একটি দোভাষী যুবক বিনুকে বলল, যা সত্য তা-ই কন। আমরা কিছু মনে করুম না।
ছেলেটিকে ভাল লাগল বিনুর। ইতিহাস অবিকৃত থাক, প্রকৃত সত্য যেন গোপন করা না হয়, এটাই হয়তো ওরা চাইছে। বিনু প্রায় মরিয়া হয়ে বলল, ভয়ে চলে যাচ্ছি
মেয়েটি বলল, কলকাতায় কোথায় উঠবেন?
বিনু জানায়, তার বাবা এবং দুই দিদি সেখানে আছে। বাবার কাছেই যাবে সে।
তা হলে বর্ডারের ওপারে আপনার একটা শেলটার অন্তত আছে। অন্যদের মতো আপনার অবস্থা ততটা দুর্ভাগ্যজনক নয়।
তা বলতে পারেন।
সহযোগিতার জন্য অনেক ধন্যবাদ।
বিনু আর দাঁড়াল না।
.
৩.১৪
রেলের বয়স্ক কর্মচারীটি ঠিক খবরই দিয়েছিল। ঘণ্টাদেড়েকের মধ্যে লাইনে ফাঁকা ট্রেন এসে দাঁড়াল।
স্টিমারে ওঠা বা নামার সময় যা ঘটেছিল, ট্রেনের বেলাতেও তার হেরফের কিছু হল না। একই রকম ঠেলাঠেলি, একই রকম ধুন্ধুমার কাণ্ড।
লটবহরের ঝঞ্জাট নেই। বিনু প্রায় ঝাড়া হাত-পা। ঝিনুকও ভয় ডর অনেকখানি কাটিয়ে ক্রমশ স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। তাকে ট্রেনের কামরায় ঠেলেঠুলে একবার তুলে দিতে পারলে আর চিন্তা নেই। বিনু যেভাবে হোক, ঠিক উঠে পড়তে পারবে।
কিন্তু সমস্যা হচ্ছে রামরতনকে নিয়ে। গোয়ালন্দে নামার পর সেই যে তিনি শুয়ে পড়েছিলেন আর উঠতে পারেননি। বুকের কষ্টটা ফের প্রচণ্ড বেড়ে গেছে। ওঁদের ফেলে যাওয়াও যাচ্ছে না। যা করার খুব তাড়াতাড়ি করে ফেলতে হবে। পাঁচ সাত মিনিট দেরি হলে ট্রেনে আর জায়গা পাওয়া যাবে না।
অধর ভুঁইমালী, হরিন্দ আর ভুবন দাসকে ডেকে সমস্যার কথা বলতে তারা একেবারে ভেলকি দেখিয়ে ছাড়ল। হরিন্দ, বিনু আর ভুবন রামরতনকে কাঁধে তুলে ভিড়ের ভেতর দিয়ে প্রথমে সামনের একটা কামরায় নিয়ে শুইয়ে দিল। তারপর সবার লটবহর তো তুললই, বাচ্চাকাচ্চা এবং মেয়েদেরও তুলে ফেলল। অধর ভুঁইমালীও কম যায় না। পায়ে পুরু ব্যাণ্ডেজ। খোঁড়াতে খোঁড়াতে বিনুদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সে-ও বিস্তর টানাহ্যাঁচড়া করল।
কামরার একটা দিক বিনুরা দখল করে ফেলেছে। তারা ওঠার আগেই কিছু লোক উঠে পড়েছিল। বাকিরা পরে ঋক বেঁধে উঠতে লাগল। চোখের পলকে মেঝে, বাঙ্ক, বেঞ্চ তো বটেই, দরজার সামনের প্যাসেজ বোঝাই হয়ে গেল। বাইরে এখনও অগুনতি মানুষ। যারা কামরাগুলোতে ঢুকতে পারেনি, তাদের অনেকেই বেয়ে বেয়ে ট্রেনের ছাদে উঠে পড়েছে।
বাইরে তুমুল হট্টগোল। কামরার ভেতর দম-আটকানো ভিড়। বুকের যন্ত্রণাটা ক্রমশ তীব্র হচ্ছে রামরতনের। জোরে জোরে মাথা নাড়তে নাড়তে তিনি সমানে বলতে লাগলেন, শ্বাস নিতে পারতে আছি না। বাতাস কর, বাতাস কর’
কামরায় ফ্যান নেই, হাত-পাখাও কেউ সঙ্গে করে আনেনি। রামরতনের মেয়েরা, তার স্ত্রী এবং ঝিনুক শাড়ির আঁচল নেড়ে নেড়ে হাওয়া করতে লাগল।
বাইরে রেলের সেই কর্মচারীদের দেখা গেল। বয়স্ক কর্মচারীটির হাতে একটা লম্বা মুলি বাঁশের লাঠি। কামরাগুলোর ছাদের দিকে লাঠিটা বাড়িয়ে মৃদু খোঁচা দিতে দিতে এবং চিৎকার করতে করতে এগিয়ে আসছে, ছাত থেইকা নাইমা আসো। নাইলে মহা বিপদ হইয়া যাইব। নামো– নামো–
কাবোর নামার লক্ষণ দেখা যায় না। যারা ওপরে উঠেছিল, ছাদ আঁকড়ে তারা বসে থাকে।
কর্মচারীটি বোঝাবার চেষ্টা করে, পথে মেলা নিচা নিচা (নিচু নিচু) ব্রিজ পড়ব। মাথায় বাড়ি খাইয়া পইড়া যাইবা, লগে লগে শ্যাষ। মরণের ওষুধ কানে বাইন্ধা না। যা কই কর। নাইমা আসো
ওপর থেকে অনেকে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলে, আবার কবে টেরেন দিব তার ঠিক নাই।
অর্থাৎ ওরা অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে চায় না। ট্রেন যখন একটা পাওয়া গেছে, চরম বিপদের ঝুঁকি নিয়েই তারা কলকাতায় যাবে।
কর্মচারীটি বলে, আরে বাপু, মাঝে মইদ্যে ইট্টু আধটু গণ্ডগোল হইতে আছে ঠিকই, তয় (তবে) তোমাগো লেইগা গাড়ি নিচ্চয় দেওন হইব। এক আধদিন এইখানে সবুর কর, হের পর (তারপর) কইলকাতায় যাইও। ভাল কথা কই, নিচে নামো–
তার পরামর্শে কেউ কর্ণপাত করে না। কামরার মাথায় লোকগুলো অনড় বসে থাকে। তাদের হয়তো ধারণা, এটাই কলকাতার শেষ ট্রেন।
ট্রেনের জানালা দিয়ে বয়স্ক কর্মচারীটির পাশাপাশি সেই কম বয়সের কর্মচারীটিকেও দেখতে পাচ্ছিল বিনু। ছোকরার চোখেমুখে চরম বিরক্তি আর বিদ্বেষ। রুক্ষ গলায় সে বলে, কাফেরগুলা যদি মরে মরুক। তুমি ক্যান চিল্লাইয়া চিল্লাইয়া গলার নলী ফাইড়া ফেলাইতে আছ চাচা?
বয়স্ক কর্মচারীটি ভীষণ রেগে যায়, অগো উপুর তর এত গুসা ক্যান? এই দ্যাশটা তর আমার য্যামন, অগোও ত্যামন আছিল। এক লগে কত কাল ধইরা কাছাকাছি থাকছি। পরস্পর ভাই-দাদা চাচা কইছি। দ্যাশ ভাগ না হইলে অরা কি যাইত? যহন জানি রেলের মাথায় বইসা গ্যালে বিপদ। হইব, সাবধান কইরা দিমু না?
যুবকটি উত্তর দেয় না। বর্ষীয়ান সহকর্মীর কথায় সে খুব একটা খুশি হয়েছে বলে মনে হল না।
কেউ শুনুক না-শুনুক, বয়স্ক কর্মচারীটি হুঁশিয়ারি দিতে দিতে বিনুদের কামরার পাশ দিয়ে চলে যায়।
ট্রেন দাঁড়িয়ে আছে তো দাঁড়িয়েই আছে। কখন ছাড়বে, কে জানে।
জানালার বাইরে থেকে মুখ ফিরিয়ে কামরার ভেতরে তাকায় বিনু। সেই সকাল থেকে যন্ত্রণায় ছটফট করেই চলেছেন রামরতন। একটু থেমে থেমে কাতর শব্দ করে উঠছেন। তার মেয়েরা অনবরত শাড়ির আঁচল নেড়ে নেড়ে হাওয়া করে যাচ্ছে। ঝিনুকও তাই করছিল। এখন ক্লান্ত হয়ে কামরার দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছে।
