাবে–ঝিনুককে রামরতনের স্ত্রী আর মেয়েদের কাছে রেখে কামরা থেকে নেমে পড়ল বিনু।
প্ল্যাটফর্মে প্রচণ্ড ভিড়। কামরাগুলো থেকে লোক তো নেমেছেই, বিনুর চোখে পড়ল গাড়ির ছাদ থেকেও নামছে। হুকুমনামা অগ্রাহ্য করার মতো বুকের পাটা কারোর নেই।
বিনুর মনে হল, গোয়ালন্দে যারা ট্রেনের মাথায় চড়েছিল তাদের কেউ মারা যায়নি। খুব সম্ভব ব্রিজ দেখলে তারা টান টান হয়ে ছাদে শুয়ে পড়েছে।
প্ল্যাটফর্মের এক মাথায় টেবল চেয়ার পেতে লম্বা লম্বা বাঁধানো খাত আর পেন নিয়ে অফিসারেরা বসে আছে। ধমকধামক, বা বন্দুকের কুঁদোর গুতো দিয়ে পুলিশের লোকেরা অনেকগুলো লাইন করে উদ্বাস্তুদের দাঁড় করিয়ে দিল। প্রতিটি লাইনের জন্য একজন করে অফিসার।
তল্লাশি শুরু হল। লাইনের প্রথম দিকে যারা আছে তাদের আগে সার্চ হয়ে যাচ্ছে। মালপত্র ঘাঁটাঘাঁটি তো হচ্ছেই, প্রত্যেকের সারা শরীরও হাতড়ানো হচ্ছে। এমনকি মেয়েরাও রেহাই পাচ্ছে না।
বেশির ভাগেরই লটবহরে রয়েছে শস্তা পুরনো জামাকাপড়, কাঁথাবালিশ, তামা কাসার দু’চারটে বাসন, তা ছাড়া টুকিটাকি কিছু জিনিস।
যাদের কাছে দামী কিছুই নেই তারা সহজেই পার পেয়ে যাচ্ছে। কিন্তু দু’একজনের কাছ থেকে দু’চারটে সোনার গয়না, জমির দলিল এবং বেশ কিছু নগদ টাকা পাওয়া গেল। তক্ষুনি সে সব কেড়ে নেওয়া হল।
লোকগুলো অফিসারদের পা জড়িয়ে ধরে আকুল কান্নায় ভেঙে পড়ে, সব্বস্ব খুয়াইয়া দ্যাশ ছাড়তে আছি। ওইটুকই শ্যাষ সম্বল। দয়া করেন গরিবের উপর–
কিন্তু শুধুমাত্র কান্নায় অফিসারদের মন গলানো সহজ নয়। পা ঝাড়া দিয়ে তারা নিজেদের ছাড়িয়ে নেয়। কিন্তু এই উদ্বাস্তুরা নাছোড়বান্দা, ওরা ফের পা জাপটে ধরে। অগত্যা অফিসাররা আর্মড পুলিশ ডাকে। তারা ঘাড় ধরে টানতে টানতে এবং অকথ্য খিস্তি দিতে দিতে ওদের দূরে আছড়ে ফেলে। কারোর হাত-পা থেঁতলে যায়, কারোর বা বাঁধানো প্ল্যাটফর্মে মাথা ঠকে রক্তারক্তি কাণ্ড।
সাত পুরুষের ভিটেমাটি খুইয়ে চিরকালের মতো যারা পূর্ব বাংলা ছেড়ে চলে যাচ্ছে তাদের প্রতি কেন এই অমানুষিক নিষ্ঠুরতা? আর একটু সদয় ব্যবহার কি করা যায় না? পাশের লাইন থেকে বিনু চেঁচিয়ে উঠতে যাচ্ছিল, কিন্তু কেউ যেন ভেতর থেকে তার গলা চেপে ধরে। প্রতিবাদ করতে গেলে তার পরিণতি মারাত্মক হবে। এই পরিস্থিতিতে বোবা হয়ে থাকাই একমাত্র বুদ্ধিমানের কাজ।
সমান্তরাল রেখায় পর পর ছটা লাইন এগিয়ে চলেছে। যাদের কাছে তেমন কিছু পাওয়া যাচ্ছে, কেড়েকুড়ে তো নেওয়া হচ্ছেই, তার ওপর চলছে হেনস্থা। তবে তল্লাশির নামে মেয়েদের, বিশেষ করে তরুণীদের নিয়ে যা চলছে, তা মেনে নেওয়া যায় না। মেয়েগুলো লজ্জায় ভয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছে। কিন্তু অন্ধ আর বধির হয়ে থাকা ছাড়া উপায় নেই।
তবে কম বয়সের যে অফিসারটির সামনে বিনু লাইন দিয়েছে সে খুবই ভদ্র এবং দেশ ছেড়ে যাওয়া মানুষগুলোর প্রতি যথেষ্ট সহানুভূতিশীল। উদ্বাস্তুদের মালপত্র একটু আধটু দেখেই ছেড়ে দিচ্ছে। মেয়েদের কোনও কিছু জিজ্ঞেস করছে না, গায়ে হাত দিয়ে সার্চের তো প্রশ্নই নেই। নরম গলায় তাদের বলছে, আপনেরা যান–
