সকাল থেকে পেটে কিছু পড়েনি বিনু বা ঝিনুকের। ভীষণ খিদে পেয়েছে। তারপাশায় প্রচুর চিড়ে গুড়টুড় কিনেছিল। তার অর্ধেকটা এখনও রয়েছে। কিন্তু রামরতনের বুকের কষ্টটা বেড়ে যাওয়ায় তার স্ত্রী এবং মেয়েরা এমনই উদ্বিগ্ন যে খাওয়ার কথা তাদের খেয়াল নেই। এই অবস্থায় পাশে বসে খাওয়াও যায় না। আসলে ওরা না খেলে বিনুরাই বা খায় কী করে? রামরতনদের সঙ্গে কাল তারপাশায় দেখা। এইটুকু সময়ের মধ্যে কতভাবেই না ওঁদের সঙ্গে বিনুরা জড়িয়ে গেছে।
তারা না খেলেও কামরার বাকি সবাই পোঁটলা পুঁটলি খুলে মুড়ি বাতাসা বা চিনির মঠ বার করে খাচ্ছে।
রামরতনের কাতরানিটা চলছেই। তাঁর স্ত্রী ব্যাকুলভাবে বিনুকে বলল, বুড়া মানুষটারে লইয়া কী করি কও তো বাবা? কইলকাতা তরি ওনারে লইয়া যাইতে পারুম তো?
অসহায় বৃদ্ধাকে দেখতে দেখতে বুকের ভেতরটা কেঁপে যায় বিনুর। সে বলে, খারাপ কথা, চিন্তা করবেন না মাসিমা। নিশ্চয়ই স্যারকে নিয়ে যেতে পারবেন।
রামরতনের শিয়রের কাছে বসেছে বিনু। কাল রাতে জোরে জোরে বুক ডলে দেওয়ায় তার যন্ত্রণা কমে গিয়েছিল। কিন্তু বার বার একই পদ্ধতিতে কাজ হবে কিনা, কে জানে। বিনু ঝুঁকি নিল না। জামার ওপর দিয়ে আস্তে আস্তে বুকে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। অনেকক্ষণ পর রামরতনের গোঙনি ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে এল।
বেশ কয়েক ঘন্টা পর, বিকেলের সূর্য যখন পশ্চিম দিকে নদীর ওপর ঢলে পড়েছে, সেই সময় গার্ডের হুইসিল শোনা গেল। পরক্ষণে ট্রেন চলতে শুরু করল।
রামরতন অনেকক্ষণ আগে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। কষ্টটা নিশ্চয়ই আর নেই। বিনু তাড়া দিয়ে দিয়ে তার স্ত্রী এবং মেয়েদের চিড়ে টিড়ে খাইয়েছে। ঝিনুক আর সেও খেয়েছে। রামরতনের জন্য যে উৎকণ্ঠা ছিল সেটা অনেকখানি কেটে গেছে।
জানালার বাইরে মুখ ফিরিয়ে আকাশ নদী গাছপালা ধানখেত দেখছিল বিনু। পূর্ব বাংলায় এটাই তার জীবনের শেষ সূর্যাস্ত। পৃথিবীর এই ভূখণ্ডে আর কখনও তার ফেরা হবে না।
এখানে কমগুলো বছর তো কাটল না। এই বাংলার খাল বিল নদী, ঘন সবুজ বৃক্ষলতা, আকাশ বাতাস, সোনালি লাবণ্যে ভরা অবারিত ফসলের খেত, ফুল, পাখি, মাছ, ঋতুক্রের মোহিনীমায়া সব তার নিশ্বাসে প্রশ্বাসে জড়িয়ে আছে। এসব ফেলে চলে যেতে আশ্চর্য এক বেদনা বিনুকে কাতর করে তুলছিল। সেই সঙ্গে রয়েছে সন্দেহ, অবিশ্বাস, আতঙ্কের দমবন্ধ-করা ফাঁদ থেকে বেরিয়ে যাবার অগাধ স্বস্তি। মিশ্র অনুভূতির টানাপোড়েন চলছে দুই বিপরীত দিকে।
দেখতে দেখতে সূর্য ডুবে যায়। হেমন্তের সন্ধ্যা নামে। বাতাসে দ্রুত হিম মিশতে থাকে। কুয়াশায় অন্ধকারে চারদিক ঢেকে যায়।
বিনু জানালার পাল্লা টেনে বন্ধ করে। কামরার ভেতর টিমটিমে আলো জ্বলছে। তাতে কোনও কিছু স্পষ্ট নয়। চারপাশের মানুষগুলোকে ধোঁয়ার মূর্তির মতো মনে হচ্ছে।
ট্রেন কিন্তু একটানা চলছে না। মাঝে মাঝে মাঠের মাঝখানে কিংবা নগণ্য কোনও স্টেশনে থামছে। দু’এক ঘন্টা নড়ন চড়ন নেই। তারপর আবার দৌড়। এভাবে থেমে থেমে চললে কাল আদৌ কলকাতায় পৌঁছনো যাবে কিনা, কে জানে।
.
কখন চোখে ঢুল নেমেছিল আর কখন ঘুমিয়ে পড়েছে, বিনুর খেয়াল নেই। হঠাৎ কান্নার আওয়াজে ঘুম ভেঙে যায়।
ধড়মড় করে খাড়া হয়ে বসে বিনু। ট্রেন উধ্বশ্বাসে ছুটছিল। কামরার জানালাগুলো এখন খোলা। বাইরে অনেক দূরে সূর্যোদয় হচ্ছে। সকালের প্রথম আলো এসে পড়ছে কামরার ভেতরে। সেই সঙ্গে ঢুকছে হেমন্তের শীতল বাতাস।
কিন্তু কোনও দিকেই লক্ষ্য নেই বিনুর। হতচকিত হয়ে সে দেখতে পায়, রামরতনের তিন মেয়ে এবং স্ত্রী অঝোরে কাঁদছেন। কামরার অন্য সবার এখনও ঘুম ভাঙেনি। যারা জেগে উঠেছে, বিষণ্ণ দৃষ্টিতে তারা তাকিয়ে আছে। ঝিনুকও জেগে গিয়েছিল। তার চোখে মুখে অদ্ভুত বিহ্বলতা।
হঠাৎ কী হতে পারে যাতে রামরতনের স্ত্রী আর মেয়েরা এমন ব্যাকুলভাবে কেঁদে চলেছে!
কয়েক পলক তাকিয়ে থাকে বিনু। এই কান্নাকাটি কিসের এক অশুভ সংকেত যেন দিয়ে যাচ্ছে। হকচকানো ভাবটা খানিক কাটিয়ে রামরতনের স্ত্রীর দিকে ঝুঁকে সে জিজ্ঞেস করে, কী হয়েছে মাসিমা?
বৃদ্ধা কান্নাজড়ানো গলায় বললেন, সকাল হইছে দেইখা তোমার মেসোমশাইরে জাগাইতে চেষ্টা করলাম। কাইল পুরা দিন প্যাটে কিছু পড়ে নাই। ভাবলাম উঠাইয়া দু’গা চিড়ামুড়ি খাওয়ামু। না। খাইলে শরীর আরও কাহিল হইয়া পড়ব। ডাকি, ঠেলা দেই, সাড়া নাই। চোখও মেলে না। গাও (গা) ক্যামন য্যান ঠাণ্ডা। আমার মন বড় কু ডাকতে আছে–
বিনু বলল, আমাকে ডাকেননি কেন?
আমাগো লেইগা কম তো কর নাই। রামরতনের স্ত্রী বললেন, অঘোরে ঘুমাইতে আছিলা। তাই আর জাগাই নাই–
বিনু উত্তর দিল না। দ্রুত রামরতনের জামার ভেতর দিয়ে বুকে হাত রাখল। বরফের মতো শীতল। হাত বার করে তার একটা হাত তুলে নাড়ি টিপে ধরল। স্পন্দন নেই। গতি খুব সম্ভব চিরকালের মতো স্তব্ধ হয়ে গেছে।
বিনুর হৃৎপিণ্ডের ভেতর হিমস্রোত বয়ে গেল। শ্বাস আটকে আসছে তার। যা ঘটেছে সেটা পরিষ্কার। তবু রামরতনের কাঁধে মাথায় উদ্ভ্রান্তের মতো ঠেলা দিতে দিতে ডাকতে লাগল, স্যার স্যার–
রামরতন নিশ্চল শুয়ে রইলেন। বিনু জানে, পৃথিবীর কোনও শব্দই তার কানে পৌঁছবে না, তবু বার বার ডাকতে ডাকতে একসময় থেমে গেল সে। রামরতনের বন্ধ চোখের কোণ বেয়ে। কয়েক ফোঁটা জল বার হয়ে এল।
