একটা ব্যাপার লক্ষ করেছে বিনু, বাড়ি থেকে স্টিমারঘাটে আসতে যত লোকের সঙ্গে দেখা হয়েছে সবাই হেমনাথকে বড়কত্তা’ বলেছে।
অবনীমোহন হাসতে হাসতে বললেন, আমরা এসেছি, একথা দেখছি সবাই জানে। দোকানদারদের কাছেও খবরটা পৌঁছে গেছে।
হেমনাথ হাসলেন, এখানকার মানুষ আমাকে খুব ভালবাসে, স্নেহ করে। আমার সংসারের খুঁটিনাটি সমস্ত খবর ওদের জানা।
হেমনাথের বাড়ি থেকে স্টিমারঘাট পর্যন্ত রাস্তাটা চেনা। পথটা ওখানেই শেষ নয়, স্টিমারঘাট ছুঁয়ে সেটা অর্ধবৃত্তের আকারে বাঁক নিয়ে দক্ষিণে নিরুদ্দেশ হয়েছে। হেমনাথ বিনুদের নিয়ে সেদিকে চললেন।
ঘাড় ফিরিয়ে বিনু একবার দেখে নিল, কালকের সেই স্টিমারটা নেই। জেটির বাঁধন খুলে কখন কোথায় পাড়ি জমিয়েছে, কে জানে। খুব সম্ভব কলকাতায় চলে গেছে। তবে কালকের সেই শঙ্খচিলগুলো চোখে পড়ল, আকাশময় তারা চক্কর দিয়ে চলেছে।
স্টিমারঘাটের পর নৌকাঘাটটা কালই চোখে পড়েছিল। তারপর একটা বরফ-কল আর সারি সারি মাছের আড়ত। হেমনাথ জানালেন, এখান থেকে কাঠের পেটিতে পরত পরত বরফের ভেতর শুয়ে রোজ শত শত মণ মাছ কলকাতায় চালান যায়। আড়তগুলোর ঠিক তলাতেই নদী। বিনুরা দেখতে পেল অসংখ্য জেলে নৌকো আসছেই, আসছেই। এখানকার বাতাস আঁশটে গন্ধে ভারী আর নিশ্চল হয়ে আছে।
আড়তগুলোর দিকে মুখ ফিরিয়ে হেমনাথ চেঁচিয়ে বললেন, তাজা ইলিশ আছে?
তক্ষুণি সাড়া পাওয়া গেল, আছে বড়কত্তা।
দর কী?
দরের লেইগা আটকাইব না। কয়টা লাগব ক’ন।
দাম না বললে নেব না।
সব থিকা সেরাটা ট্যাকায় ছয়টা।
তিনটে রাখিস, যাবার সময় নিয়ে যাব।
আইচ্ছা।
কাল রসগোল্লার দাম শুনে অবাক হয়েছিলেন অবনীমোহন, আজও হলেন মাছের দর শুনে। তার বিস্ময়-মাখানো মুখের দিকে তাকিয়ে হেমনাথ বললেন, এ হল জলের দেশ। মাছ এখানে শস্তা তো হবেই। কলকাতায় চালান না গেলে টাকায় একশ’টা করে ইলিশ বিক্রি হত।
আড়ত পেরিয়ে আসতেই চোখ জুড়িয়ে গেল। হেমনাথের বাড়ির দিকে রাস্তাটা খানিক খোয়ায় ঢাকা, বাকিটা কৌলীন্য হারিয়ে সোজা মাটিতে নেমে গেছে। এদিকটা কিন্তু লাল সুরকিতে ছাওয়া।
তার একদিকে নদী, আরেক ধারে সারিবদ্ধ ঝাউগাছ। রাস্তাটা চলেছে তো চলেইছে।
সুধা বলল, কী চমৎকার জায়গা! আমরা কিন্তু এখানে রোজ বিকেলে বেড়াতে আসব দাদু–
হেমনাথ বললেন, বেশ তো।
ঝাউগাছ যেদিকে, সেদিকটাও মনোরম। বর্ষার জলে প্রায় সবটাই ডুবে আছে। তবু তারই ফাঁকে ফাঁকে অনেকগুলো পাকা বাড়ি চোখে পড়ল। শুধু তা-ই নয়, এস.ডি.ও’র বাংলো, দেওয়ানি আর ফৌজদারি আদালত, আর.এস.এন কোম্পানির অফিস, রেজিস্ট্রেশন অফিস, ল্যান্ড অ্যান্ড ল্যান্ড রেভেনিউ অফিস, মেয়েদের একটা হাইস্কুল, ছেলেদের দু’টো, এমনকি ডিগ্রি কলেজও রাজদিয়ার এই প্রান্তে ছড়িয়ে আছে। ওদিকের তুলনায় এদিকটা অনেক বেশি জমজমাট। জীবনের চেহারা এখানে অনেকখানি নিবিড়, ঘনবদ্ধ।
ওদিকটার মতো এখানেও হেমনাথ বড়কত্তা। কারও সঙ্গে দেখা হলেই বিনুদের সম্বন্ধে সেই এক প্রশ্ন, হেমনাথের সেই এক উত্তর। সকলের কৌতূহল মেটাতে মেটাতে তারা এগিয়ে চলেছেন।
অবনীমোহন বললেন, ওধারের তুলনায় এধারে লোজন বোধহয় বেশি।
তা একটু বেশি। হেমানাথ বলতে লাগলেন, তবে এখন যতটা দেখছ এতটা কিন্তু বছরের অন্য সময় থাকে না।
দু’চোখে প্রশ্ন নিয়ে তাকালেন অবনীমোহন।
হেমনাথ এবার বুঝিয়ে বললেন। সমস্ত বছর রাজদিয়ায় বেশির ভাগ বাড়ি প্রায় ফাঁকাই পড়ে থাকে। দু’চারটে বুড়োবুড়ি আর জীবন থেকে বাতিল কিছু অথর্ব মানুষের মুখ তখন দেখা যায়। কেননা বাড়ির সক্ষম, সাবালক ছেলেরা সেসময় এখানে থাকে না, চাকরি বাকরি বা অন্য কোনও জীবিকার টানে তাদের কেউ তখন আসামে, কেউ ঢাকায়, কেউ কেউ হিল্লি-দিল্লিতেও। তবে সব চাইতে বেশি যেখানে তার নাম কলকাতা।
ছেলেরা বিদেশে চাকরি করবে, মেস কি হোটেলের ঝাল-মশলাওলা অখাদ্য খেয়ে অকালে পাকস্থলীটির স্বত্ব আমাশা কি অম্লশূলের হাতে তুলে দেবে, তা তো আর হয় না। কাজেই বাপ মা ছেলের বিয়ে দিয়ে বৌমাটিকে সঙ্গে পাঠিয়ে দেন। ঘরের রান্না খেয়ে পেটটা অন্তত বাঁচুক, নাতি নাতনী হলে তাদের কাছেই থাকে। বাপ-মা অবশ্য ছেলেদের কাজের জায়গায় গিয়ে থাকতে পারেন। কিন্তু তারা গেলে দেশের বাড়িঘর জমিজমা বাগানপুকুর দেখবে কে? যখের মতো পূর্বপুরুষের সম্পত্তি আগলে থাকবে কে?
সারা বছর রাজদিয়ায় ঢিমে তালের সুর লেগে থাকে। জীবন তখন মন্থর, ঘুমন্ত, নিষ্প্রভ। তিরতিরে স্রোতের মতো তাতে বেগ হয়তো থাকে, কিন্তু টের পাওয়া যায় না। তারপর আশ্বিন মাসটি যেই পড়ল, আকাশে বাতাসে ছুটির সানাইও বাজল, নদীর ধারে কাশফুলের বন ফুলে ফুলে ছেয়ে গেল আর রোদের রংটি হয়ে গেল গলানো সোনার মতো। সেই সময় রাজদিয়ার গায়ে সোনার কাঠির ছোঁয়া লেগে যায়। জলোচ্ছ্বাসের প্রবল ঢলের মতো দূর দূরান্ত থেকে দুর্বার আকর্ষণে ছেলেরা ফিরে আসে। পূর্ব বাংলার এই তুচ্ছ নগণ্য শহরটা সারা বছর প্রবাসী সন্তানগুলির জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে। তাদের ফিরে পেয়ে খুশি আর ধরে না। রাজদিয়া জুড়ে তখন প্রমত্ত উৎসব শুরু হয়ে যায়। তারপর পুজো যেই শেষ হল, ছুটির মেয়াদ ফুরো, ধীরে ধীরে রাজদিয়াকে অপার শূন্যতার ভেতর ছুঁড়ে দিয়ে একে একে সবাই গিয়ে স্টিমারে ওঠে। ওরা যেন মানস সরোবরের পরিযায়ী পাখি। শরতে আসে, শরৎ ফুরোলেই নিরুদ্দেশ।
